হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে বৈঠকের পর সেলিমকে কার্যত সেন্সর করল সিপিএম! পাশাপাশি হুমায়ুনের সঙ্গে জোট নিয়ে আপাতত কোনও কথা হোক সেটাও চায় না পার্টি। সূত্রের খবর, হুমায়ুনের সঙ্গে ফের বৈঠক বা বিতর্কিত কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সেলিমকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কারণ, পার্টির বড় অংশ এবং বাম শরিকরা সেলিমের পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ। বাম শরিকরা চাইছেন ফ্রন্টের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা হোক। পুরো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন প্রবীণ সিপিএম নেতা তথা বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু।
সেলিমকে বলা হয়েছে, রাতারাতি মন বুঝতে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। পাশাপাশি হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠকের সমর্থনে এই মুহূর্তে পার্টির কোনও নেতৃত্ব যেন বিবৃতি না দেন সেটাও পার্টির তরফে অলিখিত নির্দেশ গিয়েছে জেলায় জেলায়। তবে সেলিমকে ইঙ্গিত করে শনিবার হুমায়ুনের তীব্র সমালোচনা করেছেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী। সুজন বলেন, "তৃণমূল ও বিজেপির বিরুদ্ধে সকলকে একত্র নিয়ে আসাটা আমাদের কাজ। কিন্তু দেখতে হবে তারা ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবাপন্ন কি না। উনি (হুমায়ুন) বলেছেন সেলিমের সঙ্গে আমার তিনবার কথা হয়েছে। আমার জানা নেই। সেলিম সেটা বলতে পারবেন।"
এরপরই আরও সুর চড়িয়ে সুজনের বক্তব্য, "উনি (হুমায়ুন) কেটে ভাসিয়ে দেব বলেছিলেন। বলেছেন আর কোনওদিন বলবেন না। কিন্তু কিছু কথা আছে রোজ বলার দরকার হয় না। একবার-আধবার বললেই বোঝা যায় যে মনোভাবটা কী। উনি বলছেন ওঁকে বলতে বলা হয়েছে, তাহলে এরা তো ন্যাকা চৈতন্য নয়! কেউ বললেন, আর উনি বলে দিলেন। সেকুলার ক্রিডেনশিয়াল অর্জন করতে হয়। যারা এটা প্র্যাকটিস করতে পারে না তাদের সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাস হওয়াটা কঠিন। কে হুমায়ুন কবীর? তার সম্পর্কে উত্তর দিতে হবে।’’
হুমায়ুন-সেলিম সখ্য যে সুজন ভালোভাবে নিচ্ছেন না সেটাই তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। গত লোকসভা ভোটের সময় এই হুমায়ুন কবীরকেই সাম্প্রদায়িক বলে তোপ দেগেছিল সিপিএম। লোকসভা ভোটের আগে হুমায়ুন হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ‘মুর্শিদাবাদ জেলায় হিন্দুদের ভাগীরথীতে কেটে ভাসিয়ে দেওয়ার’। সেই সময় সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী এই মন্তব্যের জন্য হুমায়ুনের গ্রেপ্তারিও দাবি করেছিলেন।
নিউটাউনের হোটেলে জোট নিয়ে হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর দলের মধ্যে ও বামফ্রন্টেও কাঠগড়ায় সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। সিপিএম কর্মী-সমর্থকদের বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শনিবারও সমালোচনার ঝড় অব্যাহত। শুধু তাই নয়, এই বৈঠক ইস্যুতে ইতিমধ্যেই সিপিএম কার্যত আড়াআড়িভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
জানা গিয়েছে, পার্টির শৃঙ্খলা মেনে প্রকাশ্যে সেভাবে মুখ না খুললেও দলের অভ্যন্তরে ঘনিষ্ঠ মহলে হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করেছেন গৌতম দেব, রবীন দেব, সুজন চক্রবর্তী, শ্রীদীপ ভট্টাচার্য, কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়, অশোক ভট্টাচার্যরা। এঁদের কেউ সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, কেউ আবার প্রবীণ সিপিএম নেতা। প্রবীণ সিপিএম নেতা কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, আর যাই হোক সিপিএম নিশ্চয়ই কোনও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে জোট করবে না। যা পরোক্ষে সেলিমকে বার্তা দেওয়া বলেই মনে করছে দলের একাংশ।
বাংলায় সিপিএমের নৈতিক অবস্থান হল, রাজ্যে তৃণমূল ও সাম্প্রদায়িক বিজেপির মতো শক্তিকে পরাস্ত করা। কিন্তু তৃণমূল ও বিজেপি বিরোধিতায় নেমে হুমায়ুনের সঙ্গে সেলিমের সাক্ষাৎকার ঘিরে যে বিতর্ক পার্টিতে তৈরি হয়েছে তা সাম্প্রতিক অতীতে দেখা যায়নি বলেই মত সিপিএমের একাংশের। ফলে এখন সেই হুমায়ুনের সঙ্গে হাত মেলানোর চেষ্টা, সিপিএমের একাংশের দ্বিচারিতাকেই সামনে এনে দিল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
যেমন, যে হুমায়ুনের একসময় প্রবল সমালোচনা করেছিলেন সেলিমপন্থী সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ। সেই শতরূপই এখন আবার হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠককে সমর্থন করছেন। এদিকে, বাম শরিক ফরওয়ার্ড ব্লক এবং আরএসপিও সেলিমের সমালোচনায় সরব হয়ে ফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুকে ইতিমধ্যেই নালিশ জানিয়েছেন। হুমায়ুনের সঙ্গে তাঁর বৈঠক নিয়ে সরব হওয়ায় ফরওয়ার্ড ব্লক ও আরএসপিকে পালটা কটাক্ষ করেছিলেন সেলিম। ফলে এই দুই শরিক বিমানের কাছে নালিশ জানিয়েছেন। সূত্রের খবর, বিমান বসু শরিকদের বলেছেন, বিষয়টা আমরা টেকআপ করছি। ভোটের মুখে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টা বামফ্রন্টের বৈঠকে তুলবেন না। তাতে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। শুধু তাই নয়, সেলিমকেও বলা হয়েছে, বিরূপ কোনও প্রতিক্রিয়া দিলে বিতর্ক হবে। তাই প্রতিক্রিয়া এড়াতে হবে।
পার্টির একাংশ প্রশ্ন তুলেছে, শূন্যের গেরো কাটানো লক্ষ্য। কিন্তু সে জন্য পার্টির নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিতে হবে? সাম্প্রদায়িক নেতার সঙ্গেও হাত মেলাবে দল? জন উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে বৈঠকের পর থেকে দলের অন্দরে আপাতত এই প্রশ্নেই বিদ্ধ সেলিম। একাংশ মনে করছে, পার্টির কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিচ্ছেন রাজ্য সম্পাদকই। সিপিএমের এক কর্মী প্রশ্ন করে পার্টি সমর্থকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘পার্টির রাজ্য কমিটির সভায় আলোচনা ছাড়াই সেলিমবাবু কীভাবে হুমায়ুনের মতো আনাড়ি, দলবদলুর সঙ্গে দেখা করলেন। এর আগেও বহুবার এধরনের কর্মকাণ্ড উনি ঘটিয়েছেন। সেলিমবাবু কি পার্টির নিয়মশৃঙ্খলার বাইরে?’
