অনিয়মিত পিরিয়ড, ওজন বেড়ে যাওয়া, ব্রণ বা সন্তানধারণে সমস্যা— পলিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওডি) বলতেই সাধারণত এই লক্ষণগুলোর কথাই সামনে আসে। কিন্তু চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা আরও গভীর। তাঁদের মতে, পিসিওডি ধীরে ধীরে হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বহু তরুণী এখনও এই বিপদ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, পিসিওডি শুধু গাইনোকলজিক্যাল সমস্যা নয়, এটি শরীরের মেটাবলিক সিস্টেমকেও প্রভাবিত করে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, প্রদাহ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন— সব মিলিয়ে হৃদযন্ত্রের উপর তৈরি হয় নীরব চাপ।
পিসিওডি আক্রান্ত মহিলাদের মধ্যে কম বয়স থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের সমস্যা এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে দেখা যায়। এগুলোই ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে।
শুধু পিরিয়ডের সমস্যাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ছবি: সংগৃহীত
শরীরের ভিতরে কী ঘটে?
পিসিওডির অন্যতম বড় সমস্যা হল ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। অর্থাৎ, শরীর ঠিকভাবে ইনসুলিন ব্যবহার করতে পারে না। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে বাড়ে পেটের মেদ, খারাপ কোলেস্টেরল এবং শরীরে জমতে থাকে অতিরিক্ত ফ্যাট। ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন রক্তনালীর ক্ষতি করতে শুরু করে।
চিকিৎসকদের মতে, শরীরে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহও বড় বিপদ। এই প্রদাহ ধমনীর ভিতরে প্লাক জমার প্রক্রিয়া দ্রুত করে। একসময় সেই জমাট বাধা প্লাক হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
শুধু তাই নয়, পিসিওডি আক্রান্ত মহিলাদের শরীরে অ্যান্ড্রোজেন বা পুরুষ হরমোনের মাত্রাও বেশি থাকে। এই হরমোনের ভারসাম্যহীনতা হৃদরোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আধুনিক জীবনযাপন বাড়াচ্ছে বিপদ
অতিরিক্ত মানসিক চাপ, রাত জাগা, কম ঘুম, দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, ফাস্ট ফুড নির্ভর খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরচর্চার অভাব— শহুরে জীবনের এই অভ্যাসগুলো পিসিওডিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের অনেক তরুণী বুঝতেই পারছেন না যে প্রতিদিনের জীবনযাপনই নিঃশব্দে হার্টের ক্ষতি করছে।
পরোক্ষে হার্টেরও ক্ষতি করে। ছবি: সংগৃহীত
কেন লক্ষণ বুঝতে দেরি?
মহিলাদের হৃদরোগের উপসর্গ অনেক সময় খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় না। অস্বাভাবিক ক্লান্তি, হালকা শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, চোয়াল বা পিঠে ব্যথা, রক্তচাপ ওঠানামার মতো লক্ষণকে অনেকেই সাধারণ স্ট্রেস বা হরমোনের সমস্যা বলে এড়িয়ে যান। ফলে রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়। আর সেই দেরিই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় আরও বেশি।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র
চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো জীবনযাত্রায় বদল আনতে পারলে এই ঝুঁকির অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ পিসিওডি ও হৃদরোগ— দু'টিকেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসবজি, দানা শস্য ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি নিয়মিত রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ পরীক্ষা করাও জরুরি।
পিসিওডিকে শুধুমাত্র পিরিয়ডের সমস্যা ভেবে অবহেলা করলে চলবে না। কারণ এই রোগ অনেক সময় ভবিষ্যতে হৃদরোগের নীরব সতর্কবার্তাও হয়ে উঠতে পারে।
