Advertisement
৬০ বছর বয়সে বরফঠান্ডা সমুদ্র জয়! মিলিন্দ দেখাচ্ছেন ফিট থাকার আসল খেলা
বয়স শুধু ক্যালেন্ডারের সংখ্যা। এই কথা বহুবার শুনেছি। কিন্তু সেটিকে বাস্তবে প্রমাণ করে দেখালেন মিলিন্দ সোমান। স্পেন থেকে মরক্কো পর্যন্ত জিব্রাল্টার প্রণালীর ভয়ংকর ঠান্ডা ও উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আবারও আলোচনায় তিনি। ৬০ বছর বয়সে ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সি-সুইম শেষ করে মিলিন্দ যেন বুঝিয়ে দিলেন, ফিটনেস কোনও ট্রেন্ড নয়, এটি প্রতিদিনের জীবনযাপনের ফল।
১ মে স্পেনের তারিফা থেকে মরক্কো উপকূলের দিকে সাঁতার শুরু করেন মিলিন্দ। জিব্রাল্টার প্রণালী পৃথিবীর অন্যতম কঠিন ওপেন ওয়াটার রুট হিসেবে পরিচিত। এখানে আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের স্রোত একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়। কখনও হঠাৎ স্রোতের গতি বদলায়, কখনও ঠান্ডা জল শরীর অবশ করে দিতে চায়। তার উপর এটি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ব্যস্ততম রুট। এই ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যেই পাঁচ ঘণ্টার কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছান মিলিন্দ।
এই চ্যালেঞ্জের গল্প শুরু হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। ২০১৭ সালে জিব্রাল্টার সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনের কাছে আবেদন করেছিলেন মিলিন্দ। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জাহাজ চলাচলের পথ হওয়ায় এখানে সাঁতারের অনুমতি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। প্রতিদিন সীমিত সংখ্যক সাঁতারুকে সুযোগ দেওয়া হয়। পরে করোনা মহামারির কারণে পুরো পরিকল্পনাই থেমে যায়। বহু বছর পর এক বন্ধুর মাধ্যমে আবার সুযোগ আসে।
মিলিন্দ সোমানের কথায়, এই সাফল্যের পেছনে কোনও 'এক্সট্রিম' ট্রেনিং নেই। গত ২৫ বছর ধরে নিয়মিত ম্যারাথন দৌড়, সাঁতার এবং শরীরচর্চাই তাঁর ফিটনেসের মূলমন্ত্র। ছোটবেলায় তিনি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারু ছিলেন। পরে দৌড়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে ১০ কিলোমিটার থেকে শুরু করে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত আলট্রাম্যারাথনে অংশ নিয়েছেন। ৪৭ বছর বয়সে দিল্লি থেকে মুম্বাই পর্যন্ত প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দৌড়ে অংশ নিয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন।
জিব্রাল্টার পাড়ি দেওয়ার আগে বিশেষ কোনও বাড়তি অনুশীলনও করেননি মিলিন্দ। চলতি বছর গোয়ায় বেশ কয়েকটি দীর্ঘ সমুদ্র-সাঁতারে অংশ নেন, যার দূরত্ব ছিল প্রায় ২০ কিলোমিটার। তার বিশ্বাস, শরীরকে যদি সারা বছর সক্রিয় রাখা যায়, তাহলে আলাদা করে শেষ মুহূর্তের কঠোর প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে না। ধারাবাহিকতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
তার প্রতিদিনের রুটিন শুনলেও অবাক হতে হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিছানায় কিছু সিট-আপ ও লেগ রেইজ করেন। এরপর প্ল্যাঙ্ক, কয়েক রাউন্ড সূর্য প্রণাম এবং কিছু পুশ-আপ। কোনও জটিল জিম ওয়ার্কআউট নয়, নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেনিংও। বরং একই অভ্যাস বছরের পর বছর ধরে করে যাওয়ার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন ফিট থাকার মন্ত্র। খাবারের ক্ষেত্রেও তিনি ঘরোয়া, মরশুমি ও প্রাকৃতিক খাবারকেই গুরুত্ব দেন।
তবে এই সাঁতারে সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল ঠান্ডা জল। ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার জলে দীর্ঘ সময় থাকলে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে। মিলিন্দ জানান, ক্লান্তির চেয়ে শরীর গরম রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি ৪৫ মিনিট পরপর সাপোর্ট টিম তাকে ইলেকট্রোলাইট, কার্বোহাইড্রেট জেল ও গরম কফি দিচ্ছিল। ওপেন ওয়াটার সাঁতারের নিয়ম অনুযায়ী নৌকা স্পর্শ করা যায় না, তাই নিজেকেই সবকিছু সামলাতে হচ্ছিল।
তার সঙ্গে ছিলেন আরও তিনজন ভারতীয় সাঁতারু, যাঁদের বয়স ত্রিশের ঘরে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন একজন হেলিকপ্টার পাইলট, একজন আইএএস কর্মকর্তা এবং বেঙ্গালুরুর এক উদ্যোক্তা। সবার গতি একসঙ্গে বজায় রাখাও ছিল কঠিন কাজ। মিলিন্দ বলেন, নিজের স্বাভাবিক ছন্দে সাঁতার কাটতে না পারলে শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়। তাই এই চ্যালেঞ্জ শুধু শারীরিক শক্তির নয়, মানসিক নিয়ন্ত্রণ ও ধৈর্যেরও পরীক্ষা ছিল।
ফিটনেস বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ৬০ বছর বয়সের পর ফিটনেসের অর্থ বদলে যায়। তখন লক্ষ্য থাকে শরীরকে ক্লান্ত করে ফেলা নয়, বরং সুস্থভাবে সক্রিয় রাখা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশিশক্তি, ফুসফুসের সক্ষমতা ও শরীরের পুনরুদ্ধার ক্ষমতা কমে আসে। কিন্তু পরিকল্পিত ব্যায়াম চালিয়ে গেলে হৃদ্যন্ত্র, পেশি, হাড় ও শরীরের ভারসাম্য দীর্ঘদিন ভালো রাখা সম্ভব।
ফিটনেস বিশেষজ্ঞদের মতে বয়স বাড়লে শরীরচর্চা আরও নিয়মিত হওয়া দরকার। শুরুতে হাঁটা, সাঁতার, হালকা স্ট্রেচিং বা শরীরের ওজনভিত্তিক ব্যায়াম দিয়েই শুরু করা যায়। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ এবং স্ট্রেচিংও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা সন্ধিস্থলের সমস্যায় ভোগা মানুষদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ধীরে ধীরে শরীরচর্চা শুরু করাই নিরাপদ।
মিলিন্দ সোমানের মতে, বয়স কোনও বাধা নয়। আসল বাধা হল নিজের শরীরকে অবহেলা করা। তিনি বলেন, যদি আপনি নিজের শরীরের যত্ন নেন, তাহলে বয়স বাড়ার সঙ্গে জীবনও আরও সুন্দর হতে পারে। তাঁর ম্যারাথন 'পিঙ্কাথন'-এ ৬৮ ও ৭৬ বছর বয়সি নারীরাও অংশ নিয়েছিলেন, যাঁরা কয়েক বছর আগেই ফিটনেস ট্রেনিং শুরু করেন। অর্থাৎ, ফিটনেস টেনিং শুরুর জন্য কোনও বয়সই দেরি নয়।
Published By: Pritimoy Roy BurmanPosted: 07:43 PM May 10, 2026Updated: 07:43 PM May 10, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
