বাংলাদেশের (Bangladesh) নির্বাচনী ফলপ্রকাশের পর স্বস্তির শ্বাস ফেলেছে ভারত। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার দিন থেকে ভারত যা চাইছিল ভোটে সেটাই হয়েছে। বিপুলভাবে জয়ী হয়েছে বিএনপি, একটা সময় যারা ছিল দিল্লির ‘চোখের বালি’। বিএনপির সঙ্গে কিছু দিন ধরেই দিল্লির গোপন দৌত্য চলছিল। ভোটের ফল প্রকাশের পরই তাই আর দেরি না করে অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কে না জানে, এই দলেরই নেত্রী, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আমলে দুই দেশের সম্পর্ক নিমপাতার চেয়েও তেতো হয়ে গিয়েছিল। ভোটের মুখে তাঁর মৃত্যুর পর ভারতের পার্লামেন্টে গৃহীত শোকপ্রস্তাবে বলা হয়, দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার করতে তাঁর ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রাজনীতি ও কূটনীতির প্রবাহ সদা বিস্ময়কর! স্বস্তি অবশ্যই, কিন্তু দুশ্চিন্তার কাঁটাও কি খচখচ করছে না? অবশ্যই করছে, কেননা, জামায়াতে ইসলামীর উল্কা-উত্থান ঘটেছে যেসব জায়গায়, সেগুলোর অধিকাংশই ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া। যেমন: খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ। খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে জামায়াতে জিতেছে ২৫টিতে। রংপুরের ৩৩টির মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে জিতেছে ১১টি আসন। দেশভাগের পর এসব অঞ্চলে ভারত থেকে চলে আসা মানুষজনের মধ্যে জামায়াতে প্রভাব বাড়িয়েছিল। বিএনপি ছিল দুর্বল।
সবার চোখ কপালে উঠেছে ঢাকা ডিভিশনের ফল দেখে। যেখানে জামায়াতে কোনওদিন খাতাই খোলেনি, এবার সেখানে তারা ১৫টির মধ্যে ৬টি আসন জিতেছে!
আওয়ামি লিগের চাপে কেউ-ই তেমনভাবে মাথাচাড়া দিতে পারেনি। আওয়ামি-বিসর্জনের পর খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের সীমান্তবর্তী এলাকায় এবার জামায়াতে প্রায় ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে গিয়েছে। উত্তরবঙ্গে রংপুরে তারা মাথাচাড়া দিয়েছে জাতীয় পার্টি মুছে যাওয়ায়। হুসেন এরশাদের মৃত্যুর পর দলটা এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ভাঙনও ধরেছে। ১৭ বছর ধরে তারা আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করেছে। হাসিনা-বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে গোটা দলটাই
তাই ঢলে পড়ে জামায়াতের কোলে। এই প্রথম জাতীয় পার্টি সংসদে একটিও আসন পেল না।
তবে সবার চোখ কপালে উঠেছে ঢাকা ডিভিশনের ফল দেখে। যেখানে জামায়াতে কোনওদিন খাতাই খোলেনি, এবার সেখানে তারা ১৫টির মধ্যে ৬টি আসন জিতেছে! বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতেছে অনেকগুলো কারণে। সবচেয়ে বড় কারণ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। এই স্তম্ভেই লিখেছিলাম, ভোটে না লড়লেও আওয়ামি লিগ দারুণভাবে ভোটে আছে। সমর্থকদের একাংশ বুথমুখী না হলেও অনেকেই জান-মান ও সম্পত্তিরক্ষার তাগিদে বিএনপি ও জামায়াতেকে সমর্থন দেবে। যে-যেখানে শক্তিশালী তাদের চটাবে না। এই কারণেই তারা দেশের পশ্চিম ও উত্তরে জামায়াতেকে সঙ্গ দিয়েছে। অন্যত্র কেন্দ্র হিসাবে বিএনপিকে। তারেকের দল এবার প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছে, জামায়াতে পেয়েছে ৩২ শতাংশের মতো। এত বেশি ভোট বিএনপি কোনওকালে পায়নি। তাদের ভোট ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। সেই নিরিখে এবার ১৮-২০ শতাংশের মতো ভোটবৃদ্ধি তাদের কৃতিত্বই। সৌজন্যে তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচার, যেখানে ছিল অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার।
বিএনপি জিতেছে ঠিকই, কিন্তু ৭৭ আসন জেতা জামায়াতে ইসলামীর জোট হারল কি? ছবি: সংগৃহীত।
কিন্তু বিএনপির চেয়েও বেশি কৃতিত্ব জামায়াতের। নির্বাচনী পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯১ সালে এককভাবে ভোট লড়ে জামায়াতে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছিল। সেবার আসন জিতেছিল ১৮টি, ভোট পেয়েছিল ১২ শতাংশ। ৫ বছর পর ১৯৯৬ সালে তারা আসন পায় ৩টি, ভোট ৯ শতাংশ। ২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপির জোটসঙ্গী হয়ে তারা ভোটে লড়ে। প্রথমবার ৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জেতে ১৭টি আসন, দ্বিতীয়বার ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ২টি। ১২ শতাংশ ভোটকে আড়াই গুণ বৃদ্ধি করে ৩২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে যতটা শ্লাঘার, এই উত্থান ঠিক ততটাই চিন্তার কারণ ভারতের।
চিন্তা হওয়ারই কথা। বিএনপিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা গগনচুম্বী। তা পূরণ করতে না পারলে
যে-হতাশা দেখা দেবে, জামায়াতে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহারে সচেষ্ট হবেই। ফল ঘোষণার চারদিনের মাথায় জামায়াত ও তাদের ১১ দলের জোট আন্দোলনে নেমেছে ৩২ আসনে গণনায় কারচুপি ও হামলা চালানোর প্রতিবাদে। সরকারকে তারা যে তিষ্টোতে দেবে না, রেয়াত করবে না এটা তারই ইঙ্গিত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এক সঙ্গে অনেকগুলো দিক সামলাতে হবে। বেহাল অর্থনীতিকে দাঁড় করানো প্রথম চ্যালেঞ্জ। ব্যর্থ হলে হতাশা দাবানলের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়বেই। ভারত, চিন, পাকিস্তান ও আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ। হাসিনা-বিতাড়ণের পর দেড় বছর ধরে জামায়াতে, তাদের আদর্শপুষ্ট ছাত্র সমাজ এবং মুহাম্মদ ইউনূস সরকার ভারত-বিরোধিতার তরোয়ালে যেভাবে শান দিয়েছে, তারেক জানেন, তা অনুসরণযোগ্য নয়। ধৈর্য ধরে বিচক্ষণতার সঙ্গে ওই অবস্থান থেকে সরে আসা দেশের পক্ষে জরুরি। তারেক তা বিলক্ষণ বোঝেন বলেই দেশ-বিদেশের সাংবাদিকদের কাছে বিদেশনীতি নিয়ে সাবধানী বয়ান দিয়েছেন। তঁার তৃতীয় চ্যালেঞ্জ, দল ও সরকারে কর্তৃত্ব স্থাপনের মধ্য দিয়ে আইনের শাসন যতদূর সম্ভব প্রতিষ্ঠা করা।
‘মবের মুলুক’ বলে পরিচিত বাংলাদেশের দুর্নাম ঘোচাতে মাজা-ভাঙা পুলিশ ও প্রশাসনকে দৃঢ় করা চাট্টিখানি কথা নয়। এই কাজটা দ্রুত করা না গেলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা টাল খাবে। ইউনূসের মতো তিনিও নখদন্তহীন সিংহে পরিণত হবেন। সেই প্রশাসনিক স্থবিরতা দ্রুত ভরাট করতে তৎপর হবে জামায়াতে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এক সঙ্গে অনেকগুলো দিক সামলাতে হবে। বেহাল অর্থনীতিকে দাঁড় করানো প্রথম চ্যালেঞ্জ।
দেড় দশকেরও বেশি ‘লন্ডনার্স’ (Londoners) পুরনো তারককে অনেক বদলে দিয়েছে। পশ্চিমি গণতন্ত্রকে কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার জন্যই সম্ভবত এই মুহূর্তে তিনি অনেক বেশি সংযত, পরিণত, বিচক্ষণ এবং শালীন। রাজনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি শত্রুতা করে আসা আওয়ামি লিগের নেতাদের বিরুদ্ধে একটিও অশালীন মন্তব্য তিনি এখনও করেননি। দেশে ফেরার আগে ও পরে ‘বঙ্গবন্ধু’-কে অসম্মান করেননি। শেখ হাসিনাকেও কটাক্ষ করেননি। এমনকী, ভারতের বিরুদ্ধে একটিবারের জন্যও তঁাকে কটু মন্তব্য করতে শোনা যায়নি। নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিস্ময়করভাবে শালীন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন অমলিন ক্যানভাস অনেক বছর দেখা যায়নি।
এই তারেক কিন্তু দলের বিদ্রোহীদের সামাল দিতে পারেননি। পারেননি গোষ্ঠীকোন্দল থামাতে। ৭৮টি আসনে এবার বিএনপির বিদ্রোহীরা প্রার্থী হয়েছিলেন। তঁাদের নিরসন করতে তিনি ব্যর্থ। বিদ্রোহীদের মধ্যে জিতেছেন মাত্র ৭ জন, কিন্তু তঁাদের ভোট কাটাকুটিতে জামায়াতে প্রার্থীরা জিতেছেন ২১টি আসন। মায়ের মৃত্যুর পর সহানুভূতির হাওয়ায় ভেসে সর্বসম্মতভাবে নেতা নির্বাচিত হয়েও দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় তারেক ব্যর্থ। প্রধানমন্ত্রিত্বের গুরুদায়িত্ব পালনে কতটা সফল হবেন সবার নজর সেদিকেই। ভারতেরও।
দেশ-বিদেশের সাংবাদিকদের কাছে বিদেশনীতি নিয়ে সাবধানী বয়ান দিয়েছেন তারেক রহমান। ফাইল চিত্র।
ভাষা আন্দোলনে জন্ম নেওয়া দেশটির জনতা শুরু থেকেই এক দ্বন্দ্বে দীর্ণ। বাঙালি সত্তা ও ধর্মীয় সত্তার মধ্যে কোনটা প্রথম, বাংলাদেশিরা আগে বাঙালি না আগে মুসলমান, সেই দ্বন্দ্বের অবসান কখনও ঘটেনি। মুসলমান সত্তাকে প্রাধান্য দেওয়া অংশ ক্রমেই ঝুঁকে পড়েছে দক্ষিণপন্থী ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দিকে। হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিকে উত্তাল করে দেওয়া সেই অংশ দ্রুত দেশের দখলদার হতে চলেছে, এমন ধারণা, বিশ্বাস ও প্রচার ভোটের আগে গেড়ে বসেছিল। সেই মোক্ষম সময়ে বাঙালি সত্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন রবীন্দ্র-নজরুল-লালন-সুফি ভাবাদর্শে লালিত বাঙালি গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বিএনপিকে জিতিয়ে দক্ষিণপন্থী ধর্মীয় মতবাদকে দৃঢ়ভাবে ‘তফাত যাও’ বলতে পেরেছে। এটা কম বড় আশাব্যঞ্জক নয়।
বিএনপি জিতেছে ঠিকই, কিন্তু ৭৭ আসন জেতা জামায়াতে ইসলামীর জোট হারল কি? প্রশ্নটা রয়েই গেল। চূড়ান্ত উত্তর পেতে তাকিয়ে থাকতে হবে তারেক রহমানের যোগ্যতা, নেতৃত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পন্ন বাঙালির বিচক্ষণতা ও বিবেচনার উপর। ঠিক এইভাবে ভারতীয় সংসদে বিজেপিও একদিন ২ থেকে ৮৯ হয়েছিল। এখন তারা শাসক! সীমান্তের দুই ধারে এ এক অদ্ভুত সমাপতন! ওপারের বাঙালিদের কঠিন পরীক্ষা শুরু আজ থেকেই।
(মতামত নিজস্ব)
saumyabandyo@gmail.com
