একসময় বেবি পাউডার ছাড়া শিশুর পরিচর্যা যেন কল্পনাই করা যেত না। স্নানের পর হোক বা ডায়াপার বদলানোর সময়, শিশুর গায়ে ট্যালকম পাউডার ছিটিয়ে দেওয়াই ছিল বহু পরিবারের রোজকার অভ্যাস। বিশ্বাস ছিল, এতে ত্বক শুকনো থাকে, র্যাশ কম হয়, শিশুও আরাম পায়।
কিন্তু সময় বদলেছে। জনসন অ্যান্ড জনসনের ট্যালকভিত্তিক বেবি পাউডারকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে আইনি বিতর্কের পর সেই দীর্ঘদিনের অভ্যাস নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিশুর জন্য ট্যালকম পাউডার কি সত্যিই প্রয়োজন?
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর না। বরং শিশুর ত্বকের যত্নে সবচেয়ে জরুরি হল পরিচ্ছন্নতা, শুষ্কতা বজায় রাখা এবং সঠিক পরিচর্যা। আর শিশুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ক্যানসারের আশঙ্কা নয়, পাউডারের অতিক্ষুদ্র কণা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে যাওয়ার সম্ভাবনা।
কেন ট্যালকম পাউডার ব্যবহার করতে বারণ করছেন চিকিৎসকেরা?
চিকিৎসকদের কথায়, সুস্থ শিশুর দৈনন্দিন ত্বকের যত্নে ট্যালকম পাউডারের কোনও প্রয়োজন নেই। বর্তমানে বহু শিশুরোগ বিশেষজ্ঞই নিয়মিত বেবি পাউডার ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করছেন।
কারণ শিশুর শরীরে সরাসরি পাউডার ছিটিয়ে দিলে তার সূক্ষ্ম কণাগুলি বাতাসে ভেসে বেড়ায়। শিশুর ফুসফুস তখনও সম্পূর্ণ বিকশিত হয় না। ফলে সেই কণা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে কাশি, শ্বাসকষ্ট, শ্বাসনালিতে জ্বালা, এমনকী বিরল ক্ষেত্রে গুরুতর শ্বাসযন্ত্রের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং বাস্তব ঝুঁকি।
ডেকে আনে বিপদ। ছবি: সংগৃহীত
ক্যানসার নিয়ে কি দুশ্চিন্তার কারণ আছে?
জনসন অ্যান্ড জনসনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলার মূল অভিযোগ, কিছু ট্যালকভিত্তিক পণ্যে অ্যাসবেস্টসের দূষণ ছিল এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে চিকিৎসকদের বক্তব্য, এই বিতর্ক আর নবজাতকের দৈনন্দিন পরিচর্যার বিষয়টি এক নয়। শিশুর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক উদ্বেগের কারণ ক্যানসার নয়, বরং পাউডারের সূক্ষ্ম কণা শ্বাসনালিতে ঢুকে শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা তৈরি করা।
শিশুর ত্বকের যত্নে কী করবেন?
চিকিৎসকদের মতে, শিশুর কোমল ত্বক সুস্থ রাখতে খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই। স্নানের পর নরম তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে শরীর মুছে শুকিয়ে দিন। বিশেষ করে গলার ভাঁজ, বগল, কুঁচকি এবং হাঁটুর পিছনের অংশে যেন ভেজাভাব না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
ডায়াপার নিয়মিত বদলানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘক্ষণ ভেজা ডায়াপার পরে থাকলে র্যাশের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ডায়াপার র্যাশের প্রবণতা থাকলে ট্যালকম পাউডারের বদলে জিঙ্ক অক্সাইডযুক্ত ব্যারিয়ার ক্রিম ব্যবহার করাই বেশি কার্যকর। পাশাপাশি নতুন ডায়াপার পরানোর আগে কয়েক মিনিট শিশুর ত্বক খোলা বাতাসে রাখলে ত্বক আরও ভালো থাকে।
এভাবে নয়। ছবি: সংগৃহীত
তবুও যদি বেবি পাউডার ব্যবহার করতে চান...
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কখনও শিশুর শরীরে সরাসরি পাউডার ছিটিয়ে দেবেন না। প্রথমে নিজের হাতে অল্প পরিমাণ পাউডার নিয়ে, শিশুর মুখ থেকে দূরে আলতোভাবে ত্বকে লাগান। এতে বাতাসে পাউডারের কণা কম ছড়ায় এবং শিশুর শ্বাসনালিতে ঢোকার ঝুঁকিও অনেকটাই কমে। তবে চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হল পাউডার ব্যবহার না করাই।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
হালকা লালচে ভাব বা ডায়াপার র্যাশ শিশুদের মধ্যে অস্বাভাবিক নয়। তবে কয়েক দিনের মধ্যেও সমস্যা না কমলে, ত্বক ফুলে গেলে, ব্যথা বা পুঁজ দেখা দিলে, জ্বর এলে বা একই সমস্যা বারবার ফিরে এলে দেরি না করে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শিশুর সুস্থ ত্বকের জন্য দামি প্রসাধনী নয়, প্রয়োজন সঠিক যত্ন। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, ত্বক শুকনো রাখা, সময়মতো ডায়াপার বদলানো এবং প্রয়োজন হলে ব্যারিয়ার ক্রিম ব্যবহারই যথেষ্ট। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা অভ্যাস হলেও, ট্যালকম পাউডারের বদলে নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত পরিচর্যাতেই এখন বেশি জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
