হিনা খান বরাবরই নিজের ক্যানসার-যুদ্ধের নানা মুহূর্ত অনুরাগীদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। কখনও কেমোথেরাপির অভিজ্ঞতা, কখনও শরীরচর্চা, কখনও আবার মানসিকভাবে ইতিবাচক থাকার লড়াই। এবার তাঁর ইনস্টাগ্রামের একটি ভিডিও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, বরফশীতল জলে বসে আইস বাথ নিচ্ছেন অভিনেত্রী।
২০২৪ সালের জুনে থার্ড স্টেজ স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন হিনা। তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, ক্যানসারের চিকিৎসায় কি আইস বাথের কোনও ভূমিকা রয়েছে (Benefits of Ice Therapy)? নাকি এটি শুধুই শরীরকে চাঙ্গা রাখার একটি উপায়?
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এই দুই বিষয়কে এক করে দেখলে ভুল হবে। আইস বাথ শরীরচর্চার পর পেশির ব্যথা, প্রদাহ ও ক্লান্তি কমাতে কিছু ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। কিন্তু ক্যানসার প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময়ে এর কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ফলে সোশাল মিডিয়ায় কোনও তারকার অভিজ্ঞতা দেখে এই থেরাপিকে চিকিৎসার বিকল্প বলে ভাবা উচিত নয়।
হিনা খান। ছবি: সংগৃহীত
কী এই আইস বাথ থেরাপি?
আইস বাথ বা কোল্ড ওয়াটার ইমারশন এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ঠান্ডা জলে কয়েক মিনিট বসে থাকতে হয়। মূলত খেলোয়াড় এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করেন এমন ব্যক্তিরাই ব্যায়ামের পর দ্রুত পেশি পুনরুদ্ধারের জন্য এই পদ্ধতির আশ্রয় নেন।
ঠান্ডা জলে শরীর ডুবিয়ে রাখলে রক্তনালি সাময়িকভাবে সংকুচিত হয়। এতে প্রদাহ ও ফোলাভাব কিছুটা কমতে পারে। পরে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হলে রক্ত চলাচলও স্বাভাবিক হয়ে যায়, যা পেশির পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে। তবে এই প্রভাব মূলত শরীরচর্চা-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ।
ক্যানসারের চিকিৎসায় কি কার্যকর?
বিশেষজ্ঞদের কথায়, আইস বাথ ক্যানসারের চিকিৎসা, প্রতিরোধ বা নিরাময়ে সাহায্য করে, এমন কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। ক্যানসার এমন একটি জটিল রোগ, যার পেছনে জিনগত ও কোষগত নানা পরিবর্তন কাজ করে। ঠান্ডা জলে থাকার ফলে শরীরে কিছু সাময়িক পরিবর্তন দেখা দিলেও তা ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে বা টিউমারের বৃদ্ধি থামাতে পারে, এমন তথ্য এখনও গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পরীক্ষাগারে তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কিছু গবেষণা হয়েছে বটে, কিন্তু সেগুলি এখনও প্রাথমিক স্তরে। মানুষের ক্ষেত্রে আইস বাথকে ক্যানসারের কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি চিকিৎসাবিজ্ঞান।
আইস বাথ। ছবি: সংগৃহীত
কোন চিকিৎসায় ভরসা রাখবেন?
বর্তমানে ক্যানসারের চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকর এবং প্রমাণিত পদ্ধতিগুলি হল অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি এবং হরমোন থেরাপি। রোগের ধরন, পর্যায় এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতেই চিকিৎসক এই চিকিৎসাগুলির মধ্যে উপযুক্ত পদ্ধতি বেছে নেন।
আইস বাথ কি কোনও ঝুঁকিও ডেকে আনতে পারে?
সব রোগীর জন্য আইস বাথ নিরাপদ নয়। বিশেষ করে ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালীন শরীর অনেক বেশি সংবেদনশীল থাকে। অত্যধিক ঠান্ডা হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির উপর অতিরিক্ত চাপ ফেলতে পারে।
আবার কেমোথেরাপির কারণে যাঁদের হাত-পায়ে অসাড়তা, ঝিনঝিনি বা ব্যথার সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে আইস বাথ সেই অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলেও এই থেরাপি নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
দ্রুত সেরে ওঠুন। ছবি: সংগৃহীত
তা হলে আইস বাথের উপকার কী?
আইস বাথ ক্যানসারের চিকিৎসা নয়, তবে শরীরচর্চার পর পেশির ব্যথা কমানো, সাময়িকভাবে প্রদাহ হ্রাস করা এবং দ্রুত সতেজ অনুভব করতে সাহায্য করতে পারে। অনেকেই মানসিকভাবে ভালো লাগার কথাও জানান। তবে এই উপকারের সঙ্গে ক্যানসার নিরাময়ের কোনও সম্পর্ক নেই।
ক্যানসারের রোগীদের জন্য কী বেশি জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি, সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলিই ক্যানসারের চিকিৎসার সময় সবচেয়ে বেশি উপকার করে।
হিনা খানের আইস বাথ হয়তো তাঁর ব্যক্তিগত ওয়েলনেস রুটিনের অংশ। কিন্তু সেটিকে ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে দেখার কোনও কারণ নেই। নতুন কোনও থেরাপি বা স্বাস্থ্যচর্চা শুরু করার আগে অবশ্যই অঙ্কোলজিস্টের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
