সপ্তাহের পাঁচ দিন ল্যাপটপের সামনে বসে টানা কাজ, আর ছুটির দিনেই হঠাৎ দৌড়, ফুটবল, সাইক্লিং বা জিমে কড়া ওয়ার্কআউট! চিকিৎসকদের মতে, শহুরে তরুণ পেশাজীবীদের এই জীবনযাপনই এখন বাড়িয়ে দিচ্ছে গুরুতর স্পোর্টস ইনজুরির ঝুঁকি।
ভারতের মেট্রো শহরগুলিতে কর্পোরেট কর্মীদের মধ্যে ফিটনেস নিয়ে আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কেউ সপ্তাহান্তে দৌড়াচ্ছেন, কেউ নেমে পড়ছেন র্যাকেট হাতে, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল নিয়ে নামছেন মাঠে। কিন্তু শরীরকে সারা সপ্তাহ প্রায় নিষ্ক্রিয় রেখে হঠাৎ অতিরিক্ত পরিশ্রম করাই ডেকে আনছে বিপদ। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই প্রবণতার নামই 'উইকএন্ড অ্যাথলিট সিনড্রোম'।
একদিনের শরীরচর্চাই ডেকে আনছে বিপদ। ছবি: সংগৃহীত
অর্থোপেডিকদের দাবি, এখন কম বয়সিদের মধ্যেই লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া, হাঁটুর চোট, স্ট্রেস ফ্র্যাকচার, অ্যাকিলিস টেনডনের সমস্যা, কোমরের ব্যথা বা স্লিপ ডিস্কের মতো সমস্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সিদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞদের কথায়, অনেকেই ভাবেন, সপ্তাহজুড়ে শরীরচর্চা না করলেও সপ্তাহান্তে কয়েক ঘণ্টা কড়া অনুশীলন করলেই ফিট থাকা সম্ভব। কিন্তু শরীর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ নেওয়ার জন্য তৈরি থাকে না।
সোশাল মিডিয়ার ফিটনেস ট্রেন্ড, ম্যারাথন সংস্কৃতি এবং কর্পোরেট ফিটনেস চ্যালেঞ্জের প্রভাবেও অনেকেই দ্রুত কঠিন শরীরচর্চা শুরু করছেন। কিন্তু ধাপে ধাপে শরীরকে প্রস্তুত করার বিষয়টি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
বাড়ছে পিঠে ব্যথা। ছবি: সংগৃহীত
অফিসে দীর্ঘ সময়ের কারণে অনেকেরই প্রতিদিন নিয়মিত শরীরচর্চা করা সম্ভব হয় না। ফলে সপ্তাহান্তে হঠাৎ অতিরিক্ত ব্যায়াম বা খেলাধুলায় অংশ নেন তাঁরা। আর সেখান থেকেই বাড়ে টেনডন স্ট্রেন, লিগামেন্ট ইনজুরি এবং পিঠের ব্যথার আশঙ্কা।
চিকিৎসকদের মতে, শরীরকে সক্রিয় রাখতে প্রতিদিন অল্প হলেও নিয়মিত শরীরচর্চা জরুরি। শুধু সপ্তাহান্তে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে পুরো সপ্তাহের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া যায় না।
এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অফিসকর্মীরা দিনে গড়ে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় বসে কাটান। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার এই অভ্যাস শরীরের পেশি, জয়েন্ট ও হাড়ের স্বাভাবিক সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে হঠাৎ চাপ পড়লেই চোটের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সারা সপ্তাহ শরীরচর্চা করলে কমে চোটের ঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, খেলাধুলা বা ভারী শরীরচর্চার আগে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট ওয়ার্ম-আপ করা উচিত। হালকা জগিং, দ্রুত হাঁটা, স্কিপিং বা সাইক্লিংয়ের পাশাপাশি ডাইনামিক স্ট্রেচিং শরীরকে প্রস্তুত করতে সাহায্য করে।
শুধু কার্ডিও নয়, সপ্তাহে অন্তত দু’দিন স্ট্রেংথ ট্রেনিং, ব্যালান্স ও মোবিলিটি এক্সারসাইজও জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরে জলের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং শরীর ক্লান্ত থাকলে বিশ্রাম নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ফিটনেসের উৎসাহ অবশ্যই ভালো, কিন্তু শরীরকে প্রস্তুত না করে হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। সুস্থ থাকতে চাইলে 'উইকএন্ড ওয়ারিয়র' নয়, বরং প্রতিদিনের নিয়মিত শরীরচর্চাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
