ধূমপান ছাড়তে চান, কিন্তু বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনেকে চিকিৎসকের কাছে যান, কেউ বা নানা পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তবে জনপ্রিয় সঙ্গীত পরিচালক বিশাল দাদলানির (Vishal Dadlani) গল্প যেন একটু আলাদা। একসময় তিনি দিনে ৪০টা পর্যন্ত সিগারেট খেতেন। কিন্তু একদিন নিজের সঙ্গেই যেন এক নীরব যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তারপর থেকে আর একটি সিগারেটও স্পর্শ করেননি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বিশাল বলেন, 'আমি কোনও কিছুকে আমার উপর কর্তৃত্ব করতে দিতে চাই না। একদিন নিজের উপরই বিরক্ত হয়ে গেলাম। বুঝতে পারলাম, আমি সিগারেটের দাস হয়ে যাচ্ছি। তখনই সিগারেট নামিয়ে রেখে নিজেকে বললাম, আর কখনও নয়।'
তিনি আরও বলেন, 'ধূমপান ছাড়তে পেরেছি, কারণ আমিই নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রক। কোনও নেশাকে হারাতে হলে তাকে বোঝাতে হবে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনার, তার নয়।'
বিশাল দাদলানি। ছবি: সংগৃহীত
ধূমপান ছাড়ার লড়াইয়ে মানসিক জোর কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
চিকিৎসকদের মতে, ধূমপান ছাড়ার প্রথম শর্তই হল দৃঢ় মানসিক প্রস্তুতি। নিকোটিন শুধু শরীরকে নয়, মস্তিষ্ককেও নির্ভরশীল করে তোলে। তাই সিগারেট ছাড়ার পর শারীরিক অস্বস্তির পাশাপাশি মানসিক টানাপোড়েনও তৈরি হয়।
তবে নিজের ভেতরে যদি স্পষ্ট কারণ থাকে, যেমন সুস্থ জীবন, পরিবারের কথা, অর্থ সাশ্রয় বা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার ইচ্ছা, তাহলে ধূমপান ছাড়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকের ক্ষেত্রে শুধু ইচ্ছাশক্তি যথেষ্ট নয়। নিকোটিনের আসক্তি বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ, কাউন্সেলিং, নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা ওষুধেরও প্রয়োজন হতে পারে।
দরকার মানসিক প্রস্তুতি। ছবি: সংগৃহীত
ধূমপান ছাড়লেই শরীর বদলাতে শুরু করে
সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার সুফল পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় না। বরং কয়েক মিনিটের মধ্যেই শরীর ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে শুরু করে। যেমন-
- ২০ মিনিটের মধ্যে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
- ১২ ঘণ্টার মধ্যে রক্তে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
- ২ থেকে ১২ সপ্তাহে রক্তসঞ্চালন ভালো হয় এবং ফুসফুস আগের তুলনায় ভালোভাবে কাজ করতে শুরু করে।
- ১ থেকে ৯ মাসে কাশি, হাঁপ ধরা এবং শ্বাসকষ্ট ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
- ১ বছরে হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমে যায়।
- ১০ বছরে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ধূমপান চালিয়ে যাওয়া ব্যক্তির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমে।
এ ছাড়াও সিওপিডি, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, মুখ ও গলার ক্যানসার, মূত্রথলির ক্যানসারের মতো একাধিক গুরুতর অসুখের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
ছাড়তে পারলে বাঁচবে শরীর। ছবি: সংগৃহীত
ধূমপান ছাড়ার পর কেন এত কষ্ট হয়?
নিকোটিন মস্তিষ্কে ডোপামিন ক্ষরণ বাড়িয়ে সাময়িক স্বস্তি ও আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধূমপান করলে মস্তিষ্ক সেই অনুভূতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে হঠাৎ সিগারেট ছেড়ে দিলে তীব্র ধূমপানের ইচ্ছা, বিরক্তি, উদ্বেগ, অস্থিরতা, মনোযোগের অভাব, খিদে বেড়ে যাওয়া বা ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাধারণত প্রথম কয়েক দিন এই উপসর্গ বেশি থাকে, পরে ধীরে ধীরে কমে আসে।
ধূমপান ছাড়তে চাইলে কী করবেন?
একটি নির্দিষ্ট দিন ঠিক করুন। ধূমপানের ইচ্ছা বাড়ায় এমন পরিস্থিতিগুলি চিহ্নিত করুন। সিগারেট, লাইটার ও অ্যাশট্রে হাতের কাছে রাখবেন না। নিয়মিত শরীরচর্চা করুন, পর্যাপ্ত জল পান করুন এবং পরিবার বা বন্ধুদের সহযোগিতা নিন। প্রয়োজনে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা ওষুধের সাহায্য নিন।
বিশাল দাদলানির ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্তের শুরুটা নিজের মন থেকেই। তবে প্রত্যেকের নিকোটিন নির্ভরতার মাত্রা এক নয়। তাই কারও পক্ষে একা সম্ভব হলেও, অন্য কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়াই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
