প্রসঙ্গ বিদেশি বাজারে বিনিয়োগ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে এগোলে লাভে থাকা সম্ভব? বিপরীতে নয়? সাধারণ ইনভেস্টর যিনি, তাঁর কি বিদেশের মাটিতে পা রাখা উচিত? বিশেষজ্ঞরা কী পরামর্শ দেন? জানালেন সজল রায়
একসময় ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে ইক্যুইটির বাজার ছিল শুধুই দেশীয়। বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতার ধাক্কায় সেই ধারণা কিন্ত দ্রুত বদলাচ্ছে। আজ আমার বলতে দ্বিধা নেই যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ গঠনের ক্ষেত্রে বিদেশি বাজারে বিনিয়োগ আর বিলাসিতা নয়। এখন সাধারণ ইনভেস্টরেরও বিদেশের মাটিতেও পা রাখা প্রয়োজন।
আমার বিশ্বাস, বিনিয়োগের সুযোগকে শুধুমাত্র একটা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়। ভারতীয় অর্থনীতি আজ খুব বড় মাপের হলেও, বিশ্বজুড়ে এমন বহু সেক্টর ও ব্যবসা-বাণিজ্য আছে যাদের বৃদ্ধি আগামী দিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। এই সব সেক্টর ও সংস্থা নানা ধরনের ইনভেস্টরের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নেবে। ফলে একটা আন্তর্জাতিক পোর্টফোলিও থাকা উচিত। তা বিনিয়োগকারীদের সামনে নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে।
বিদেশি বাজারে বিনিয়োগের অন্যতম বড় সুবিধা হল ডাইভার্সিফিকেশন বা ঝুঁকির বিস্তার। ভারতের বাজার কোনও বিশেষ সময়ে চাপের মুখে পড়লেও, আমেরিকা, ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়ার কিছু বাজার হয়তো তখন শক্তপোক্ত অবস্থানে থাকতে পারে। অর্থাৎ একাধিক উপায়ে ‘geographical diversification’ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিভিন্ন দেশের মধ্যে নিজের বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিলে, আপনার সামগ্রিক পোর্টফোলিওর অস্থিরতা তুলনামূলকভাবে কমতে পারে।
আর একটা পয়েন্ট আগেই তুলেছি, আর একবার ভাল করে বলি। এমন বহু বিশ্বখ্যাত সংস্থা রয়েছে, যাদের প্রোডাক্ট বা সার্ভিস প্রতিদিন ইন্ডিয়ানরাও ব্যবহার করেন, অথচ সেই সংস্থাগুলোয় সরাসরি ভারতীয় বাজারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা যায় না। উদাহরণ হিসেবে (বিনা পক্ষপাতে) ধরা যেতে পারে Amazon।
আমার মতে আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর বা ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো ভবিষ্যৎমুখী ব্যবসা-বাণিজ্যে খুব ভাল করবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রভাব অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ হবে। ফলে গ্লোবাল মার্কেটসে অংশগ্রহণ মানে শুধুমাত্র ভৌগোলিক বৈচিত্র্য নয়, বরং ইমার্জিং বা নিউ-জেনারেশন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হওয়ার সুযোগও।
এবার গর্ভমেন্ট পলিসির কথা উল্লেখ করি। বিদেশে বিনিয়োগের পথ আগের তুলনায় অনেক সহজ আর সুগম হয়েছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আজ বিদেশি লেনদেন ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব নিয়েছে। লিবারালাইজড রেমিট্যান্স স্কিমের (LRS) মাধ্যমে নির্দিষ্ট লিমিটের মধ্যে বিদেশে লগ্নির সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে আন্তর্জাতিক ফান্ডে বিনিয়োগ এখন অনলাইন মাধ্যমে করা সহজ।
প্রকল্পের সংখ্যা কম হলেও, নতুন বা খুচরো ইনভেস্টরদের জন্য এগুলোই সবচেয়ে সহজ রাস্তা হতে পারে। এই প্রসঙ্গে জানাই, ফিডার ফান্ড নিয়ে পড়ে নেবেন আলাদা ভাবে। এই ধরনের প্রকল্প এদেশে টাকা সংগ্রহ করে বিদেশে অবস্থিত মূল (“মাস্টার” বা ‘‘ডেসটিনেশন’’) ফান্ডে বিনিয়োগ করে। ফলে সরাসরি বিদেশি অ্যাকাউন্ট খোলার ঝক্কি ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাজারে অংশ নেওয়া যায়। নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য এটা তুলনামূলকভাবে সহজ ও সুবিধাজনক পদ্ধতি। একাধিক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টের সুযোগ বাড়াচ্ছে। কোনও বিশেষ উদাহরণ দেব না, তবে একটু খুঁজলেই ভারতীয় ফান্ড হাউসদের ফরেন টাই-আপ নিয়ে জেনে যাবেন। এগুলোর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সামনে নতুন সুযোগ এসেছে।
সব শেষে বলে রাখি যে বিদেশি বিনিয়োগ মানেই অন্ধভাবে অন্য দেশে ইনভেস্ট করা নয়। রিস্ক সেখানেও আছে। তাই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পদের মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য তৈরি করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
লেখক কর্ণধার, অঞ্জলি ইনভেস্টমেন্টস
