সিঙ্গুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে শিল্প ফেরানো নিয়ে কোনও বার্তা না দিলেও প্রশাসনিক সভা থেকে বলাগড়ে প্রস্তাবিত বার্জ টার্মিনাল তৈরির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যা নিয়ে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন হুগলি জেলার মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর এহেন ঘোষণার পরেই বলাগড়ে প্রায় ১০০ একর জমির উপরে অত্যাধুনিক মানের বার্জ টার্মিনাল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর ফলে পণ্যবাহী বার্জ এবং ছোট জাহাজ হুগলি নদী দিয়ে সোজা পৌঁছে যাবে বলাগড় টার্মিনালে। এর ফলে একদিকে হুগলি নদী জলপথে পণ্য পরিবহণ বাড়বে, কমবে পরিবহণ খরচ। অন্যদিকে কলকাতা এবং হলদিয়া বন্দরের উপরে চাপ কিছুটা লাঘব হবে বলেও মনে করছেন বন্দর কর্তারা।
যদিও এই প্রকল্প আলোর মুখ দেখবে কিনা তা নিয়ে কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়েছেন রাজ্যের কৃষি বিপণন দপ্তরের মন্ত্রী তথা হুগলির তৃণমূল নেতা বেচারাম মান্না। তাঁর কথায়, ''বাংলায় ভোট এলেই বিজেপি লোক দেখানো প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেটা কোনও দিনই আলোর মুখ দেখে না।''
বন্দর সূত্রে জানা গিয়েছে, বলাগড়ে প্রস্তাবিত বার্জ টার্মিনাল থেকে বছরে মোট ২.৭ মিলিয়ন টন কার্গো ওঠানামা করবে। তার মধ্যে ১.৯ মিলিয়ন টন পণ্যবোঝাই কন্টেনার। বলাগড় টার্মিনাল দিয়ে মূলত কয়লা, ডাল, মটর এবং সারের মতো পণ্য আসা যাওয়া করবে। হুগলির যে নেভিগেশন চ্যানেল দিয়ে বলাগড়ে টার্মিনালে পৌঁছতে হবে, সেখানে জলের গভীরতা (ড্রাফট) প্রায় তিন মিটার। সেখানে তিন হাজার ডেড ওয়েট টন (ডিব্লুটি) বার্জ নোঙর করতে পারবে।
তবে এই টার্মিনাল তৈরি করতে জমির সমস্যা হবে না তো? বন্দর কর্তাদের কথায়, জমি নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না। প্রায় ৯০০ একর জমি শুধু বলাগড় দ্বীপেই পড়ে রয়েছে। যার মধ্যে ৩০৮.৭৫ একর জমি বন্দরের হাতে রয়েছে। বার্জ টার্মিনাল তৈরির ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে পরিকাঠামো উন্নতিতে জোর দেওয়া হচ্ছে।
এজন্য ৬ নম্বর রাজ্য সড়ক তথা অসম লিঙ্ক রোডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে বলাগড় বার্জ টার্মিনালকে। এজন্য নতুন রাস্তা তৈরি করা হবে। আর তা তৈরি করতে টেন্ডার ডাকার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এছাড়াও ওভারব্রিজ তৈরি করারও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যার ফলে পণ্যবাহী লরি এবং কন্টেনার সহজেই যাতায়াত করতে পারবে। প্রাথমিক ভাবে ঠিক হয়েছে, এই প্রকল্প রূপায়িত হবে মোট দু'টি পর্যায়ে। আর তা হবে পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) মডেলে। সবমিলিয়ে এই প্রকল্পের জন্য খরচ হবে আনুমানিক ৪৯৯ কোটি টাকা। রোড ওভারব্রিজ বানানোর জন্য আরও প্রায় ৩০-৩২ কোটি টাকা লাগবে। তার কিছুটা খরচ বহন করবে ইনল্যান্ড ওয়াটার ওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। টার্মিনালের জন্য বার্থ, কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম, কার্গো রাখার জন্য স্টোরেজ স্থাপন ইত্যাদি পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বেরকারি সংস্থাকেই বিনিয়োগ করতে হবে। সেই সংস্থা বাছাইয়ের জন্য খুব শিগগির টেন্ডার ডাকা হবে।
আর এই প্রকল্প পুরোদমে চালু হয়ে গেলে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এলাকার অর্থনীতি বদলে যাবে বলে আশা। হুগলির বিজেপি নেতা তথা দলের রাজ্য সম্পাদক স্বপন পাল বলেন, ''প্রধানমন্ত্রী কেন সিঙ্গুরে শিল্প স্থাপনের বার্তা দেননি, তা নিয়ে মিডিয়ায় বেশি হইচই হচ্ছে, কিন্তু বলাগড়ের বার্জ টার্মিনাল নিয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না। বলাগড়ে কেন্দ্রীয় সরকার যে বার্জ টার্মিনাল বানাচ্ছে, তাতে গোটা হুগলি জেলার অর্থনীতি বদলে যাবে। প্রচুর কর্মসংস্থান হবে।'' বিজেপি নেতার কথায়, ''সিঙ্গুরে ন্যানো গাড়ির কারখানা হলে যা না লোক কাজ পেত, তার থেকেও এখানে বেশি লোক কাজ পাবেন।''
যদিও এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নিয়ে সরব হয়েছেন রাজ্যের পরিবহণ মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ''কেন্দ্রের সরকার গত ১১ বছর ধরে বাংলাকে বঞ্চনা করে আসছে। ভোট এলেই বিভিন্ন প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না। এ বারেও তিনি সিঙ্গুর তথা রাজ্যবাসীকে হতাশ করেছেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরের সভা থেকে উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরবেন।''
অন্যদিকে রাজ্যের কৃষি বিপণন দপ্তরের মন্ত্রী তথা হুগলির তৃণমূল নেতা বেচারাম মান্না কটাক্ষ করে বলেন, ''কলকাতা বন্দরই ঠিকমতো চলছে না, আর বলাগড়ে কী হবে, সে তো ভবিষ্যতের ব্যাপার। আগে হোক, তারপরে দেখা যাবে।''
