গ্রামের ছোট ছোট শিশু। তাদের হাতে ঝুড়ি ভরা ফুল। লোকালয়ে দরজায় দরজায় তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে সেই ফুল। সেই সঙ্গে সকলকে বিলিয়ে দিচ্ছে শুভেচ্ছাবার্তা। ঘটনাটা উত্তরাখণ্ডের। সেখানকার পাহাড়ি গ্রামগুলিতে বসন্তে এই রীতি দীর্ঘকাল যাবৎ প্রচলিত। বসন্তে এক অনন্য উৎসবে মেতে ওঠে দেবভূমি। কী নাম এই উৎসবের? জানেন কি? সম্প্রতি শিল্পপতি আনন্দ মাহিন্দ্রার একটি সোশাল মিডিয়া পোস্টের সৌজন্যে এই অনাড়ম্বর উৎসবটি এখন নেটিজেনদের আলোচনার মূল বিষয় হয়ে উঠেছে।
ছবি: সংগৃহীত
প্রাচীন এই লোক-উৎসবের নাম 'ফুল দেই'। উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন এবং গাড়োয়াল অঞ্চলে চৈত্র মাসের শুরুতে এই উৎসব পালিত হয়। যদিও গোটা মাস জুড়ে তা চলে। এটি মূলত প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর উৎসব। 'ফুল দেই' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল পুষ্প অর্পণ। হিমালয়ের পাহাড়ি জনপদে যখন বসন্তের ছোঁয়া লাগে, তখন গ্রামের শিশুরা খুব ভোরে উঠে পাহাড় ও জঙ্গল থেকে টাটকা ফুল সংগ্রহ করে আনে। এরপর ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তারা গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে হানা দেয়।
ছবি: সংগৃহীত
বাড়ির চৌকাঠে ফুল রেখে তারা সুর করে গাইতে থাকে লোকগাথা গান—
‘ফুল দেই, ছম্মা দেই,
দেনি দ্বার, ভর ভাকার,
ইও দেলি সউঁ বারাম্বার নমস্কার,
অজে তেরি সউঁ দহেউ, সউঁ নি সউঁ..’। যার সারমর্ম হল, ঘরবাড়ি ফুলে ফুলে ভরে উঠুক, সবার জীবন শুভ হোক। এই পরিবারে যেন শস্যের ভাণ্ডার পূর্ণ থাকে এবং সকলের জীবনে সমৃদ্ধি আসে। ছড়া কেটে শিশুরা গৃহের চৌকাঠ বা দেহলিকে বারবার প্রণাম করতে থাকে। এই উৎসবে বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা, বিশেষ করে কন্যারা গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফুল ও চালের আলপনা দিয়ে আসে। বিনিময়ে গৃহস্থরা শিশুদের গুড়, চাল বা মিষ্টি উপহার দেন। এই পাহাড়ি রীতি চমকে দিয়েছে ভারতীয় ধনকুবের ব্যবসায়ী আনন্দ মাহিন্দ্রাকে। তাঁর মতে, এই উৎসবের আবেদন সম্পূর্ণ আলাদা। হ্যালোউইনে যেখানে শিশুরা 'ট্রিক অর ট্রিট' বলে মজা করে, সেখানে 'ফুল দেই' উৎসবে শিশুরা দাবি নয়, বরং আশীর্বাদ আর ভালোবাসা বিলিয়ে দেয় সকলের মধ্যে।
আনন্দ মাহিন্দ্রা তাঁর পোস্টে আক্ষেপ করে জানিয়েছেন, এই সুন্দর উৎসবের কথা তিনি আগে কখনও শোনেননি। আজকের যুগে যখন পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে, তখন এই উৎসবটি পরিবেশ রক্ষার এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। প্রকৃতি এবং মানুষের নিবিড় সম্পর্কের এই উদযাপন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। যেমনভাবে হোলি আজ বিশ্বজনীন, ঠিক তেমনই 'ফুল দেই' উৎসবটিও হিমালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সমতলে এবং বিশ্বের দরবারে পরিচিতি পাওয়ার হকদার।
ছবি: সংগৃহীত
পরিবেশ ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তৈরি এই উৎসব আমাদের শেখায়, প্রকৃতিকে ভালোবেসে কীভাবে সহজে খুশি থাকা যায়। উত্তরাখণ্ডের এই প্রাচীন লোক-উৎসব এখন রীতিমতো ভাইরাল। এমন এক ফুলেল উৎসবে সামিল হতে কার না মন চায়? ইচ্ছে থাকলে উপায় রয়েছে নিশ্চয়ই। টিকিট কেটে ফেলুন উত্তরাখণ্ডের। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত গ্রামগুলির এই স্থানীয় উৎসবে মেতে উঠুন। ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির চর্চায় নিজেকে যুক্ত করার এটিই সেরা সুযোগ।
