shono
Advertisement
Anandapur Fire

ব্যবসা বাড়াতে তুচ্ছ শ্রমিক নিরাপত্তা! আনন্দপুর 'মৃত্যুপুরী'তে কাঠগড়ায় 'ওয়াও মোমো' কর্তৃপক্ষ

দমকলের অনুমতি ছাড়াই আনন্দপুরের নাজিরাবাদে দিনের পর দিন ধরে মোমো তৈরির কারখানা চলছিল। দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুনের গ্রাসে চলে কারখানাটি।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 04:09 PM Jan 27, 2026Updated: 05:46 PM Jan 27, 2026

নামেই যত চমক! কাজের বেলায় চরম উদাসীনতার পরিচয় দিল নামী ফুড জায়েন্ট 'ওয়াও মোমো'। বাইপাস লাগোয়া আনন্দপুরের (Anandapur) প্রত্যন্ত এলাকা নাজিরাবাদের জলাজমিতে দমকলের অনুমতি ছাড়াই তৈরি হয়ে গিয়েছিল কারখানা। প্রশাসনের নজরদারির আড়ালে ব্যবসা তরতরিয়ে বেড়ে উঠবে, এমনটাই বোধহয় ভেবেছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিপদ যখন আসে, কাউকে রেয়াত করে না। তাই কারখানার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আট আটটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া, কারখানা ভস্মীভূত করে দেওয়ার পাশাপাশি ফাঁস করে দিল কর্তৃপক্ষের এই উদাসীন মনোভাব। আনন্দপুরের এত বড় অগ্নিকাণ্ডের প্রেক্ষিতে ফোনে 'ওয়াও মোমো'র এক কর্ণধার সাগর দারিয়ানির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজেরও জবাব দেননি। 

Advertisement

কোনওক্রমে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন কারখানার সুপারভাইজার। নিজস্ব ছবি

যদিও ঘটনার দেড়দিন পর কারখানার সুপারভাইজার ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নে জর্জরিত হতে হতে জবাব দিলেন, ''এখানে বেআইনি কিছু হচ্ছিল না।'' তবে যে দমকলের ডিজি নিজে জানিয়েছেন, তাঁদের অনুমতি ছাড়া কারখানা চলছিল? তার জবাব আর দিতে পারেননি সুপারভাইজার। এখন প্রশ্ন হল, মোটা অঙ্কের মুনাফার স্বার্থে এই যে নিরাপত্তাহীনতার 'বলি' হল ৮টি প্রাণ, তাদের পরিবারকে জবাব কে দেবে?

নাজিরাবাদের কারখানা ও গুদামের সমস্ত সামগ্রী পুড়ে ছাই। নিজস্ব ছবি

আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ড (Anandapur Fire) নিয়ে কেন হঠাৎ এত শোরগোল, এত সমালোচনা? তা বোঝার আগে ঘটনা পরম্পরা একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। রবিবার গভীর রাতে নাজিরাবাদের 'ওয়াও মোমো'র কারখানায় ঘুমের মধ্যেই আগুনের তাপ টের পান শ্রমিকরা। মুহূর্তের মধ্যে অগ্নিবলয় ঘিরে ধরে তাঁদের। পালানোর পথ ছিল না। কারখানার প্রথম দরজাটি খোলাই যায়নি। ফলে বদ্ধ কারখানায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয় আটজনের। তবে এই সংখ্যা বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা সকলের। দেড় দিন পেরিয়ে গেলেও ধ্বংসস্তূপে আটকে আরও অনেকে। নিখোঁজের সংখ্যা পেরিয়েছে ১৫। দমকল যখন আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে, তখন লেলিহান শিখার গ্রাসে চলে গিয়েছে কারখানা এবং তার পাশের একটু গুদামও। একগাদা দাহ্য পদার্থেই জতুগৃহ হয়ে উঠেছে এলাকা। যেদিকে দু'চোখ যায়, কালো, পোড়া জিনিসপত্র ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না।

ঘটনার দেড়দিন পর কারখানার সুপারভাইজার ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নে জর্জরিত হতে হতে জবাব দিলেন, ''এখানে বেআইনি কিছু হচ্ছিল না।'' তবে যে দমকলের ডিজি নিজে জানিয়েছেন, তাঁদের অনুমতি ছাড়া কারখানা চলছিল? তার জবাব আর দিতে পারেননি সুপারভাইজার।

মঙ্গলবার সকালে নাজিরাবাদে গিয়ে অনেক কিছুই জানা গেল। নামী মোমো প্রস্তুতকারক সংস্থার ওই কারখানায় তিনটি রান্নাঘর ছিল। প্রথমটিতে রান্না হতো না। সেখানে হতো প্যাকেজিংয়ের কাজ। দুই এবং তিন নম্বর রান্নাঘরে রান্না হতো। রবিবার রাতে তিন নম্বর রান্নাঘর থেকে যখন আগুন ছড়ায়, তখন ঘুমোচ্ছিলেন সকলে। প্রথম রান্নাঘর পেরিয়ে মূল দরজা খুলে বেরতে চেয়েও পারেননি। আগুন থেকে বাঁচতে অসহায় শ্রমিকদের আকুতি পর্যবসিত হয়েছিল 'ব্যর্থ পরিহাসে'। ফলস্বরূপ কারখানা থেকে উদ্ধার হয়েছে দগ্ধ মৃতদেহ, এখনও কতজন যে নিখোঁজ, তার সঠিক সংখ্যা জানা নেই প্রশাসনেরও। 

আনন্দপুরে স্বজনহারাদের হাহাকার। নিজস্ব চিত্র

দেশের মধ্যে অন্যতম বড় ফুড জায়েন্টের নাম এখন 'ওয়াও মোমো'। ব্যবসা তাদের দিনদিন ফুলেফেঁপে উঠেছে। কিন্তু সবই কি অসদুপায়ে? নাজিরাবাদে সংস্থার ছাই হয়ে যাওয়া কারখানা এই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে? প্রান্তিক মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমে তৈরি হয় সুস্বাদু সব মোমোর পদ। চড়া দামে বিক্রি হয় গোটা দেশজুড়ে। 'হীরক রাজার দেশ'-এ হীরার খনির শ্রমিকদের মতোই এঁদের জীবন। সুস্বাদু খাবার তৈরি করলেও নিজেরা সেসবের স্বাদ পাননি কস্মিনকালেও। শুধু দু'বেলা দু'মুঠো ভাত জোটাতে মেদিনীপুর থেকে এসেছিলেন এসব শ্রমিকরা। সেই ক্ষুণ্ণিবৃত্তির তাগিদ তাঁদের পৌঁছে দিল মৃত্যুর দোরগোড়ায়। 

স্বজনের খোঁজ পেতে অপেক্ষা মেদিনীপুরের পরিবারের। নিজস্ব ছবি

দায় কার? যাঁরা কাজ দিয়েছেন, তাঁদেরই। দরিদ্র মানুষের কাজের সংস্থান করেছেন বলে আর কোনও ন্যূনতম দায়িত্ব নেবেন না, তা তো হয় না। মুনাফার অর্থ নিজেদের পকেটে ভরতে এতটাই বুঁদ যে কর্মী সুরক্ষায় এতটুকুও নজর নেই মালিকদের! এই অবহেলার দহনও কম নয়। সেই জ্বালায় জ্বলতে থাকা জীবন থেকে মানুষগুলোর প্রশ্ন কিন্তু এভাবেই অগ্নিশলাকার মতো ধেয়ে আসবে ওই মালিকদের দিকে। তখন নিজেদের আগুনের আঁচ থেকে বাঁচাতে পারবেন তো?

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement