সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: আইপ্যাকের দপ্তরে আচমকা ইডি হানা। দলের 'গোপন নথি' বাঁচাতে অতন্দ্র প্রহরীর মতো ছুটে গেলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে বেরোলেন ফাইল হাতে। সেখান থেকে ছুটলেন আইপ্যাকের অফিসে। সেখান থেকেও নথি তুলে নিলেন গাড়িতে। মুখ্যমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ নিয়ে বৃহস্পতিবার থেকেই উত্তাল গোটা দেশের রাজনীতি। সমর্থকদের নজরে মুখ্যমন্ত্রী 'হিরো', আবার বিরোধী নজরে তিনি 'ভিলেন'।
'বাংলার অগ্নিকন্যা'র এই পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই অনেকের মনে পড়ছে পাঁচ দশক আগের আর এক 'জননেত্রী'র গল্প। তিনি 'আয়রন লেডি' ইন্দিরা গান্ধী। শোনা যায়, সিবিআইয়ের হাত থেকে গোপন নথি লুকোতে তিনি নাকি নিজের পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধীর পাস্তা মেকারের সাহায্য নিয়েছিলেন। যদিও সেই গুঞ্জন সমর্থন করার মতো কোনও পোক্ত প্রমাণ কেউই দেখাতে পারেননি।
প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মমতা। নিজস্ব চিত্র।
সালটা ১৯৭৭। সদ্য জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করেছেন ইন্দিরা। লোকসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়। সব অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করতে সরকার গঠন করেছে শাহ কমিশন। অভিযোগ, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাকি সেই কমিশনের ডাকা সাড়া দিচ্ছিলেন না। তদন্তে সহযোগিতা করছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে মোরারজি দেশাইয়ের সরকার ধৈর্য হারিয়ে ইন্দিরাকে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭৭ সালের ৩ অক্টোবর আচমকা ইন্দিরার তৎকালীন বাসভবনে হানা দেন সিবিআইয়ের দুই দুঁদে আধিকারিক। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা আছে ক্যাথরিন ফ্র্যাঙ্কের লেখা ইন্দিরা: দ্য লাইফ অফ ইন্দিরা নেহরু গান্ধী।
ক্যাথরিন ফ্র্যাঙ্কের বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন পড়ন্ত বিকালে ইন্দিরার বাড়িতে তাঁর ছেলে সঞ্জয় ও পুত্রবধূ মানেকা ব্যাডমিন্টন খেলছিলেন। আচমকা বাড়িতে ঢোকেন সিবিআইয়ের দুই দুঁদে আধিকারিক। সোজা চলে যান বাড়ির সদর দরজায়। ইন্দিরা গান্ধী দরজা খুলতেই তাঁরা সটান বলে দেন, "আপনাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।" প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মানসিকভাবে এই ধরনের পরস্থিতির জন্য প্রস্তুতই ছিলেন। যদিও তিনি অনুমান করতে পারেননি শাহ কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার আগেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। তবে দুয়ারে দুই সিবিআই আধিকারিককে দেখে বিচলিত হননি 'আয়রন লেডি'। শান্ত সুরে তিনি বলেন, "আমাকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় দিতে হবে।"
ইন্দিরা গান্ধীর রেপ্তারির মুহূর্ত। ফাইল ছবি।
সিবিআই আধিকারিকদের থেকে সময় চেয়ে নিয়ে সোজা ভিতরে চলে যান ইন্দিরা। ফেরেন রাত আটটার সময়। টানা দু'ঘণ্টা অপেক্ষায় দরজার সামনেই ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই সিবিআই আধিকারিক। কী হল এই দু'ঘণ্টায়? ক্যাথরিন ফ্র্যাঙ্কের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই দু'ঘণ্টায় ইন্দিরা একাধিক ফোন করেন। তাঁর আচমকা গ্রেপ্তারির খবর পৌঁছে দেন কর্মীদের কাছে। খবর দেন সংবাদমাধ্যমেও। উদ্দেশ্য ছিল, কর্মীদের একজোট করা। তবে এর মধ্যে আরও একটি কাজ নাকি করেছিলেন ইন্দিরা। কিছু গোপন নথি তিনি পুত্রবধূ ইন্দিরা গান্ধীর 'পাস্তা মেকারে' ঢুকিয়ে কুটিকুটি করে কেটে দেন। যাতে কোনওভাবেই ওই নথি উদ্ধার করা সম্ভব না হয়। সোনিয়া ইটালিয়ান হওয়ার সুবাদে পাস্তা খেতে পছন্দ করেন। সেকারণেই সঙ্গে পাস্তা মেকার রাখতেন। সেই পাস্তা মেকারই নাকি সেদিন সহায় হয়েছিল ইন্দিরার। যদিও ঠিক কোন কাগজ ইন্দিরা নষ্ট করেন, বা আদৌ নষ্ট করেছিলেন কিনা, সেটা প্রমাণসাপেক্ষ।
আটটার পর ইন্দিরা যখন বেরোলেন ততক্ষণে তাঁর বাড়ির সামনে সিবিআই অফিসে সাংবাদিকদের ভিড়ে লোকারণ্য পরিস্থিতি। দেশজুড়ে পথে নেমে গিয়েছেন হাজার হাজার কংগ্রেস কর্মী। এমনকী বাধ্য হয়ে রাতেই আদালত খুলতে হয়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে সেই রাতেই আদালত জানিয়ে দেয়, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর গ্রেপ্তারি বেআইনি। সিবিআইয়ের কাছে তাঁকে গ্রেপ্তার করার মতো কোনও নথিই ছিল না। আজ পাঁচ দশক বাদে সেই এজেন্সি 'দৌরাত্ম্যে'ই ভারতীয় রাজনীতিতে একই ধরনের ঘটনা ঘটল।
