কাজের জন্য কলকাতায় যায় বাবা, এটুকু এতদিনে বুঝতে শিখে গিয়েছিল ১০ বছরের সুস্মিতা। বাবা কবে ফিরবে! পড়াশোনার ফাঁকে সেই অপেক্ষায় মেদিনীপুরের বাড়িতে বসে দিন গুনত। এই তো সেদিন বাবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু, সেই অপেক্ষা যে আর কোনোদিনও শেষ হবে না, তা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সুস্মিতা। ভাবতে পারেনি কোনওদিন ছাই সরিয়ে খুঁজতে হবে বাবাকে!
আনন্দপুরের আগুনে (Anandapur Fire) ঝলসে গিয়েছে একাধিক দেহ, একাধিক পরিবারের সব আশা-স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে ভয়ংকর এই আগুন। ঠিক যেমন সুস্মিতার! দশ বছরের ছোট্ট মেয়ে জানেই না ডিএনএ টেস্টটা কী! কেনই বা ডিএনএ টেস্ট করতে হয়! হয়ত জীবনে এই প্রথমবার কথাটা শুনেছে সে। আর সেই ডিএনএ টেস্ট দেওয়ার জন্যই তমলুক থেকে ছুটে এসেছে বারুইপুরে। উদ্দেশ্য একটাই, বাবার খোঁজ পাওয়া বা বাবার লাশের হদিশ পাওয়া। পুড়ে যাওয়া কারখানার ছাইয়ের মধ্যে থেকে পাওয়া হাড়গোড় থেকে যদি কোনওভাবে বাবাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। আর সেটার জন্যই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে সুস্মিতাকে। বারুইপুরের পুলিশ সুপারের অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর অবশেষে তার ডিএনএ স্যাম্পল টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে বুধবার রাতে।
সুস্মিতা সিং। তমলুকের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। যখন থেকে সে বুঝতে শিখেছে, তখন থেকে সে দেখেছে বাবা কাজের সূত্রে কলকাতায়। নির্দিষ্ট সময় অন্তর বাড়িতে পৌঁছেও যায় বাবা। মোমো কারখানার পাশেই অভিশপ্ত ডেকরেটর্স সংস্থায় কাজ করতেন সুদীপ সিং। বাড়ি থেকে কাজে ফিরেছিলেন কয়েকদিন আগেই। ২৬ জানুয়ারি বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই রাতেই ঘটে দুর্ঘটনা। অগ্নিকাণ্ডে (Anandapur Fire) ভস্মীভূত হয়ে যায় ডেকরেটর্সের গোডাউন। যে গোডাউনের মধ্যে আরও কর্মীদের সঙ্গে ঘুমাচ্ছিলেন সুদীপ সিং। সেটাই তাঁর জীবনের শেষ রাত!
তারপর একে একে উদ্ধার হয়েছে পুড়ে যাওয়া শ্রমিকদের দেহ বা দেহাংশ। যে দেহাংশগুলি কার, তাদের কী পরিচয় সেটি থেকে আর বোঝার উপায় নেই। তাই প্রয়োজন হয়েছে ডিএনএ টেস্টের। ডিএনএ টেস্টের জন্য নিকট আত্মীয়কেই প্রয়োজন হয়। সুদীপ সিংহের মা নমিতা সিং ডিএনএ টেস্ট দেওয়ার জন্য আবেদন করেছিল পুলিশের কাছে। কিন্তু ছেলের মৃত্যুশোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন তিনি। এতটাই অসুস্থ যে তমলুক থেকে আসার ক্ষমতাই নেই। অগত্যা ১০ বছরের মেয়েই ভরসা। ১০ বছরের মেয়ে সুস্মিতা তাই পৌঁছে যায় বারুইপুর পুলিশ সুপারের অফিসে।
ততক্ষণে কোট অর্ডারে সুদীপ সিংহের মা নমিতা সিং এর নামেই ডিএনএ টেস্টের জন্য অনুমতিপত্র মঞ্জুর হয়েছে। পরক্ষণে আবার বারুইপুর জেলার পুলিশ সুপার শুভেন্দ্র কুমারের প্রচেষ্টায় পুনরায় নতুন করে কোট অর্ডার করিয়ে মা নমিতা সিংহের থেকে ডিএনএ টেস্টের জন্য মেয়ে সুস্মিতা সিং এর আবেদন মঞ্জুর করা হয়। আর তা শেষ হতেই কেটে যায় অনেকটা সময়। এখন সময়ের অপেক্ষা কত দিনের মধ্যে বাবাকে শনাক্ত করা যাবে।
