Advertisement
ভারতের 'মিনি ব্রাজিল', কুসংস্কার-দারিদ্র্যকে গোল দিয়ে বিশ্বমঞ্চে তেরঙ্গা ওড়াচ্ছে এই গ্রামের মেয়েরা
মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল, দুই প্রধানের প্রাক্তন ফুটবলারের নামে তৈরি অ্যাকাডেমিতে ফুটবল শিখছে মেয়েরা।
ভারতেই আছে 'মিনি ব্রাজিল'। অবাক হচ্ছেন? একটা গ্রাম শুধুই ফুটবলার। তবে পুরুষ নয়, মহিলাদের জন্যই চর্চিত রাজস্থানের গ্রাম ধিংসারি। একের পর এক মহিলা ফুটবলার উঠে এসেছে বিকানেরের এই গ্রাম থেকে। একসময় কোনও মেয়ে ফুটবল খেললে, তার জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত। এখন সেই মেয়েরাই ফুটবল খেলতে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে।
শুকনো, খটখটে একটা অঞ্চল। শুধুই বালির টিলা ও ঊষর পার্বত্য ভূমিতে ঘেরা। দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী। সকাল-সন্ধ্যা কাজ করে যৎসামান্য আয়। মূল পেশা পশুপালন। বিকানের থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে সুযোগসুবিধাও খুব কম। তার সঙ্গে ছিল বিভিন্ন ছুঁৎমার্গ। সেসব কাটিয়ে ফুটবলই এখন অস্ত্র।
বছর কয়েক আগের কথা। ধিংসারির একটি মেয়ে জেলাস্তরের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে ম্যাচের সেরা হয়েছিল। কিন্তু সেদিন সারারাত সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। কেন? কারণ, ফুটবল খেলার 'অপরাধে' সেদিন বাবার থেকে চড় খেয়েছিল মেয়েটি। কদিন পর তার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। 'অশালীন' পোশাক পরা চিরতরে বন্ধ!
এরকম আরও অনেকের সঙ্গেই একই ঘটনা ঘটে। অনেক মেয়ের ফুটবল স্বপ্ন বাবা-মায়ের শাসনে অঙ্কুরে বিনাশ হয়ে যায়। সেই সময়ে এগিয়ে এলেন বিক্রম সিং রাজভি। পেশায় রেলের কর্মচারী। তাঁর আরও একটা পরিচয় আছে। ভারতীয় ফুটবল দলের প্রাক্তন অধিনায়ক মগন সিংয়ের ছেলে। ধিংসারিতে বাবার নামে একটি অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন বিক্রম।
এদিকে সময় বদলায়। দারিদ্রের সঙ্গে অবিরাম লড়তে থাকা গ্রামবাসীও বুঝতে পারেন, ফুটবল হয়ে উঠতে পারে বেঁচে থাকার উপায়। ক্রমে গ্রামের দল, রাজ্যস্তর হয়ে জাতীয় পর্যায়েও মাতিয়েছে ধিংসারির মেয়েরা। ২০২৪-২৫ মরশুমে জুনিয়র গার্লস জাতীয় ফুটবলের দ্বিতীয় পর্যায় জেতে রাজস্থান। যেই দলে ১২জন ধিংসারির সদস্য ছিল।
২০২১ থেকে বিক্রমের লড়াই শুরু। রক্ষণশীল গ্রামীণ এলাকার অনেক পরিবারই তাদের মেয়েদের ফুটবল খেলতে দিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। বিক্রম বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের রাজি করান। এখন প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় মরুভুমির মধ্যে তিনটে সবুজ মাঠে অনুশীলনে মাতে খুদে মেয়েরা।
ধিংসারির মেয়েরা অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৭ এবং অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় পর্যায়ে খেলছে। বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় ভারতীয় জাতীয় দলের ক্যাম্পেও যোগ দিয়েছে। গ্রামের এক ফুটবলার মুন্নি ভাম্ভু, চিনে অনুষ্ঠিত এশিয়ান কোয়ালিফায়ার টুর্নামেন্টে ভারতের প্রতিনিধিত্বও করেছিল। রাশিয়া, নেপাল, বাংলাদেশে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছেন।
বিক্রমের নিজের ফুটবল কেরিয়ার সাফল্য পায়নি। এখন রেলে চাকরি করেন। সেই সামর্থ্য দিয়েই বাবার নামে অ্যাকাডেমি গড়েছেন। যেখানে তিনটে ফুটবল মাঠ ছাড়াও হস্টেলের সুবিধা, চিকিৎসা, পড়াশোনার ব্যবস্থা ও আধুনিক ক্রীড়া পরিকাঠামো রয়েছে। বর্তমানে এই অ্যাকাডেমিতে ১৩০ জন মেয়ে রয়েছে।
একদিনে সব হয়নি। অ্যাকাডেমি গড়ার টাকা ছিল না। তাই বিক্রম নিজের জমি বেঁচে দেন। সেই টাকায় ধিংসারিতে ৮ বিঘা জমি কেনেন। পরে গ্রামেরই এক ব্যক্তি আরও দুই বিঘা জমি দান করেন। তিনি বলেন, "আমাদের কাছে কোনও পরিকাঠামো ছিল না। এমনও দিন গিয়েছে, ছোলা খেয়ে কাটিয়েছি।"
Published By: Arpan DasPosted: 08:25 PM May 18, 2026Updated: 08:25 PM May 18, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
