ডুয়ার্সের খুনিয়া মোড় থেকে জলঢাকা পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণে উদ্যোগী রেল মন্ত্রক। 'চিকেনস নেক' অর্থাৎ 'শিলিগুড়ি করিডর' আরও সুরক্ষিত করতে এই পদক্ষপ বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। এজন্য বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ২৭২ কোটি টাকা। বর্ষা শেষ হলে রেল ও বনদপ্তর যৌথভাবে প্রস্তাবিত রেলপথের জমি সমীক্ষার কাজ শুরু করবে। রেল করিডোরটি খুনিয়া মোড়কে ডোকলাম অঞ্চলের নিকটবর্তী সীমান্ত এলাকার সঙ্গে জুড়বে। কার্যত নতুন সড়ক, সুড়ঙ্গ এবং রেল প্রকল্পের মাধ্যমে 'স্পর্শকাতর' চিকেনস নেক-এর নিরাপত্তা জোরদার করা এই প্রকল্পের লক্ষ্য। এমনই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারত-চিন-ভুটান তিন দেশের সংযোগস্থলকে জুড়তে ওই ১৭ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা। চালসা সংলগ্ন খুনিয়া মোড় থেকে জলপাইগুড়ি ও কালিম্পং বন বিভাগের মধ্য দিয়ে নতুন রেলপথটি জলঢাকা পর্যন্ত যাবে। এজন্য খরচ হবে আনুমানিক ২৭২ কোটি টাকা। এটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলে সেনাবাহিনীর যাতায়াত আরও সহজ করবে। প্রকল্পের লক্ষ্য দুর্গম হিমালয় করিডোরে পরিবহন পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করা। ২০১৭ সালে ডোকলামে ভারত-চিন সামরিক অস্থিরতার সময় এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ওই কারণে উন্নত রেল সংযোগের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় দ্রুত রসদ সরবরাহের সুযোগ তৈরি করতে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে চিন সীমান্তের ওই এলাকায় বিকল্প সড়ক তৈরির কাজ চলছে। ভূগর্ভস্থ রেললাইন পাতার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এবার তার সঙ্গে জুড়বে খুনিয়া মোড় থেকে জলঢাকা পর্যন্ত রেলপথ। রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যে সেবক-রংপো রেল প্রকল্প নাথু-লা পাস পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও 'মেক ইন ইন্ডিয়া'-র অঙ্গ হিসেবে ভারত ও ভুটানের মধ্যে রেল সংযোগের কাজ শুরু হয়েছে। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এবং বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি ৪ হাজার ৩৩ কোটি টাকার ওই প্রকল্প ঘোষণা করেছেন। এটি ভুটানের শিল্পনগরী সামৎসে এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গেলেফুকে ভারতের সঙ্গে রেলপথে জুড়বে। জলপাইগুড়ির বানারহাট এবং অসমের কোকরাঝার থেকে ট্রেন ছেড়ে ভুটানে পৌঁছবে।
এই রেল সংযোগের ফলে ভুটান ভারতীয় রেল নেটওয়ার্কের দেড় লক্ষ কিলোমিটার ব্যবহারের সুযোগ পাবে। বানারহাট-সামৎসে লাইনটি তিন বছরের মধ্যে নির্মিত হবে। কোকরাঝাড়-গেলেফু রেল সংযোগটি চার বছরে গড়ে তোলা হবে।
এই রেল সংযোগের ফলে ভুটান ভারতীয় রেল নেটওয়ার্কের দেড় লক্ষ কিলোমিটার ব্যবহারের সুযোগ পাবে। বানারহাট-সামৎসে লাইনটি তিন বছরের মধ্যে নির্মিত হবে। কোকরাঝাড়-গেলেফু রেল সংযোগটি চার বছরে গড়ে তোলা হবে। এই রেললাইন বিদ্যুতায়িত বন্দে ভারত ট্রেন চলাচলের উপযোগী হবে। ভারত সরকার রেললাইনের খরচ বহন করবে। ৩ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকায় প্রায় ৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ কোকরাঝাড়-গেলেফু লাইনে ছয়টি স্টেশন, দুটি ভায়াডাক্ট, ২৯টি বড় সেতু, ৬৫টি ছোট সেতু, দুটি শেড, একটি ফ্লাইওভার এবং ৩৯টি আন্ডারপাস থাকবে। এছাড়াও ৫৭৭ কোটি টাকায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বানারহাট-সমতসে লাইনের অংশ হিসেবে দুটি স্টেশন, ২৫টি সেতু, একটি বড় ফ্লাইওভার, ২৪টি ছোট ফ্লাইওভার এবং ৩৭টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে।
কিন্তু এত বেশি খরচের ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে কেন? শুধুই কি বাণিজ্য অথবা পর্যটন শিল্প বিকাশের প্রয়োজনে? রেল এবং গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, ভুটান পূর্ব হিমালয়ে ভারত ও চিনের মধ্যে অবস্থিত একটি দেশ। ভারতের চারটি রাজ্য আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং সিকিমের সঙ্গে ভুটানের ৬৯৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। সীমান্ত ও নিয়ন্ত্রণ রেখা নিয়ে ভিন্ন দাবি ভারত ও চিনের মধ্যে সংঘাতের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষ, ২০১৭ সালে সীমান্ত উত্তেজনার সময় ভুটানের ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্ব বাড়ে। পরবর্তীতে 'চিকেনস নেক' নিয়ে ক্রমাগত হুমকি বাড়তে থাকে! ভারত ও ভুটানের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ওই কারণে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পুরো নেটওয়ার্ক সাজানো হচ্ছে।
