১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে কার্যকর হয় সংবিধান। সেই সংবিধানে চারটি মূলনীতির কথা বলা হয়েছিল - জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। স্বাধীনতা লাভের পরপরই প্রণীত এই সংবিধানটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে নির্মিত। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে শুরু হয় সামরিক শাসন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন খালেদা জিয়ার স্বামী তথা তারেক রহমানের পিতা জিয়াউর রহমান। আর এই প্রেক্ষাপটেই রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। কুরসিতে বসেই জিয়াউর সিদ্ধান্ত নেন তিনি সংবিধান বদলাবেন।
১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে মার্শাল আইন প্রয়োগ করে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বাদ যায় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি। পরিবর্তে সেখানে স্থান পায় ‘আল্লার উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ - এই শব্দবন্ধটি। যদিও জিয়াউরের এই সিদ্ধান্তটিকে কেন্দ্র করে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বিতর্কও হয় বিস্তর। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণকে মাথায় রেখেই ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটিকে সরিয়ে দেন জিয়াউর। যাতে সঠিক স্থানে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতিফলন ঘটিয়ে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি করা যায়। শুধু তা-ই নয়, এই পদক্ষেপ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করারও কৌশল বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে মার্শাল আইন প্রয়োগ করে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বাদ যায় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি। পরিবর্তে সেখানে স্থান পায় ‘আল্লার উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ - এই শব্দবন্ধটি।
অপর এক পক্ষের বক্তব্য, জিয়াউর আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে রাষ্ট্রকে বিচ্যুত করার চেষ্টাতেই সংবিধানে বদল এনেছিলেন। তাদের মতে, সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
তবে ২০১০ সালে শেখ হাসিনার আমলে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি ফের ফিরিয়ে আনা হয়। সেই সময় বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, ১৯৭৭ সালে যেভাবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটিকে সংবিধান থেকে অপসারণ করা হয় তা অবৈধ। কারণ, এটির নেপথ্যে ছিল অসাংবিধানিক মার্শাল আইন। তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল - সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল, যা এখনও বহাল রয়েছে। ফলে বর্তমান সংবিধানে একদিকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নীতির কথা যেমন উল্লেখ রয়েছে, তেমনই ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে উল্লেখিত।
২০২৪ সালে হাসিনা পতনের পর অস্থির হয় বাংলাদেশ। জটিল সেই পরিস্থিতি পেরিয়ে অবশেষে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশে। প্রতিপক্ষ তথা মৌলবাদের জনক জামাতকে পিছনে ফেলে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন জিয়াউরের পুত্র তারেক রহমান। অচলবস্থা পেরিয়ে নতুন করে ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে সেখানকার জনগণ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারেক কি পারবেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ফেরাতে? নাকি পিতার পথই তিনি অনুসরণ করবেন?
২০২৪ সালে হাসিনা পতনের পর অস্থির হয় বাংলাদেশ। জটিল সেই পরিস্থিতি পেরিয়ে অবশেষে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশে। প্রতিপক্ষ তথা মৌলবাদের জনক জামাতকে পিছনে ফেলে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি।
১৭ বছর নির্বাসন কাটিয়ে দেশের মাটিতে পা রেখে তারেক বলেছিলেন, ১৯৭১ সালের মতো ২০২৪ সালেও এদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করেছিল ছাত্র-যুবদের আন্দোলন। এদেশের মানুষ কথা বলার অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। সকলে মিলে সেই দেশ গড়ে তুলব আমরা। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যার স্বপ্ন দেখেন মা, অর্থাৎ নিরাপদ বাংলাদেশ। নারী, পুরুষ, শিশু ঘর থেকে বেরলে যেন নিরাপদে ফিরে আসেন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, হাসিনাহীন বাংলাদেশে ক্ষমতার শীর্ষে বসে যথেষ্ট সতর্ক থাকবেন তারেক। এমন কোনও পদক্ষেপ করতে চাইবেন না যাতে বিএনপি-র বিরুদ্ধে ফের মানুষের জনরোষ সৃষ্টি হয়। দুঃস্বপ্নের অধ্যায় পেরিয়ে কোন পথে অগ্রসর হবে বাংলাদেশ? উত্তর দেবে সময়।
