একটা সময় বাস্তব থেকে পালানোর সহজ রাস্তা বলে মনে হয়েছিল নেশা। এমনই স্বীকারোক্তি অভিনেত্রী জাহ্নবী কাপুরের। তাঁর কথায়, তিনি নিজেকে কখনও 'আসক্ত' ভাবেননি, কিন্তু জীবনের এক গভীর আঘাতের পর বারবার মনে হতো, 'আজ একটু বেশি নেশা করলে হয়তো সবকিছু ভুলে থাকা যাবে।' এই অনুভূতি অচেনা নয়, বরং বহু মানুষের জীবনে ঘটে চলা এক বাস্তব চিত্র।
জাহ্নবী কাপুর। ছবি: সংগৃহীত
আবেগ যখন নেশার দিকে ঠেলে দেয়
মদ্যপান সবসময় আনন্দের সঙ্গী নয়, অনেক সময় তা হয়ে ওঠে এক ধরনের মানসিক আশ্রয়। জাহ্নবীর কথার, তিনি নিজেকে 'অ্যালকোহলিক' মনে করেন না। তিনি মদ্যপান করতেন মানসিক চাপ ও আঘাত থেকে পালানোর জন্য। এখানেই মূল পার্থক্য। সামাজিক আনন্দের জন্য মদ্যপান আর আবেগ সামলাতে মদের উপর নির্ভর করা এক জিনিস নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই 'ইমোশনাল ড্রিঙ্কিং'-ই ভবিষ্যতের নির্ভরতার প্রথম ধাপ। যখন দুঃখ, ট্রমা বা চাপ সামলানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন অনেকেই অ্যালকোহলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই অভ্যাস ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে মদ আর 'পছন্দ' থাকে না, হয়ে ওঠে 'প্রয়োজন'।
মদেই মুক্তি! ছবি: সংগৃহীত
যে সতর্কবার্তাগুলো আমরা উপেক্ষা করি
আসক্তির শুরুটা সাধারণত হঠাৎ করে বোঝা যায় না। বরং কিছু ছোট ছোট পরিবর্তন আগে থেকেই সংকেত দেয়। সকালে ঘুম ভেঙে ক্লান্ত লাগা, মদ্যপানের পর অস্বস্তি তৈরি হওয়া, নিজের আচরণে অচেনা পরিবর্তন লক্ষ্য করা, এই সবই ইঙ্গিত হতে পারে। জাহ্নবী এমন একটি মুহূর্তের কথা বলেছেন, যখন একটি পরিচিত গন্ধ তাঁকে এমন একজনের কথা মনে করিয়ে দেয়, যিনি নেশার সঙ্গে লড়াই করছিলেন। সেই অনুভূতিই তাঁকে নিজের দিকে নতুন করে তাকাতে বাধ্য করে।
মনের উপর ধীরে ধীরে প্রভাব
অ্যালকোহল প্রথমে স্বস্তির অনুভূতি তৈরি করলেও, তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ভিন্ন। এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। উদ্বেগ বাড়তে থাকে, মন খারাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়, আর আবেগ সামলানোর ক্ষমতা কমে যায়। ঘুমের গুণমান নষ্ট হয়, ফলে শরীর ও মন দুই-ই ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
শরীরের ভেতরে নীরব ক্ষয়
শুধু মানসিক নয়, শারীরিক দিক থেকেও অ্যালকোহল গভীর প্রভাব ফেলে। লিভার, হৃদ্যন্ত্র, বিপাকক্রিয়া, সবকিছুই এর প্রভাবে ক্ষতি হতে পারে। এমনকী এনার্জির মাত্রা কমে যাওয়া বা প্রতিদিনের কাজে অনীহাও এই প্রভাবের অংশ হতে পারে।
শারীরিক ক্ষতির অন্ত নেই। ছবি: সংগৃহীত
কখন থামার কথা ভাববেন?
সবসময় চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর অপেক্ষা করতে হয় না। কখনও কখনও নিজের ভেতরের অস্বস্তিই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। মদ্যপান যখন আনন্দের জন্য নয়, বরং কষ্ট ঢাকতে প্রয়োজন হয়ে ওঠে, যখন পরের দিন অনুশোচনা তৈরি হয় বা যখন দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে, তখনই থামার সময়।
বদলের শুরু
এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা অসম্ভব নয়। বরং পরিবর্তনের শুরু হয় ছোট ছোট উপলব্ধি থেকে। নিজের আবেগকে চিহ্নিত করা, কিছুদিন বিরতি নেওয়া, বিকল্প অভ্যাস গড়ে তোলা, এসবই ধীরে ধীরে পথ দেখায়। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
জাহ্নবী কাপুরের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নেশা সবসময় হঠাৎ করে জীবনে ঢুকে পড়ে না। এটি ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে জায়গা করে নেয়। তাই নিজের মনের কথা শোনা, ছোট সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া, এই দুই-ই হতে পারে সুস্থ জীবনের প্রথম পদক্ষেপ।
