Advertisement
'হায়দার'-এর অভিনেতা থেকে লস্কর জঙ্গি! সাকিব বিলাল শেখের করুণ পরিণতির কথা জানেন?
দক্ষ অভিনেতা হিসেবে কিশোর বয়সেই নজর কাড়া ছেলেটা কীভাবে তলিয়ে গেল চোরাবালিতে!
মানুষের জীবন কখনও একভাবে চলে না। কিন্তু কাশ্মীরের বহু তরুণ যেভাবে স্বাভাবিক নাগরিক জীবন থেকে সন্ত্রাসের অন্ধকার চোরাগলিতে ঢুকে দমবন্ধ হয়ে পড়ে, তাদের জীবনের বৈপরীত্যের সঙ্গে কোনও কিছুর তুলনা বোধহয় চলে না। যে ছিল বাড়ির আদরের ছেলে, সে হঠাৎই বিভ্রান্তির পথে হেঁটে জঙ্গী হয়ে যায়! তেমনটাই হয়েছিল সাকিব বিলাল শেখের জীবনেও।
ফুটফুটে এক কিশোর ছিল সাকিব। ২০১৩ সালে যখন সে বিশাল ভরদ্বাজের বিখ্যাত 'হায়দার' ছবিতে অভিনয় করে তখন তার বয়স বারোর বেশি হবে না। যদিও তার ভূমিকা ছিল একেবারেই ছোট। সাকুল্যে পনেরো সেকেন্ডের রোল। তবু সে নজর কেড়েছিল নিষ্পাপ মুখের সরল দৃষ্টির মাধ্যমে।
ছবিতে একটি দৃশ্য ছিল অমর সিং কলেজের। চারপাশে নাবালকদের ভিড়, হঠাৎই প্রবল বিস্ফোরণে চারপাশ কেঁপে উঠবে। দেখা যাবে সকলেই মারা গিয়েছে, কেবল সাকিব অভিনীত চরিত্রটি একাই বেঁচে গিয়েছে। তার অভিব্যক্তি আলাদা করে নজর কেড়েছিল সকলের। আসলে অভিনয়ে বরাবরই সে বেশ দক্ষ ছিল। অল্প বয়স থেকেই অভিনয় প্রতিভার স্ফূরণ ঘটেছিল তার মধ্যে।
স্কুলে কোনও নাটক হলে অভিনেতা হিসেবে প্রথম পছন্দ ছিল সাকিব। পরে সে নাটক করতে শ্রীনগর বা ওড়িশাতেও গিয়েছে। এমনকী নাটক করে পুরস্কারও সে পেয়েছিল। সেই অভিনয় দক্ষতাই তাকে 'লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন'-এর জগতেও প্রবেশাধিকার দেয় নেহাতই নাবালক বয়সে। কে জানত ক্যামেরার সামনে বিস্ফোরণের সামনে অসহায় কিশোরের ভূমিকায় অভিনয় করা সাকিব একদিন নিজেই হয়ে উঠবে সন্ত্রাসের মুখ!
সাকিবের পরিবার আজও বুঝতে পারে না কীভাবে ছেলেটা অন্ধকার একটা বৃত্তের ভিতরে হারিয়ে গেল! ১৭ বছর বয়সে দশম শ্রেণির পরীক্ষায় পাশ করার পর সে থিয়েটার শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেছিল। এর মধ্যে কোথায় যে রক্তে মিশে গেল বিষ, আজও তা স্পষ্ট নয় কারও কাছে।
আচমকাই একদিন বাড়ি থেকে গায়েব হয়ে গেল সাকিব। সঙ্গে তার ১৪ বছরের ছোট ভাই মুদাসির রশিদ পারে। সাকিবের মা জানিয়েছিলেন, বাড়ির কাছের দোকান থেকে মাংস আনতে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর দুই ছেলের। সেই যে তারা বাড়ি থেকে বেরোল আর ফিরে আসেনি। আর কখনও তাদের দেখেনি পরিবারের কেউই!
তবে সাকিব তার গ্রামে কিন্তু ফিরত! এমনটাই জানিয়েছে সাকিবের বন্ধুরা। লস্কর-ই-তইবায় যোগ দিয়েছিল সে। মাঝে মাঝে নিজের পাড়ায় এসে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করত। তবে বাড়ির লোকের সঙ্গে সে কখনওই দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। বন্ধুদেরও সাহস হয়নি তার বাড়িতে খবর দেওয়ার! কেননা সঙ্গে সব সময়ই আগ্নেয়াস্ত্র রাখত সতেরো বছরের কিশোর।
২০১৮ সালের ডিসেম্বর। শ্রীনগরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকের লড়াই শুরু হয় জঙ্গিদের। সেই জঙ্গিদের মধ্যেই ছিল সাকিবও। ছিল তার ভাই মুদাসিরও। ১৮ ঘণ্টা ধরে চলে গুলি বিনিময়। আসলে এলাকায় তল্লাশি চালানোর সময়ই ওই জঙ্গিদের সন্ধান মিলেছিল। আহত হন এক সেনা জওয়ান ও তিন সাধারণ নাগরিক।
সব মিলিয়ে তিনজন জঙ্গি মারা যায় সেই এনকাউন্টারে। তার মধ্যে দু'জন সাকিব ও মুদাসির! বাড়িতে সেই খবর ভেসে আসতেই কান্নার রোল ওঠে। বছর পেরিয়ে যায়। আজও তরতাজা দুই ছেলের মৃত্যুর শোক কেউ ভুলতে পারেনি।
শোকের পাশাপাশি রয়ে গিয়েছে বিস্ময়ও। সাকিবের মামা একবার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় বলেছিলেন, ''এলাকার পুলিশ কর্তা আমাদের কথা দিয়েছিলেন, সাকিব যদি কখনও তাঁদের হাতে ধরা পড়ে, তাঁরা আমাদের তার সঙ্গে কথা বলতে দেবেন। আমরা ওকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম ঠিক কী কারণে ও এই পথ বেছে নিয়েছিল।''
তাঁর মামা আরও বলেছিলেন, ''আমরা সবসময়ই সাকিবের যাবতীয় প্রয়োজন ও দাবিদাওয়া পূরণ করে এসেছি। তাই বুঝতে চেয়েছিলাম— ঠিক কোন কারণে সে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু শেষমেশ এমনটা আর কখনওই ঘটেনি।'' সাকিবের মৃত্যুকে আজও মেনে নিতে পারেনি তার পরিবার। ফুটফুটে দুই কিশোরকে যারা মৌলবাদের বিষ খাইয়ে অন্ধ করে দিয়েছিল, তাদের উদ্দেশে আজীবন ঘৃণা বয়ে বেড়াবেন সাকিবের আপনজনেরা।
Published By: Biswadip DeyPosted: 06:10 PM Apr 01, 2026Updated: 06:10 PM Apr 01, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
