shono
Advertisement

Breaking News

Haiti

বিশ্বকাপের প্রথম ডোপপাপী ও এক স্বৈরশাসকের ভয়ংকর গল্প

৫০ বছরের বেশি সময় আগে মিউনিখের এক হোটেল করিডরে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জোসেফ ভাবছিলেন, তাঁরও কি এবার গ্যাতজেঁসের মতোই পরিণতি হবে। অতি উৎসাহে বা ভুলবশত দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাই তো করেছেন তিনি। সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমান স্বৈরশাসক ‘বেবি ডক’কে বিব্রত করেছেন।
Published By: Kishore GhoshPosted: 08:51 PM Jun 15, 2026Updated: 09:32 PM Jun 15, 2026

যুদ্ধ, হানাহানির পৃথিবীতে চার বছর পর ফুটবল বিশ্বকাপ ঘুরে আসে আলোর জানলা মতো। যে মহাযজ্ঞে জোর যার মুল্লুক তার স্লোগান চলে না, দক্ষতাই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি। পরীক্ষা হয় খোলা মাঠে, ষাট কী আশি হাজার দর্শকের সামনে। যদিও আলোর জানলাতেও কখনও কখনও নেমে এসেছে নিকষ অন্ধকার। যেমন আর্নস্ট ইয়ান-জোসেফ। ওই যে--- ৫০ বছরের বেশি সময় আগে মিউনিখের এক হোটেল করিডরে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কাকে যেন ফোন করছেন। কে এই জোসেফ? এতখানি আতঙ্কের কারণ কী?

Advertisement

আর্নস্ট ইয়ান-জোসেফ বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম ডোপপাপী। হাইতির (Haiti) জাতীয় দলের ফুটবলার তিনি। লালচে চুলের এই ডিফেন্ডার ১৯৭২ সালে প্রথমবার জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পান। জীবনের ভালো দিনগুলি চলছে তখন। ফলে ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও তিনি। সেবার বিশ্বকাপের আসর বসেছিল তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে। বলা বাহুল্য, দুই জার্মানির মধ্যবর্তী বার্লিনের দেওয়াল ভাঙেনি তখনও। কিন্তু খেলোয়াড়সুলভ ভব্যতার গণ্ডি ভাঙেছিলেন জোসেফ। প্রথম ম্যাচে হাইতির প্রতিপক্ষ ছিল ইতালি। সেই খেলায় ৩-১-এ হারে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ছোট্ট দেশটি। যদিও ইতালির মতো শক্তিশালী দলের কাছে হার তত লজ্জার নয়। নিজের দেশকে তার চেয়ে অনেক বেশি লজ্জায় ফেলেন আমাদের বর্তমান কাহিনির প্রধান চরিত্র।

ম্যাচের পর নিয়মিত ডোপ পরীক্ষায় ডাকা হয় জোসেফকে। তাঁর নমুনায় পাওয়ায় যায় নিষিদ্ধ উদ্দীপক ফেনমেট্রাজিন। ফিফার তৎকালীন অ্যান্টি-ডোপিং কমিটির প্রধান ডা. গটফ্রিড শোয়েনহলজার তাৎক্ষণিকভাবে জোসেফকে বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করেন। ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে ডোপিংয়ের দায়ে নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। যদিও প্রথমটায় দায় স্বীকার করতে চাননি অভিযুক্ত হাইতির ফুটবলার। দাবি করেন, দেশে তাঁর চিকিৎসক হাঁপানির চিকিৎসার জন্য ওষুধ দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন না এতে নিষিদ্ধ উপাদান আছে। কিন্তু দলের ফরাসি চিকিৎসক জানিয়ে দেন, ইয়ান-জোসেফের হাঁপানি সমস্যা নেই। এরপর দোষ মানতে কার্যত বাধ্য হন জোসেফ। জানান, পারফরম্যান্স বাড়ানোর চেষ্টায় ওই ড্রাগ নিয়েছিলেন। কিন্তু কাহিনি এখানেই সমাপ্ত নয়। কারণ সংবাদসংস্থা মারফত বিষয়টি জানাজানি হতেই মৃত্যুভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিলেন আর্নস্ট ইয়ান-জোসেফ। মৃত্যুভয় কেন?

হাইতিতে ফেরার পর ইয়ান-জোসেফের সঙ্গে কী হয়েছিল, তার বিশ্বাসযোগ্য কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। ইয়ান–জোসেফ নিজেও এই বিষয়ে মুখ খোলেননি।

হাইতির ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান জাঁ ভোরবে সাংবাদিকদের জানান, জোসেফ মিউনিখেই থাকবেন। বিশ্বকাপে দলের বাকি ম্যাচগুলোয় গ্যালারিতে থাকবেন তিনি। পরের দুই দিন জোসেফ কাটান মিউনিখের পেন্টা হোটেলের লবিতে। অজানা আতঙ্কে ভুগছিলেন বেচারা। তবে একা নয়, সার্বক্ষণিক পাহারায় ছিল টঁটঁ মাকুতের লোকেরা। টঁটঁ মাকুতের পরিচয় স্পষ্ট হলেই পুরো গল্প জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।

যে সময়ের কথা হচ্ছে, সেই ১৯৭৪ সালে ডুভালিয়ে পরিবারের স্বৈশাসনে ছিল হাইতি। ১৯৫৭ থেকে ফ্রাঁসোয়া ‘পাপা ডক’ এবং ১৯৭১ সাল থেকে তাঁর ছেলে জাঁ-ক্লদ ‘বেবি ডক’— দুই প্রজন্মের রাজত্ব টিকে ছিল কার্যত নির্যাতন, খুন আর আতঙ্কের উপর ভর করে। স্বৈরশাসকদের প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘টঁটঁ মাকুত’। ডুভালিয়ে পরিবারের বিশ্বস্ত গোপন পুলিশ বাহিনী। তারা যাকে ইচ্ছা ধরে নিয়ে যেত, তারপর খোঁজ মিলত না। ভয়ংকর ‘টঁটঁ মাকুত’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর নিয়ম ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা, জোসেফ জানতেন জো গ্যাতজেঁসের পরিণতির কথা। গ্যাতজেঁস ছিলেন হাইতির নামী ফুটবলার। ১৯৬৪ সালে তাঁর ভাইদের রাজনৈতিক কার্যকলাপের কারণে টঁটঁ মাকুত গ্যাতজেঁসকে পোর্ট–অ–প্রিন্সের রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর থেকে কেউ আর তাঁকে দেখেনি।

৫০ বছরের বেশি সময় আগে মিউনিখের এক হোটেল করিডরে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জোসেফ ভাবছিলেন, তাঁরও কি এবার গ্যাতজেঁসের মতোই পরিণতি হবে। অতি উৎসাহে বা ভুলবশত দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাই তো করেছেন তিনি। সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমান স্বৈরশাসক ‘বেবি ডক’কে বিব্রত করেছেন। অতএব, শাস্তি হবেই। যদিও হাইতি দলের মধ্যেই থাকা ‘বেবি ডক’-এর অনুচরদের নজরে ছিলেন তিনি, তথাপি হোটেলে একজন ফরাসিভাষী জার্মান হোস্টেসের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল ইয়ান–জোসেফের। সেই হোস্টেসকে ফোন করেন সাহায্যের আশায়। হোস্টেস সেই কথা জানান ফিফার মনোনীত দলীয় সংযোগকর্মী কুর্ট রেনারকে।

এরপরেও শাসকের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাননি হাইতির ফুটবলার। জানা যায়, টঁটঁ মাকুতের কয়েকজন সদস্য ইয়ান-জোসেফকে গ্রুনভাল্ড স্পোর্টস স্কুল থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। বিমানবন্দরের কাছের শেরাটন হোটেলে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রাখা হয় এক রাত। পরদিন ভোরে তাকে পোর্ট অ প্রিন্সের একটি বিমানে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কী হয়েছিল তারপর?

হাইতিতে ফেরার পর ইয়ান-জোসেফের সঙ্গে কী হয়েছিল, তার বিশ্বাসযোগ্য কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। ইয়ান–জোসেফ নিজেও এই বিষয়ে মুখ খোলেননি। তবে খবর ছড়ায়--- তাঁর হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, স্বৈরশাসকদের নৃশংস চরিত্রের হিসাবে অল্পই শাস্তি হয়েছিল। তবে ফিফার এক বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে পরে ইয়ান–জোসেফ হাইতির জাতীয় দলে ফিরেছিলেন। এমনকী ১৯৭৮ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে সাতটি ম্যাচ এবং ১৯৮২-এর বাছাইপর্বে একটি ম্যাচ খেলেন। ২০২০ সালের ১৪ আগস্ট ইয়ান–জোসেফ মারা যান। সমাপ্ত হয় প্রথম ডোপপাপীর গল্পের।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement