shono
Advertisement

যে বোঝে ‘ভৌ ভৌ’, ‘ম্যাও ম্যাও’! চাহিদা বাড়ছে ‘প্রাণী সংবাদক’দের

এঁরা বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ‘বিকল্প’ নন, বরং আবেগগত সাপোর্ট সিস্টেমের অংশ।
Published By: Biswadip DeyPosted: 05:24 PM Feb 19, 2026Updated: 05:26 PM Feb 19, 2026

ধরুন, হঠাৎ আপনার পোষ্যটি খাওয়া বন্ধ করে দিল, বা হয়ে উঠল অস্বাভাবিক রকম হিংস্র। এমতাবস্থায় অনেকেই মনে করেন, প্রাণীটি কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু ভাষার অভাবে সে বার্তা ধরা দিচ্ছে না। এই জায়গাতেই ডাক পড়ে ‘অ্যানিম‌্যাল কমিউনিকেটর’-দের, যঁারা মানসিক সংযোগ ও অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে প্রাণীর অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করে দিকনির্দেশ দেন। লিখছেন আদিত্য ঘোষ।

Advertisement

লুবুকে চোখের আড়াল করলেই হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেত। কপালে জমা হত বিন্দু বিন্দু ঘাম। সাদা ধপধপে কুকুরছানাকে চোখের আড়াল হতেই দিত না তার মালকিন। নিজের ছেলের মতো করে বড় করার শপথ নিয়েছে সে। কিন্তু সেই লুবু একবার চোখের আড়াল হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি ফেরেনি দু’রাত্রি। তখন প্রথম একটি শব্দবন্ধনী শুনেছিলাম– ‘অ্যানিম‌্যাল কমিউনিকেটর’। প্রথমে শুনে বুঝতে পারিনি। উচ্চারণও করতে পারিনি। পরে জেনেছিলাম এই আশ্চর্য বিষয়ে।

‘অ্যানিম‌্য‌াল কমিউনিকেটর’ বা ‘প্রাণী সংবাদক’ এমন এক ধরনের পেশাজীবী, যঁারা দাবি করেন, তঁারা মানুষ ও পোষ্যর মধ্যে আবেগগত বা অন্তর্দৃষ্টিনির্ভর যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন। সহজভাবে বলতে গেলে, তঁারা নিজেদের প্রাণীর অনুভূতি, অস্বস্তি, ভয়, আনন্দ বা চাহিদা প্রকাশ করার মধ্যস্থতাকারী হিসাবে তুলে ধরেন। অনেক সময় ধ্যান, মনঃসংযোগ বা তথাকথিত টেলিপ্যাথিক পদ্ধতির মাধ্যমে পশুদের কথা বোঝার কথা বলা হয়, আবার কেউ কেউ প্রাণীর শরীরী ভাষা, আচরণ, চোখের দৃষ্টি, শব্দ বা অভ্যাস বিশ্লেষণ করে তার মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেন। এই দ্বিতীয় পদ্ধতিটি তুলনামূলকভাবে বৈজ্ঞানিক, কারণ আচরণবিজ্ঞান স্বীকার করে যে, প্রাণীরা ভঙ্গি ও প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে স্পষ্ট সংকেত দেয়। ফলে এই পেশার একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক বা বিশ্বাসভিত্তিক ব্যাখ্যা রয়েছে– তেমনই অন্যদিকে রয়েছে পর্যবেক্ষণ, সহানুভূতি ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার উপর দঁাড়িয়ে থাকা এক ধরনের ‘পেট কাউন্সেলিং’।

বিশেষত হালের সমাজে, যেখানে পোষ্যকে পরিবারের ‘সদস্য’ হিসাবে দেখা হয়, সেখানে মালিকদের আবেগগত নিশ্চয়তা ও মানসিক সান্ত্বনা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই পেশা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘অ্যানিম‌্যাল কমিউনিকেটর’ মূলত প্রাণীর ভাষা নয়, মানুষের আবেগ ও প্রাণীর আচরণের মাঝের সেতুবন্ধন তৈরির দাবিদার একটি বিকল্প পেশা।

‘অ্যানিম‌্যাল কমিউনিকেটর’ বা ‘প্রাণী সংবাদক’ পেশাটি বিশ শতকের শেষভাগে পাশ্চাত্য সমাজে জন্ম নেওয়া একটি আধুনিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রবণতার ফল। এই ধারণার সূত্রপাত ঘটে সাতের দশকে আমেরিকায়। সে-সময় সেখানে আধ্যাত্মিকতা, ধ্যানচর্চা, বিকল্প চিকিৎসা ও শক্তিনির্ভর নিরাময়-পদ্ধতির প্রতি মানুষের আগ্রহ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। একই সঙ্গে পোষ্য প্রাণীকেও কেবল গৃহপালিত জীব হিসাবে নয়, পরিবারের সদস্য হিসাবে দেখার মানসিকতা তৈরি হচ্ছিল। এই পরিবর্তিত সামাজিক প্রেক্ষাপটে কিছু ব্যক্তি দাবি করতে শুরু করেন যে, তঁারা প্রাণীদের অনুভূতি, অস্বস্তি বা মানসিক বার্তা অন্তর্দৃষ্টি বা বিশেষ সংবেদনশীলতার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারেন এবং সেই অনুভূতিগুলিকে মানুষের ভাষায় ব্যাখ্যা করে দিতে সক্ষম।

এক্ষেত্রে প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য নামগুলির মধ্যে অন্যতম ছিলেন পেনেলোপ স্মিথ– যিনি বই, প্রশিক্ষণ এবং কর্মশালার মাধ্যমে অ্যানিম‌্যাল কমিউনিকেশনকে একটি স্বতন্ত্র পেশা হিসাবে পরিচিত করে তোলেন। অবশ্য এর বহু আগেই বিভিন্ন সমাজে পশুপালক, শিকারি বা প্রাণী-প্রশিক্ষকদের মধ্যে প্রাণীর আচরণ বোঝার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ছিল, তবে সেগুলি ছিল পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতানির্ভর জ্ঞান, কোনও আধ্যাত্মিক বা বাণিজ্যিক পরিষেবা নয়। সেই
অর্থে আধুনিক ‘অ্যানিম‌্যাল কমিউনিকেটর’ পেশাকে বলা যায় প্রাণীর আচরণবিষয়ক জ্ঞান, মানুষের আবেগগত চাহিদা এবং সমকালীন পোষ্যপরিচর্যা শিল্পের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক নতুন সামাজিক ও পেশাগত নির্মাণ।

ভারতে ‘অ্যানিম‌্যাল কমিউনিকেটর’ পেশার বিস্তার তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক এবং তা মূলত ২১ শতকের প্রথম দশকের পর থেকে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। শহুরে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, পারমাণবিক পরিবার ব্যবস্থা, একাকিত্ব এবং পোষ্যকে পরিবারের সদস্য হিসাবে দেখার প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণাটি ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছে। প্রথম দিকে এটি ছিল বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগ। কেউ নিজেকে ‘পেট হিলার’, কেউ ‘অ্যানিম‌্যাল সাইকিক’ বা ‘কমিউনিকেটর’ হিসাবে পরিচয় দিতেন। পরে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ভিডিও কলের মাধ্যমে সেশন নেওয়ার চল শুরু হয়, যেখানে ছবি দেখে বা ধ্যানের মাধ্যমে পোষ্যের মানসিক অবস্থা বোঝার দাবি করা হয়। পাশাপাশি পেট ওয়েলনেস শিল্পের প্রসার– যেমন, পেট স্পা, আচরণ, পরামর্শ, বিকল্প চিকিৎসা এই পেশাকে একটি বাণিজ্যিক কাঠামোও দেয়। ফলে এটি একদিকে আধ্যাত্মিক বিশ্বাস, অন্যদিকে মনস্তাত্ত্বিক সান্ত্বনা ও বাজারচালিত পরিষেবার মিশ্র রূপে প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ভারতে এখনও এই পেশার কোনও বৈজ্ঞানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। পশুচিকিৎসক ও প্রাণী-আচরণ বিশেষজ্ঞরাই মূলধারার সমাধান হিসাবে গ্রহণযোগ্য। ‘অ্যানিম‌্যাল কমিউনিকেটর’-এর কাজ মূলত মানুষের সঙ্গে প্রাণীর আবেগগত দূরত্ব কমিয়ে এক ধরনের বোঝাপড়ার সেতু তৈরি করা। তঁারা দাবি করেন, প্রাণীরা মানুষের মতো কথা না বললেও তাদের অনুভূতি, ভয়, অস্বস্তি বা প্রয়োজন বিভিন্ন সংকেতের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, আর সেই সংকেতগুলিকে ব্যাখ্যা করাই তঁাদের কাজ। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় কয়েকটি ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যার কিছু অংশ বিশ্বাসনির্ভর, আবার কিছু
অংশ পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক। অনেক কমিউনিকেটর ধ্যান বা গভীর মনঃসংযোগের মাধ্যমে প্রাণীর সঙ্গে তথাকথিত ‘ইনটুইটিভ’ বা ‘টেলিপ্যাথিক’ যোগাযোগ স্থাপনের কথা বলেন। তঁারা মনে করেন– প্রাণীর ছবি, অনুভূতি বা মানসিক বার্তার আকারে তঁাদের মনে ধরা দেয়, যা পরে তঁারা মালিককে ভাষায় ব্যাখ্যা করেন।

তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত একটি পদ্ধতি হল– আচরণ বিশ্লেষণ, অর্থাৎ প্রাণীর শরীরী ভাষা, হঁাটার ধরন, লেজ নাড়া, চোখের দৃষ্টি, খাদ্যাভ্যাস, ঘুম বা আচমকা পরিবর্তন লক্ষ করে তার মানসিক বা শারীরিক অবস্থার ধারণা করা। এই অংশটি প্রাণী আচরণবিজ্ঞানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। আবার কেউ কেউ এনার্জি হিলিং বা প্রশান্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করে প্রাণীকে শান্ত করার চেষ্টা করেন, যা অনেক সময় মালিকের মনস্তাত্ত্বিক সান্ত্বনাও জোগায়। ‘অ্যানিম‌্যাল কমিউনিকেটর’-এর প্রয়োজন সাধারণত তখনই অনুভূত হয়, যখন পোষ্য প্রাণীর আচরণ বা পরিস্থিতি মালিকের কাছে সম্পূর্ণ ধঁাধার মতো হয়ে ওঠে। ধরুন– হঠাৎ আপনার পোষ্যটি শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও অকারণে খাওয়া বন্ধ করে দিল, চুপচাপ হয়ে গেল, বা অস্বাভাবিক রকম হিংস্র আচরণ করতে শুরু করল।

এমন অবস্থায় অনেকেই মনে করেন, প্রাণীটি যেন কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু ভাষার অভাবে সেই বার্তা ধরা যাচ্ছে না। এই জায়গাতেই ‘অ্যানিম‌্যাল কমিউনিকেটর’-রা মানসিক সংযোগ ও অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে প্রাণীর অনুভূতি, ভয়, অস্বস্তি বা পরিবেশগত ইঙ্গিত বোঝার চেষ্টা করেন, এবং মালিককে কিছু দিকনির্দেশ দেন, কোথায় খুঁজতে হবে, কী বদল আনতে হবে, বা কীভাবে আরও যত্ন নিতে হবে। অর্থাৎ এটি চিকিৎসা বা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বিকল্প নয়, বরং সহানুভূতি ও বোঝাপড়ার একটি সম্পূরক পথ, যা মানুষ ও পোষ্যের সম্পর্ককে আরও গভীর করে তুলতে সাহায্য করে।

শহুরে জীবনে পোষ্য প্রাণীটি আর নেহাত বাড়ির পাহারাদার নয়। তারা এখন পরিবারের সদস্য, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের বিকল্প। একাধিক ‘পেট কেয়ার ইন্ডাস্ট্রি’ রিপোর্ট বলছে– দেশে পোষ্য প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। শহরে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, একাকিত্ব ও দেরিতে বিয়ে করার প্রবণতার কারণে ‘পেট পেরেন্টিং’ একটি বড় ট্রেন্ড হয়ে উঠেছে।

বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের ‘পেট কেয়ার’ শিল্প ইতিমধ্যেই হাজার কোটি টাকার গণ্ডি ছুঁয়েছে এবং বছরে ১৫-২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার সঙ্গে গ্রুমিং, ট্রেনিং, পেট থেরাপি, এমনকী অ্যানিম‌্যাল কমিউনিকেশনের মতো ‘বিকল্প’ পরিষেবাও যুক্ত হচ্ছে। মানুষ যখন পোষ্যের আবেগকে সন্তানের মতো গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন তার মানসিক সমস্যা বা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তারা আরও ব্যক্তিগত, সহানুভূতিভিত্তিক সমাধান খুঁজছে। ঠিক এই জায়গাতেই ‘অ‌্যানিম‌্যাল কমিউনিকেটর’-রা জায়গা করে নিচ্ছেন। তঁারা বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ‘বিকল্প’ নন, বরং আবেগগত সাপোর্ট সিস্টেমের অংশ। ফলে আধুনিক শহুরে একাকিত্ব, পারিবারিক কাঠামোর বদল এবং প্রাণীও অনুভূতিসম্পন্ন সঙ্গী। এই নতুন সামাজিক ধারণার মিলিত প্রভাবে ভারতে এই পেশার চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement
toolbarHome ই পেপার toolbarup মহানগর toolbarvideo শোনো toolbarshorts রোববার