উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনকে চিকিৎসকরা বলেন 'সাইলেন্ট কিলার' বা 'নীরব ঘাতক'। কারণ, শরীরের ভেতরে নিঃশব্দে ক্ষতি চালিয়ে গেলেও অনেক সময় কোনও উপসর্গই দেখা যায় না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তার কিছু ছাপ মুখেও ফুটে উঠতে পারে।
ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন ডে বা বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসে চিকিৎসকদের বার্তা, শুধু মাথা ঘোরা বা বুক ধড়ফড় নয়, কখনও কখনও মুখের কিছু পরিবর্তনও শরীরের ভেতরের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। যদিও শুধুমাত্র মুখ দেখে উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় করা সম্ভব নয়, তবু এই লক্ষণগুলো অবহেলা না করাই ভালো।
নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রেশার মাপছেন তো? ছবি: সংগৃহীত
মুখ লাল হয়ে যাওয়া কি সতর্কবার্তা?
অনেকেরই হঠাৎ মুখ লাল হয়ে যায়। গরম, ঝাল খাবার, মানসিক চাপ বা মদ্যপানের কারণেও এমন হতে পারে। তবে চিকিৎসকদের মতে, রক্তচাপ আচমকা বেড়ে গেলেও মুখের রক্তনালী প্রসারিত হয়ে ফ্লাশিং বা লালভাব দেখা দিতে পারে। যদি বারবার এমন হয় এবং তার সঙ্গে মাথা ঘোরা বা অস্বস্তি থাকে, তা হলে রক্তচাপ পরীক্ষা করানো জরুরি।
চোখ-মুখ ফুলে থাকলেও সতর্ক হোন
সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখের চারপাশ ফুলে থাকা বা মুখে অস্বাভাবিক ফোলাভাব অনেক সময় কিডনির সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির উপর চাপ তৈরি করে, ফলে শরীরে জল জমতে শুরু করতে পারে। বিশেষ করে ক্লান্তি, প্রস্রাবের পরিবর্তন বা শরীর ভারী লাগার মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
চোখেও ধরা পড়তে পারে উচ্চ রক্তচাপের ছাপ
উচ্চ রক্তচাপ শরীরের সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তার প্রভাব পড়তে পারে চোখেও। চোখ লাল হয়ে যাওয়া, ঝাপসা দেখা বা চোখের ভেতরে ছোট রক্তনালী ফেটে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় নিয়মিত চোখ পরীক্ষার সময়ই প্রথম ধরা পড়ে হাইপারটেনশনের ইঙ্গিত।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ডায়েটেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ছবি: সংগৃহীত
স্ট্রেসের ছাপও ফুটে ওঠে মুখে
চাপ, উদ্বেগ, কম ঘুম এবং দীর্ঘদিনের মানসিক ক্লান্তি উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ। চিকিৎসকদের মতে, ক্লান্ত চোখ, মুখে টানটান ভাব, দাঁত চেপে থাকার অভ্যাস বা অনিদ্রার ছাপ শরীরের বাড়তি স্ট্রেসকেই প্রকাশ করে, যা ধীরে ধীরে রক্তচাপ বাড়াতে পারে।
কোন উপসর্গ দেখলে দেরি করবেন না?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাইপারটেনশনের কোনও লক্ষণ থাকে না। তবে রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেলে কিছু সতর্ক সংকেত দেখা দিতে পারে। যেমন-
- তীব্র মাথাব্যথা
- মাথা ঘোরা
- বুকে ব্যথা
- শ্বাসকষ্ট
- ঝাপসা দেখা
- নাক দিয়ে রক্ত পড়া
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
এই উপসর্গগুলো হঠাৎ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি।
কেন কম বয়সিদের মধ্যেও বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন ৩০-৪০ বছর বয়সিদের মধ্যেও দ্রুত বাড়ছে হাইপারটেনশনের প্রবণতা। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ, শরীরচর্চার অভাব, অতিরিক্ত নুন ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া, ধূমপান, কম ঘুম, মানসিক চাপ এবং দীর্ঘ স্ক্রিনটাইম এর বড় কারণ। ভারতে হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপ এখন বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, বিশেষ করে শহুরে তরুণদের মধ্যে।
শরীরকে ফিট রাখতে হলে। ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন রক্তচাপ?
- খাবারে নুন কমান
- প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন
- নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা করুন
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমোন
- ধূমপান ও মদ্যপান কমান
- যোগব্যায়াম বা মেডিটেশনের মাধ্যমে মানসিক চাপ কমান
- নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন
চিকিৎসকদের কথায়, মুখের পরিবর্তন কখনও কখনও শরীরের ভেতরের সমস্যার আভাস দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু হাইপারটেনশন ধরা পড়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হল নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা। সময়মতো সতর্ক হলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা কিডনির জটিলতার মতো বড় বিপদ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
