“জোলিয়িল্লা, ভাগ্দানঙ্গল কেট্টু মডুত্তু।”
অটোরিকশার এক্সিলারেটরে জোর মোচড় দিয়ে বললেন যুবক পি বি সুরেশ। (এখানে এভাবেই নাম বলা হয়, পুরো নাম নাকি সহজে মনে রাখা যায় না!) প্রচণ্ড উত্তেজিত সে। ইশারায় জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপার কী? সুরেশ বড় রাস্তা থেকে বাঁক নিয়ে একটা পাড়ার রাস্তায় ঢুকে পড়ে হিন্দিতে বলল, “চাকরি নেই, শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে ক্লান্ত।”
সুরেশ কমার্স গ্র্যাজুয়েট। কলেজের পড়াশোনা শেষ করে ক’টা বছর সরকারি-বেসরকারি চাকরির চেষ্টা করেছে। তারপর সব ছেড়ে একটা অটোরিকশা কিনে রাস্তায় নেমে পড়েছে। যুবক সুরেশের কথায় স্পষ্ট রাজ্যের কর্মসংস্থান নিয়ে ক্ষোভটা। কিছুক্ষণ আগে এই ক্ষোভটাকেই নির্বাচনের (Kerala election 2026) বাজারে ‘মূলধন’ করতে দেখিছি জেভিয়ার জুলাপ্পানকে। তিনি এবার নির্বাচনে এনডিএ সমর্থিত টোয়েন্টি২০ পার্টির (টিটিপি) প্রার্থী হয়েছেন কোচি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। পাল্লুরুথি থেকে থোপ্পুমপাড়ি পর্যন্ত দীর্ঘ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কর্মীরা। অস্থায়ী পার্টি অফিসের বাইরে প্রচার-গাড়ি মেরামতের কাজ চলছিল জোর কদমে। জেভিয়ার নিজেকে ‘স্থানীয় মুখ’ হিসাবে তুলে ধরছেন। বিখ্যাত ষোড়শ শতাব্দীর আওয়ার লেডি অফ হেলথ চার্চের সামনে দাঁড়িয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, “পশ্চিম কোচির উন্নয়নের জন্য বহু আগেই রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তার বড় অংশ আজও বাস্তবায়িত হয়নি।” তাঁর প্রচার এখন কেন্দ্রীভূত মুলামকুঝি ও থোপ্পুমপাড়ি অঞ্চলে, যেখানে টিটিপি-র সংগঠন ক্রমশ শক্ত হচ্ছে। তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন কর্মসংস্থান ইস্যুটিতেও। কারণ, শুধু রাস্তাঘাট উন্নয়নের বুলিতে আর জনতার মন ভিজছে না।
শিল্প বা কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তেমন বাড়েনি। রাজনীতি অনেক হয়েছে, এবার চাকরি চাই। ফলে যুব সমাজের একটা বড় অংশ এবার বিকল্পের দিকে তাকিয়ে, আর সেই জায়গাতেই টিটিপি নিজেদের জায়গা তৈরি করছে।
কেরলমের কোচি বিধানসভা কেন্দ্রের লড়াই এবার অন্য মাত্রা পেয়েছে। প্রচলিত এলডিএফ-ইউডিএফ সমীকরণের বাইরে উঠে এসে আলোচনার কেন্দ্রে এখন টিটিপি। তাদের ঘিরেই ঘুরছে অনেক হিসেব-নিকেশ। কিন্তু ইশ্বরের আপন দেশের মাটির নিচে জমে থাকা বড় ইস্যু একটাই– কর্মসংস্থান। আর সেই কারণেই ক্ষুব্ধ যুব ভোটাররা এই কেন্দ্রে ‘গেমচেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারেন। সিপিএম প্রার্থী কে জে ম্যাক্সি নিজের কাজের খতিয়ান সামনে রেখে আত্মবিশ্বাসী। তাঁর কথায়, “গত দশ বছরে উন্নয়ন আর জনকল্যাণই আমার শক্তি। মানুষ তা জানে।” সংগঠনের দিক থেকেও এলডিএফ এই কেন্দ্রে এখনও শক্তিশালী বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের। কিন্তু এই ছবির মাঝেই দ্রুত উঠে আসছে টিটিপি-র প্রভাব। কেরলম বিধানসভার ১৪০টি আসনের মধ্যে ১৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে টিটিপি। জেভিয়ারের মতে, বিজেপি ও টোয়েন্টি২০-র সম্মিলিত ভোটব্যাঙ্ক এবার বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।
স্থানীয়দের কথায়, এই দলটিই ‘অন্যরকম বিকল্প’ হিসাবে সামনে আসছে। মুলামকুঝির এক তরুণ ভোটার রাহুল কে জি বলছেন, “টিটিপি অন্তত কাজের কথা বলে, কিছু জায়গায় করেছে বলেও শুনেছি। ডিগ্রি নিয়ে বসে আছি, কাজ নেই। শুধু রাস্তা বা বিল্ডিং করলেই তো হবে না, চাকরি কোথায়?” একই সুর থোপ্পুমপাড়ির বাসিন্দা নাসিরের গলায়, “পুরনো দলগুলো অনেক সুযোগ পেয়েছে, কিন্তু যুবদের জন্য কী করেছে?” স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ক্ষোভ স্পষ্ট। তাঁদের অভিযোগ, শিল্প বা কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তেমন বাড়েনি। রাজনীতি অনেক হয়েছে, এবার চাকরি চাই। ফলে যুব সমাজের একটা বড় অংশ এবার বিকল্পের দিকে তাকিয়ে, আর সেই জায়গাতেই টিটিপি নিজেদের জায়গা তৈরি করছে।
কেরলম বিধানসভার ১৪০টি আসনের মধ্যে ১৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে টিটিপি।
টিটিপি একটি রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠন, যা গড়ে ওঠে কিঝাক্কাম্বলম-কে কেন্দ্র করে। পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে শিল্পগোষ্ঠী কাইটেক্স গ্রুপ-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাবু এম জ্যাকবের। ২০১৫ সালে কিঝাক্কাম্বলম পঞ্চায়েত দখল করে এবং ‘কর্পোরেট স্টাইল গভর্ন্যান্স’ মডেল চালু করে টিটিপি, যেখানে পরিচ্ছন্নতা, পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য পরিষেবার কাজ করে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিরোধীরা যাকে বলছে, ‘কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি’।
