বিশ্বজুড়ে হান্টাভাইরাস নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন করে আতঙ্ক। কয়েকটি সংক্রমণের ঘটনা এবং মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে নানা গুজব, ভয় আর বিভ্রান্তি। অনেকেই ভাবছেন, এটাই বুঝি পরবর্তী মহামারি। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, আতঙ্ক নয়, সঠিক তথ্য জানুন এবং সচেতন থাকুন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নজরদারিতে রয়েছে পুরো বিষয়টি। বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই ভাইরাস কোভিডের মতো সহজে ছড়ায় না এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকিও এখনও খুব কম। কিন্তু ভুল তথ্যই মানুষের ভয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই হান্টাভাইরাস নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ৫টি ভুল ধারণা ভাঙলেন চিকিৎসকেরা।
ইঁদুরের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। ছবি: সংগৃহীত
ভুল ধারণা ১: হান্টাভাইরাস খুব দ্রুত একজন থেকে আরেকজনে ছড়ায়
অনেকেই মনে করছেন, হান্টাভাইরাসও কোভিডের মতো সংক্রামক। বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই আলাদা। চিকিৎসকদের মতে, হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ইঁদুরের মূত্র, লালা ইত্যাদি শুকিয়ে বাতাসে মিশে গেলে সেই দূষিত কণিকা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ঘর, গুদাম বা ধুলোময় জায়গা পরিষ্কার করার সময় ঝুঁকি বাড়ে। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। দক্ষিণ আমেরিকার অ্যান্ডিস স্ট্রেন ছাড়া প্রায় কোনও ক্ষেত্রেই এমন সংক্রমণের প্রমাণ মেলেনি।
ভুল ধারণা ২: হান্টাভাইরাস মানেই আরেকটি কোভিডের মতো সংক্রমণের সূত্রপাত
জ্বর, দুর্বলতা, কাশি- এই উপসর্গগুলোর মিল থাকায় অনেকেই হান্টাভাইরাসকে কোভিডের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই দুই ভাইরাস সম্পূর্ণ আলাদা। হান্টাভাইরাস শরীরে ঢোকার পর প্রথমদিকে জ্বর, শরীরে ব্যথা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা বা শুকনো কাশির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কিন্তু গুরুতর ক্ষেত্রে এটি ফুসফুস, কিডনি এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে এমন পরিবেশে থাকার পর অসুস্থতা দেখা দিলে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়।
সংক্রমণ রুখতে জরুরি টেস্ট। ছবি: সংগৃহীত
ভুল ধারণা ৩: ধুলো পরিষ্কার করার পর জ্বর মানেই হান্টাভাইরাস
ঘর পরিষ্কার করার পর হালকা কাশি বা গলা খুসখুস হলেই অনেকে ভয় পাচ্ছেন। তবে চিকিৎসকদের মতে, শুধুমাত্র ধুলো পরিষ্কার করলেই হান্টাভাইরাস সংক্রমণ হয় না। ঝুঁকি তখনই বাড়ে, যখন সেখানে ইঁদুরের মল-মূত্রের দাগ ইত্যাদি থাকে। পুরনো গুদাম, পরিত্যক্ত বাড়ি বা বন্ধ স্টোররুম পরিষ্কার করার সময় বেশি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অযথা আতঙ্কিত না হয়ে উপসর্গ বাড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
ভুল ধারণা ৪: শুধু গ্রাম বা জঙ্গলেই এই ভাইরাসের ঝুঁকি
অনেকেই ভাবেন, হান্টাভাইরাস শুধুমাত্র গ্রামাঞ্চল বা জঙ্গলের সমস্যা। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহরেও ঝুঁকি থাকতে পারে। ইঁদুরের উপদ্রব দেখা যেতে পারে ফ্ল্যাটবাড়ি, অফিস, বাজার, বেসমেন্ট, গুদামঘর, আবাসিক কমপ্লেক্সেও। অপরিষ্কার পরিবেশ, জমে থাকা আবর্জনা ইঁদুর বা ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর বাস হলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
চলছে গবেষণা। ছবি: সংগৃহীত
ভুল ধারণা ৫: হান্টাভাইরাস হলেই মৃত্যু নিশ্চিত
সংবাদমাধ্যমে গুরুতর সংক্রমণের খবর বেশি সামনে আসায় অনেকে মনে করছেন, হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত মানেই মৃত্যু। চিকিৎসকদের মতে, এই ধারণাও সঠিক নয়। সময়মতো চিকিৎসা এবং সাপোর্টিভ কেয়ার পেলে অনেক রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কিছু উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। যেমন- শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ বা ব্যথা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, জ্বর ক্রমশ বাড়তে থাকা, ইঁদুরের সংস্পর্শের পর দীর্ঘস্থায়ী কাশি।
কীভাবে সুরক্ষিত থাকবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ-
- ইঁদুরের সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন
- দীর্ঘদিনের পুরনো ধুলো পরিষ্কারের সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করুন
- আগে জীবাণুনাশক স্প্রে করে তারপর পরিষ্কার করুন
- ঝাড়ু বা ভ্যাকুয়াম ব্যবহার করবেন না
- পরিষ্কারের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন
চিকিৎসকদের মতে, হান্টাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতাই এই সংক্রমণ থেকে দূরে থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
