'গজনি'-র সেই ভয়ংকর খলনায়ক হিসেবে যাঁর মুখ আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে, সেই বর্ষীয়ান অভিনেতা প্রদীপ রাওয়াত প্রয়াত (Pradeep Rawat Death)। বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। ব্লাড ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তাঁর প্রয়াণ শুধু চলচ্চিত্রজগতেই শোকের ছায়া ফেলেনি, নতুন করে সামনে এনেছে এমন এক রোগকে, যার প্রাথমিক লক্ষণ (Blood Cancer Symptoms) অনেক সময় নীরবেই শরীরে বাসা বাঁধে।
হিন্দি, তেলুগু, তামিল-সহ একাধিক ভাষার ছবিতে নজরকাড়া অভিনয়ের জন্য পরিচিত ছিলেন প্রদীপ রাওয়াত। দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছিলেন ব্লাড ক্যানসারে। মুম্বইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই অভিনেতা।
তাঁর প্রয়াণ আবারও মনে করিয়ে দিল, ব্লাড ক্যানসার এমন একটি রোগ, যার উপসর্গকে অনেকেই প্রথম দিকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ সময়মতো রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়।
না-ফেরার দেশে। ছবি: সংগৃহীত
ব্লাড ক্যানসার কী?
ব্লাড ক্যানসার হল এমন এক ক্যানসার, যা রক্ত, অস্থিমজ্জা (বোন ম্যারো) অথবা লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমকে আক্রান্ত করে। এই রোগে স্বাভাবিক রক্তকণিকার উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, অক্সিজেন পরিবহণে সমস্যা হয় এবং রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
ব্লাড ক্যানসারের প্রধান তিনটি ধরন—
লিউকেমিয়া: অস্থিমজ্জায় অস্বাভাবিক শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি হতে থাকে।
লিম্ফোমা: রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমে ক্যানসারের উৎপত্তি হয়।
মাল্টিপল মায়েলোমা: প্লাজমা কোষে ক্যানসার হয়, যা শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরির কাজ করে।
এই উপসর্গগুলি দীর্ঘদিন থাকলে সতর্ক হোন
ব্লাড ক্যানসারের লক্ষণ অনেক সময় ধীরে ধীরে দেখা দেয়। তাই এগুলিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়-
- দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা
- বারবার সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়া
- কারণ ছাড়াই জ্বর বা রাতে অতিরিক্ত ঘাম
- সামান্য আঘাতেই রক্তপাত বা সহজে কালশিটে পড়া
- ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া
- হাড় বা সন্ধিস্থলে ব্যথা
- হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া
- শ্বাসকষ্ট
- রক্তাল্পতার কারণে ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
এই উপসর্গগুলির এক বা একাধিক যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকে, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
'গজনি'-র একটি দৃশ্যে। ছবি: সংগৃহীত
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকি বাড়লেও যে কোনও বয়সেই ব্লাড ক্যানসার হতে পারে। পরিবারে এই রোগের ইতিহাস, কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশনের পূর্ব অভিজ্ঞতা, ধূমপান, বেঞ্জিনের মতো রাসায়নিকের সংস্পর্শ, কিছু জিনগত অসুখ এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই কোনও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই এই রোগ দেখা দেয়।
কীভাবে ধরা পড়ে?
রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকেরা সাধারণত সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট), পেরিফেরাল ব্লাড স্মিয়ার, বোন ম্যারো বায়োপসি, সিটি বা পেট স্ক্যান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জেনেটিক ও মলিকিউলার পরীক্ষা করেন। এগুলির সাহায্যে ক্যানসারের ধরন ও পর্যায় নির্ধারণ করে চিকিৎসার পরিকল্পনা করা হয়।
চিকিৎসার কী কী উপায় রয়েছে?
বর্তমানে ব্লাড ক্যানসারের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, রেডিয়েশন, স্টেম সেল বা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট এবং কিছু ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক সিএআর-টি সেল থেরাপিও ব্যবহার করা হয়। দ্রুত রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার ফল অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক হতে পারে।
স্মৃতিতে অমলিন। ছবি: সংগৃহীত
প্রতিরোধ করা কি সম্ভব?
ব্লাড ক্যানসার সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করার কোনও নিশ্চিত উপায় নেই। তবে ধূমপান এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ এড়ানো এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, শরীরের অস্বাভাবিক কোনও পরিবর্তনকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রদীপ রাওয়াতের অভিনয় দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন থাকবে। তাঁর প্রয়াণ একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিল— শরীরের নীরব সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, ব্লাড ক্যানসারের মতো রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সচেতনতাই প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
