শীতকাল এলেই ত্বকের আর্দ্রতা কমে গিয়ে শুরু হয় রুক্ষতা, চুলকানি ও নানা ত্বকজনিত সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ শুষ্কতাই ধীরে ধীরে গুরুতর চর্মরোগের রূপ নিতে পারে। কেন শীতকালে ত্বক এমন শুষ্ক হয়ে ওঠে, কীভাবে সঠিক যত্ন নেবেন, আর ঘরোয়া টোটকায় কতটা ভরসা করা যায়-এই সব বিষয়েই সরাসরি কথা বললেন কলকাতা স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের চর্মরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. গৌরব রায়।
শীতকাল এলেই যেন গাছের পাতা ঝরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের জৌলুসও স্নান হয়ে যায়। রুক্ষ, শুষ্ক ত্বক (Dry Skin) নিয়ে নারী-পুরুষ সকলেই পড়ে যান অস্বস্তিতে। গ্লিসারিন, মধু, কমলালেবুর খোসা, নানা ঘরোয়া উপায়েও অনেক সময় শুদ্ধতা পিছু ছাড়ে না। বরং শীতের দাপট ত্বকেই বুঝিয়ে দেয় তার উপস্থিতি হালকা স্পর্শেই জ্বালা, খসখসে ভাব আর বিরক্তি। কারও কারও ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে ত্বক ফেটে গিয়ে দেখতেও খারাপ হয়ে ওঠে। তাই এই সময়ে ত্বকের যত্ন নিতে হয় বিশেষ নিয়মে ও বাড়তি সচেতনতায়। এমনকী, কচি ত্বকের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
শীতকালের ত্বকের জ্বালা
শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই কমে যায়। তার উপর অনেকেই ঘরের ভিতরে রুম হিটার ব্যবহার করেন। এর ফলে শরীর ও ত্বক থেকে ধীরে ধীরে জল বেরিয়ে যেতে থাকে যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ট্রান্সএপিডার্মাল ওয়াটার লস।
শীতের সময় ত্বকের সবচেয়ে বাইরের স্তর, অর্থাৎ স্ট্রাটাম কর্নিয়াম-এ সুক্ষ্ম ফাটল বা ক্র্যাক তৈরি হয়। এই ক্র্যাক দিয়েই খুব সহজে ত্বকের আর্দ্রতা বেরিয়ে যায়, ফলে ত্বক শুষ্ক, রুক্ষ ও খসখসে হয়ে ওঠে।
এ ছাড়াও এই ঋতুতে ত্বকের প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার যেমন সেরামাইডস, ফরটি অ্যাসিড ও কোলেস্টেরল-স্বাভাবিকের তুলনায় কম উৎপন্ন হয়। এর ফলেই শীতে ত্বক আরও বেশি শুস্ক ও নিষ্প্রাণ দেখায়।
যাঁদের ত্বক শুরু থেকেই বা সব ঋতুতেই শুষ্ক, তাঁদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি। কারণ, এই ধরনের ত্বকে সিবাম বা ত্বকের প্রাকৃতিক তেল তুলনামূলকভাবে কম তৈরি হয়। সিবাম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক লিপিড, যা ত্বককে ঠান্ডা, দূষণ ও শুদ্ধ পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে। সিবাম কম হলে ত্বকের জল ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায় এবং ত্বক দ্রুত শুর হয়ে পড়ে
শীতকালে আর একটি সাধারণ অভ্যাস ত্বকের ক্ষতি বাড়িয়ে দেয়- গরম জলে স্নান। দীর্ঘ সময় ধরে বা দিনে বারবার গরম জলে স্নান করলে ত্বকের প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার ও সিবাম আরও বেশি ক্ষয় হয়, ফলে শুষ্কতা তীব্র আকার নেয়।
শীতকালে নির্দিষ্ট কিছু ত্বকের রোগের প্রকোপ বাড়ে, বিশেষ করে যাঁদের ত্বক শুদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস, ইকথায়োসিস ভালগারিস, সোরিয়াসিস ও জেরোটিক একজিমার মতো গুরুতর চর্মরোগ।
বয়স্কদের ত্বক সাধারণত শুরু থেকেই শুদ্ধ হয়ে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের তেল উৎপাদন কমে যায়, ফলে শীতকালে তাঁদের সমস্যা আরও প্রকট হয়। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে হাইপোথাইরয়েডিজম বা কিডনির অসুখ থাকলেও ত্বক অতিরিক্ত শুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।
এই সমস্ত কারণেই চিকিৎসকরা শীতকালে ত্বকের যত্নে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন। সময়মতো সঠিক পরিচর্যা না করলে সাধারণ শুষ্কতা থেকেও গুরুতর ত্বকজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কী কী ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন?
১) শীতকালে ত্বককে শুস্কতার হাত থেকে বাঁচাতে স্নানের পদ্ধতিতে নজর দিন। গরম জলে স্নান করা যেতে পারে, তবে তা যেন দীর্ঘ সময় ধরে না হয়। স্নানের পর গা সম্পূর্ণ শুকনো করার আগেই, হালকা ভেজা অবস্থায় ময়েশ্চারাইজার লাগালে ত্বকের আর্দ্রতা দীর্ঘক্ষণ বজায় থাকে।
২) এই সময়ে অ্যালকালাইন জাতীয় সাবান ব্যবহার কমিয়ে মাইল্ড ক্লিনজার বা সিন্ডেট সাবান ব্যবহার করা শ্রেয়। ময়েশ্চারাইজার বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। পেট্রোলেটাম, গ্লিসারিন, ইউরিয়া, কোলেস্টেরল, ফ্যাটি অ্যাসিড ও সেরামাইডসমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার ত্বকের জল ধরে রাখতে বেশি কার্যকর।
৩) তবে অনেকেই শুধু গ্লিসারিনের সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে ত্বকে লাগায়, শুলতা কমাতে এই ঘরোয়া টোটকা খুব একটা কার্যকর নয়। এতে শুষ্কতা আরও বাড়ে। বরং শুধু গ্লিসারিন লাগালে উপকার বেশি পাওয়া যায়।
৪) দীর্ঘ সময় সরাসরি হিটার বা ব্লোয়ারের সামনে বসে থাকা এড়িয়ে চলা উচিত। শীতকালে বাইরে বেরোলে যতটা সম্ভব শরীর ঢেকে বেরোলে ত্বক থেকে জল বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমে। এই আবহাওয়ায় অ্যালকোহলযুক্ত টোনার ও রেটিনয়েড সিরাম ব্যবহার না করাই ভালো। এর পরিবর্তে মাইন্ড ময়েশ্চারাইজার ও হালকা টোনার ব্যবহার করা উচিত। শুষ্ক ত্বক চুলকাতে থাকলে অবশ্যই ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
৫) পর্যাপ্ত জল পান করলে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় থাকে, তবে অতিরিক্ত জল পানের প্রয়োজন নেই। শীতকালে ব্যালান্সড ডায়েট মেনে চলা জরুরি। ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার ত্বকের জন্য উপকারী। তবে মনে রাখতে হবে, নিয়মিত ময়েশ্চারাইজিং ছাড়া শুষ্কতা থেকে ত্বককে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
৬) ভিটামিন এ-এর ঘাটতিতে ত্বকের শুষ্কতা বাড়তে পারে। ভিটামিন ডি-এর অভাবে শুষ্কতার সঙ্গে চুলকানি ও জ্বালাভাব দেখা যায়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, যাঁরা দীর্ঘ সময় ঘরের মধ্যে থাকেন বা যাঁদের শরীরে রোদ লাগার সুযোগ কম, তাঁদের মধ্যে এই ঘাটতি বেশি দেখা যায়।
৭) ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের উপরের স্তরকে সুরক্ষিত রাখতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর ঘাটতিতে ত্বক খোসা ওঠা, অতিরিক্ত শুষ্কতা ও একজিমার সমস্যা বাড়তে পারে। আবার জিঙ্কের অভাবে ত্বকে ক্ষত বা ঘা হলে তা সহজে সারতে চায় না।
ঘরোয়া টোটকায় ভরসা কতটা?
ঘরোয়া প্রতিকার হিসাবে আগান অয়েল ব্যবহার করা যেতে পারে। সঙ্গে নারকেল তেলও লাগানো যায়, তবে যাঁদের ব্রণের সমস্যা রয়েছে, তাঁনের ক্ষেত্রে নারকেল তেল এড়িয়ে চলাই ভালো। ফাটা বা অতিরিক্ত শুদ্ধ ত্বকে টক দই ব্যবহার উপকারী হতে পারে। এতে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড ত্বককে হালকা ভাবে এক্সফোলিয়েট করতে সাহায্য করে। তবে একজিমা বা কোনও খোলা ঘায়ের উপর টক দই ব্যবহার করা উচিত নয়। ৫-১০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলাই যথেষ্ট।
মধুর অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল উপাদান ত্বকের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। শীতকালে ত্বকে লেবু, ভিনিগার বা বেকিং সোডা ব্যবহার না করাই ভালো। রোদে বসে সরষের তেল মাখার অভ্যাসও ত্যাগ করা উচিত। ত্বক সেনসিটিভহলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী কসমেটিক্স ব্যবহার করা প্রয়োজন।
মেনে চলুন
শীতে ত্বককে বেশি ক্লিনজিং করলে ত্বকের শুষ্কতা বেশি বাড়বে। কম সময়ে হালকা গরম জলে স্নানের অভ্যাস করুন। মানের সময় নূফা বা রোজ অতিরিক্ত স্ক্রাবিং না করাই ভালো। শীতে ত্বককে মসৃণ, কোমল ও উজ্জ্বল রাখতে ময়েশ্চারাইজারই একমাত্র পথ। সারা বছর ধরে সব ঋতুতেই সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বককে ড্যামেজ করে, শীতকালেও তার অন্যথা নেই। তাই সানস্ক্রিনের ব্যবহার অপরিহার্য।
ঠোঁট শুষ্ক হয়ে গেলে এস পি এফ সমৃদ্ধ লিপবাম ব্যবহার করা মাবে। তাছাড়া ল্যানোলিন, পেট্রোলেটাম জাতীয় লিপবামও উপকারী। পা ফাটার সমস্যায় ইউরিয়া ও ল্যাকটিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ভালো। তবে শুষ্ক ত্বকে মাই হোক, নিজে ওষুধ কিনে ব্যবহার নয়। অবশ্যই চিকিৎসকের কথা শুনতে হবে।
