চা শিল্প বাঁচাতে কেন্দ্রের আশ্বাস ও চা বলয়ের সভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সহায়তার বাণী কতখানি অসার তা টের পাচ্ছে সংশ্লিষ্ট দাস মহল। কারণ, ঘোষণার পরও সরকারি ভরতুকির একটা বিশাল পরিমাণ অর্থ বকেয়া আছে। আবেদন কয়েকজনের ক্ষেত্রে মঞ্জুর করার পর তা দেওয়া তো দূরের কথা, স্কিমটাই বন্ধ করে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছে মোদি সরকার। বারবার আবেদনেও সাড়া মিলছে না।
চা-গাছ প্রতিস্থাপন বা 'রিপ্ল্যান্টিং' এবং পুরনো গাছ উপড়ে ফেলা বা 'আপরুটিং'-এর জন্য বরাদ্দ প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ভরতুকি বকেয়া এবং স্কিমটাই বছর চারেক ধরে বন্ধ। ফলে আধুনিকভাবে ঢেলে সাজছে না বাগান। পুরনো, কম উৎপাদনশীল গাছ নিয়েই টেনে যেতে হচ্ছে উৎপাদন। যা জোর ধাক্কা খাচ্ছে। তার প্রভাব পড়তে পারে চা-বাগান শ্রমিকদের উপর। খরচ বাঁচাতে বাড়তে পারে কর্মী ছাঁটাই। আর এর জন্য টি বোর্ড অফ ইন্ডিয়ার লাল ফিতের ফাঁস ও ঢিলেমিকে দায়ী করছে চা-শিল্প মহল।
অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ অর্থ না-পাওয়ায় কার্যত ধুঁকছে ডুয়ার্স ও তরাইয়ের একাধিক চা-বাগান। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকট কাটাতে ফের একবার টি-বোর্ডের দ্বারস্থ হয়েছে চা-বাগান মালিকদের সংগঠনগুলি। কিন্তু এখনও সাড়া মেলেনি। চা-শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি চা-বাগানের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে নিয়মিত পুরনো এবং অনুৎপাদনশীল চা-গাছ উপড়ে ফেলতে হয়। তারপর সেখানে নতুন চারা রোপণ করা জরুরি। একেই বলে আপরুটিং ও রিপ্ল্যান্টিং।
গত এক দশক ধরে উত্তরবঙ্গের প্রায় পৌনে তিনশো চা-বাগান এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে। এতে উৎপাদন বাড়ছিল। যা এখন কমছে। দার্জিলিংয়ের বাগানগুলিতে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ৫.১২ মিলিয়ন উৎপাদন কমেছে বলে মেনে নিয়েছে টি বোর্ড। তরাই-ডুয়ার্সের ছবিটাও একই। এই অবস্থায় বাড়ছে শ্রমিকদের পিএফ বকেয়া। বহু বাগান কর্তৃপক্ষের নামে থানায় এফআইআরও দায়ের হয়েছে পিএফ বকেয়া থাকায়।
ইন্ডিয়ান টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ডুয়ার্স বিভাগের সেক্রেটারি রাম অবতার শর্মা বলেন, "সকলেই শ্রমিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে চান। আমরাও চাই আমাদের কর্মীদের স্বার্থের সুরক্ষা। কিন্তু শিল্পটাই তো সুরক্ষিত থাকছে না। কারন, নতুন চা গাছের রোপণ করাটা জরুরি। সেটা অনেক খরচসাপেক্ষ। কেন্দ্র আগে এই খাতে টি বোর্ডের হাত দিয়ে ভরতুকি দিত। এখন গত কয়েকবছর তা বন্ধ। আমরা বারবার আবেদন করলেও সাড়া মিলছে না। ফলে একের পর এক বাগান রুগ্ন হচ্ছে। এখন কেজি প্রতি চায়ের দামও ৩০ টাকা কমেছে।"
এখন উত্তরবঙ্গে প্রায় ১০০ বাগান রুগ্ণ বলে ইন্ডিয়ান টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্তার দাবি। অথচ কেন্দ্র সহযোগিতার হাত তুলে নিয়েছে। যা এই শিল্পে বড় ধাক্কা। তরাই ইন্ডিয়ান প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্তা মহেন্দ্র বনশল মনে করেন, "বাগানে নতুন গাছ লাগিয়ে উৎপাদন ক্ষমতা না বাড়ালে পরিস্থিতি আগামী দিনে ভয়াবহ হবে। সেটা ভাবতে হবে টি বোর্ডকেই। আমাদের
আবেদনে কোনওভাবেই কান দেওয়া হচ্ছে না।" কনসাল্টেটিভ কমিটি অফ প্ল্যান্টেশন অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্তা বলেন, "আমরা কতবার যে কেন্দ্রকে এই নিয়ে আবেদন করেছি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু চা শিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে সেই আবেদনে সাড়া দেওয়ার কথা ভাবেনি সরকার। যা উদ্বেগজনক। প্রতি বছর যেভাবে চা শিল্প লোকসানের দিকে যাচ্ছে, সেই অবস্থায় চা শিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারের সহযোগিতা খুব দরকার।
বিগত বছরগুলোতে বৃষ্টি না-হওয়ার ফলে ফার্স্ট ফ্লাশের চা পাতার গুণগত মান ভালো হয়নি। কৃত্রিমভাবে জলসেচ দিয়ে চা পাতার ভালো প্রোডাকশন পাওয়া যায় না।" ২০২৪ সালের মার্চ মাসে গোটা দেশেই চায়ের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। ওই বছর মার্চ মাসে মোট চায়ের উৎপাদন হয় ৬২.৫২ মিলিয়ন কেজি, যা ২০২৩ সালে ছিল ৭৯.৬১ মিলিয়ন কেজি অর্থাৎ এক বছরে ১৭.০৯ মিলিয়ন কেজি কম উৎপাদন হয়েছিল। গত বছরেও ছবিটা খুব একটা বদলায়নি বলে টি বোর্ড সূত্রে খবর। এই অবস্থায় কেন্দ্রের ভরতুকিই ভরসা বলে মনে করছে চা শিল্পমহল।
