Advertisement
অবাক পৃথিবী! জলের নিচে আড়াই হাজার বছর আগের পুরনো শহর, লুকিয়ে কোন রহস্য?
এই আবিষ্কার প্রত্নতাত্ত্বিকদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। জলের তলায় কবর, ধর্মস্থান ও ধর্মীয় স্কুল... সব মিলিয়ে ৭৮টি নির্মাণকে দিব্যি দেখা যাচ্ছে!
একদিন যা ছিল শহর। আজ তা জলের তলায় এক নিস্তব্ধ জনপদ! মাঝে অতিক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৪০০ বছর। তুরস্কের ডিকলে বাঁধের কাছে অবস্থিত জলাধারের নিচে হারিয়ে যাওয়া সেই শহর দেখে তাক লাগল গবেষকদের। সম্প্রতি ডিকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণাপত্রে উল্লেখিত হয়েছে এই আশ্চর্য আবিষ্কারের কথা। জানা যাচ্ছে, জলের তলায় কবর, ধর্মস্থান ও ধর্মীয় স্কুল... সব মিলিয়ে ৭৮টি নির্মাণকে দিব্যি দেখা যাচ্ছে!
তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এই জলাধারটি তৈরি হয়েছিল গত শতকের নয়ের দশকে। সেই সময়ই ডিকলে বাঁধও নির্মিত হয়। এরপরও তিন দশক জলের তলায় সকলের দৃষ্টির অগোচরেই ছিল ওই নির্মাণগুলি। তবে সম্প্রতি বাঁধের একটি গেটে প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা গেলে জলস্তর কিছুটা কমে যায়। আর এরপরই দৃশ্যমান হয় সেই শহর।
ডিকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইরফান ইলদিজ জানাচ্ছেন, “আমাদের দলের তোলা ছবিগুলোতে তো বটেই, কিংবা যখন জলস্তর নিচে নেমে যায়— তখন আমরা দেখতে পাই, এই ঐতিহাসিক নির্মাণগুলি এখনও অখণ্ড অবস্থায় অক্ষতভাবেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।” তিনি আরও জানিয়েছেন, যে ৭৮টি বাড়ি জলের তলায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় এখানে বেশ ভালো জনসমষ্টিরই বাস ছিল।
কাছেই টাইগ্রিস নদী। এবং পার্শ্ববর্তী কৃষিজ জমি দেখে অনুমান করা যায়, এই শহরের মানুষেরও প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিই। পাশাপাশি এখানে মসজিদ, মাদ্রাসাও দেখা গিয়েছে। রয়েছে বহু কবরও। সব মিলিয়ে বর্ধিষ্ণু শহরের চিহ্ন একেবারে সুস্পষ্ট। বলে রাখা ভালো, এজিল জেলা বরাবরই প্রাচীন সভ্যতার ধারক ও বাহক হিসেবেই পরিচিত। খ্রিস্টপূর্বাব্দ পঞ্চম শতাব্দীতে ছিল এই শহর। যা এই অঞ্চলের অন্যান্য সভ্যতার তুলনায় নবীনই।
এই আবিষ্কার প্রত্নতাত্ত্বিকদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। জলের স্তরের ওঠানামা, পলিমাটির স্থানচ্যুতি এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ের কারণে যদি ধ্বংসাবশেষগুলি সংরক্ষণ ও নথিবদ্ধ করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ না করা হয়, তবে দ্রুত এগুলি প্রকৃতির কোলে বিলীনও হয়ে যেতে পারে! তাই দ্রুত স্থানটির মানচিত্র তৈরি করে ভবিষ্যতের জন্য তা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন গবেষকরা।
সেই সঙ্গেই গবেষকদের দাবি, এই আদিম জনপদ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে সেজন্য জলাধারের জলের স্তরকে আরও কমাতে হবে। পাশাপাশি এখানকার পলির স্তরও বেশি পুরু যাতে না হয়, সেটাও নিশ্চিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা। আর এভাবেই ওই জনপদটিকে ওখানে আস্ত অবস্থাতেই রেখে দেওয়া সম্ভব। দ্রুত গবেষণার মাধ্যমে সেই শহরটি সম্পর্কে আরও তথ্য জোগাড় করতে চাইছেন গবেষকরা।
প্রসঙ্গত, জলের নিচে অবস্থিত এই ধরনের ধ্বংসাবশেষগুলি এমন অঞ্চলের অপরিসীম গুরুত্বকেই বুঝিয়ে দেয়। জলের পরিবর্তন, পলি ও ক্ষয়ের মতো নানা বিষয়ে ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। তাই এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করার লক্ষ্যে এর নথিবদ্ধকরণ ও সংরক্ষণ প্রচেষ্টা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। গবেষকদের আশা, ইতিহাসের এই অনন্য আবিষ্কারকে ধ্বংস হয়ে যেতে দিলে অধরা থেকে যাবে অতীতের অশ্রুত কাহিনি।
এই অঞ্চলে এমন প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কার নতুন কথা নয়। তবু কেন এই আবিষ্কারকে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা? আসলে জুলিওপলিসের মতো প্রাচীন শহরের নিদর্শন সময়ের দংশনে আজ জীর্ণ। কিন্তু এই শহরে অবস্থিত বাড়িঘর, ধর্মীয় স্থানগুলির আকার অনেকটাই অবিকৃত। যা থেকে এখানকার স্থাপত্য ইত্যাদি বিষয়ে আরও সম্যক ধারণা করা সম্ভব হচ্ছে।
আবিষ্কৃত নিদর্শনগুলি থেকে পরিষ্কার, ওই জনপদ কোনও ছোটখাটো গ্রাম বা সামান্য বসতিমাত্র ছিল না। রীতিমতো পূর্ণাঙ্গ ও সক্রিয় এক শহর- যার ভিতরে ছিল ধর্মীয় নির্মাণ ও বিপুল সংখ্যক বসতবাড়ি। গবেষকরা এখানকার বাড়িঘরগুলির পারস্পরিক অবস্থান ও বিন্যাসকে ঠিক যে অবস্থায় আবিষ্কৃত হয়েছে, সেই 'মূল স্থানে' রেখেই বিশ্লেষণ করার সুযোগ পাচ্ছেন। যা তাঁদের কাছে এক অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও অনন্য অভিজ্ঞতা।
আমাদের প্রিয় কলকাতাও হয়তো একদিন এভাবেই জলের তলায় বিলীন হয়ে যাবে, যেমন কল্পনা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়রিতে রয়েছে। হয়তো সেদিনও জলের তলায় হারিয়ে যাওয়া কলকাতার নিদর্শন সেদিনের গবেষকদের জানিয়ে দেবে কল্লোলিনী এক তিলোত্তমার কথা। ঠিক যেমন টাইগ্রিসের তলায় বিলীন হয়ে যাওয়া এই শহর শোনাচ্ছে তার ফেলে আসা সময়ের গল্প। যে গল্প কান পেতে শুনছেন গবেষকরা।
Published By: Biswadip DeyPosted: 09:28 PM Apr 20, 2026Updated: 09:28 PM Apr 20, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
