ছ'বছর আগে বাজেট বক্তৃতা দিতে গিয়ে নিজের রেকর্ডই ভেঙেছিলেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। ২০১৯ সালে তিনি বাজেট পড়েছিলেন প্রায় ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট ধরে। কিন্তু ২০২০ সালে তা বেড়ে হয় প্রায় ৩ ঘণ্টা। নির্দিষ্ট করে বললে, ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। তার পর থেকে লাগাতার কমেছে নির্মলার বাজেট বক্তৃতার সময়। কমতে কমতে ২০২৬ সালে তা এসে ঠেকল মাত্র দেড় ঘণ্টায়। তবে গত বছর বাজেট বক্তৃতার জন্য আরও কম সময় নিয়েছিলেন নির্মলা। মেরেকেটে ৭৭ মিনিট। এই বিষয়টি নজরে রেখে আর্থিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের প্রশ্ন, কেন্দ্রীয় বাজেট কি ক্রমশই 'কৌলীন্য' হারাচ্ছে?
এক দশক আগেও, আলাদা বাজেট বরাদ্দ ছিল রেলের জন্য। আলাদা বাজেটের সেই দস্তুর অনেক দিন আগেই হারিয়েছে রেল মন্ত্রক। এখন রেলের বরাদ্দও মূল বাজেটের সঙ্গেই জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আগে বাজেটে একটা বড় জায়গা থাকত পরিকল্পনা খাতে খরচ। কিন্তু যোজনা পরিষদ তুলে দেওয়া হয়েছে। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাও আজ ইতিহাস। কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে অবশ্য টিঁকে আছে অর্থ কমিশন। এখন সকলে সেই কমিশনের রিপোর্টের দিকেই সাগ্রহে তাকিয়ে থাকেন সকলে। কিন্তু আর্থিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, এখন সে দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয় না। তবে বাজেটের সময় কমার কারণ এটা নয় বলেই মনে করেন অনেকে। তাঁদের মত, এখন বাজেটে শুধু বিশেষ অংশ পড়া হয়। থাকে শুধু বড় ঘোষণা এবং নীতিগত অবস্থানের কথা। বাকি সব খুঁটিনাটি থাকে অন্য নথিতে, যা বক্তৃতার পর প্রকাশ করা হয়। ২০২১ সালে 'পেপারলেস' বাজেটের নীতি নিয়েছে মোদি সরকার।
১৯৯১ সালের বাজেটে দেশের অর্থনীতিকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং। সে বার বাজেট পাঠ করেছিলেন তিনি, শব্দ সংখ্যার নিরিখে তা-ই দীর্ঘতম। ১৮ হাজার ৬৫০ শব্দেব বাজেট পাঠ করেছিলেন মনমোহন। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে অরুণ জেটলি। ২০১৮ সালে মোদি জমানায় জেটলি পাঠ করেছিলেন ১৮ হাজার ৬০৪ শব্দ। তবে সময়ের নিরিখে দীর্ঘতম বাজেট বক্তৃতা নির্মলার। সেই ২০২০ সালে, অতিমারিকালে। সেবার দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা নিয়ে দুঃখপ্রকাশও করেছিলেন নির্মলা। বলেছিলেন, "সকলের অসুবিধা হয়েছে, সে জন্য দুঃখিত। কিন্তু অর্থনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা জরুরি ছিল। তাই বাজেট দীর্ঘ হয়েছে।"
সেই বছর বাজেট বক্তৃতার সময় অসুস্থও হয়ে পড়েছিলেন নির্মলা। পরে বিষয়টি নিয়ে তাঁর সহাস্য মন্তব্য, "আমি জানি না আপনাদের মনে হয়েছে কি না যে, এই মহিলা কেন আড়াই ঘণ্টা ধরে কথা বলছেন! কিন্তু অনেক কিছু বলার ছিল। আর যা বলেছি, তা করাই এখন আমাদের কর্তব্য। আমি কোনও রেকর্ড করার জন্য এতক্ষণ ধরে কথা বলিনি। বরং বাজেটের প্রস্তুতি পর্বে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাদের সব পক্ষের আশা পূরণ করতে গিয়েই বক্তৃতা দীর্ঘ হয়েছে।" ঘটনাচক্রে তার পর থেকেই ক্রমশ কমেছে নির্মলার বাজেট বক্তৃতা। ২০২১ সালে অর্থমন্ত্রী বলেছেন ১১০ মিনিট, ২০২২ সালে ৯২ মিনিট, ২০২৩ সালে ৮৭ মিনিট, ২০২৪ সালে ৮৫ মিনিট। আবার ২০২৪ সালেই ফেব্রুয়ারির অন্তর্বর্তী বাজেট ছিল ৫৬ মিনিটের। নির্মলার সবচেয়ে কম সময়ের পূর্ণ বাজেট ছিল ২০২৫ সালে।
বিশেষজ্ঞদের মত, আগে বাজেটের দিন ছিল সরকারের আর্থিক ভাবনা উন্মোচনের দিন। সেই দিনই সরকার তার আর্থিক নীতি ঘোষণা করত। কিন্তু এখন গোটা বছর ধরেই নতুন নীতি আসে, বদলায়। বাজেট বক্তৃতার সেই ওজন এখন আর নেই। এর একটা সমস্যা আছে। এর ফলে তৈরি হয় নীতি-অনিশ্চয়তা। আর এই খানেই ঠোক্কর খান লগ্নিকারীরা। তাঁরা একটি নির্দিষ্ট নীতির আবহে টাকা ঢালতে চান। কিন্তু নীতি যদি ঘন ঘন বদলাতে থাকে, তা হলে তাঁরা তাঁদের বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়ান। আর এই জায়গাটা কোনও লগ্নিকারীই পছন্দ করেন না।
এক বিশেষজ্ঞের কথায়, "বাজেটের আগে বা পরেই গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক নীতিগুলো ঘোষিত হতে দেখা গিয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে। ব্যবসার ক্ষেত্রে কর ছাড়ের ঘোষণা থেকে শুরু করে প্রায় সবই। বাজেটের বাইরে গিয়ে এই সব ঘোষণা কিন্তু বাজেটের গুরুত্বই কমিয়ে দিচ্ছে। বাজেটের প্রতিশ্রুতি আর তা মেনে বরাদ্দের সাযুজ্য এখনও সেই ভাবে কিন্তু খুঁটিয়ে দেখা হয়নি। তবে মাথায় রাখতে হবে, বাজেটের বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তিই হল প্রতিশ্রুতি, বরাদ্দ এবং খরচের মধ্যে সাযুজ্য।"
