shono
Advertisement
Satyajit Ray

সত্যজিতের ‘মহানগর’: অর্থনৈতিক ভুবন থেকে অনুভবের জগতে কলকাতার স্বরূপ

‘মহানগর’ চলচ্চিত্রে কলকাতার রোমাঞ্চকর রূপের বিশাল কোনও দৃশ্যপট নেই। বরং তা যেন সার্থকভাবে বয়ে নিয়ে চলে শহরের প্রকৃত সত্তাকে।
Published By: Biswadip DeyPosted: 02:32 PM Apr 23, 2026Updated: 02:32 PM Apr 23, 2026

সত্যজিৎ রায়ের ‘কলকাতা ট্রিলজি’-র সিনেমা রূপে যেসব ছবি পরিচিতি, ১৯৬৩ সালের ‘মহানগর’ তার অংশ নয়। কিন্তু ‘মহানগর’ রূপায়ণের মধ্যে দিয়েই তিনি যেন ‘কলকাতা ট্রিলজি’-র ভ্রূণটি গড়ে তুলেছিলেন। এখানে যে-শহরকে দেখানো হয়েছে, তা অব্যর্থভাবে কলকাতাই। অর্থনৈতিক ভুবন থেকে অনুভবের জগতে যে তীব্র ভাঙচুর ধরা পড়েছে, তার প্রাণভ্রমর এই শহর, বললে ভুল নেই। 

Advertisement

গত শতকের সাতের দশকের প্রথম ক’-বছরে চলচ্চিত্রের ক্যানভাসে যেন কলকাতাকে অঁাকতে চাইলেন মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায়ের মতো পরিচালক। মৃণাল সেনের ‘ক্যালকাটা ট্রিলজি’ তৈরি হল তিনটি রাজনীতি-প্রভাবিত সিনেমা নিয়ে– ১৯৭১ সালের ছবি ‘ইন্টারভিউ’, ’৭২ সালের ‘কলকাতা ৭১’, আর ১৯৭৩ সালে তৈরি ‘পদাতিক’। সত্যজিতের ‘ক্যালকাটা ট্রিলজি’-র ছবিগুলি, আমরা জানি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প নিয়ে তৈরি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ (১৯৭০), আর শংকরের দু’টি উপন্যাসের ভিত্তিতে তৈরি ‘সীমাবদ্ধ’ (১৯৭১), ‘জন অরণ্য’ (১৯৭৫)।
শংকরের প্রয়াণের পরে সম্প্রতি ফিরে দেখছিলাম সত্যজিতের কলকাতা ট্রিলজি। সে-প্রসঙ্গেই মনে হল, সত্যজিতের সিনেমায় কলকাতার রূপনির্ঝর তো মূলত এই ত্রিভুজের পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়, সিনেমার মধ্য দিয়ে সত্যজিতের কলকাতা-চিত্রণ শুরু হয়েছে আরও আগে। সেই যে গ্রাম থেকে উচ্চশিক্ষার সন্ধানে শহরে এল অপু– ‘অপরাজিত’ (১৯৫৬) সিনেমায়। তারপর অবশ্যই রয়েছে ১৯৬৩ সালের ছবি ‘মহানগর’, যার শুটিং পুরোটাই হয়েছে কলকাতায়।

তথাকথিত ‘কলকাতা ট্রিলজি’ যেন খুঁজে ফেরে ১৯৭০ সালের দশকের কলকাতার সামাজিক, রাজনৈতিক, নৈতিক অবক্ষয়কে। সিদ্ধার্থ, শ্যামলেন্দু এবং সোমনাথের মধ্য দিয়ে সত্যজিৎ যেন লুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য এবং ক্ষমাহীন নির্মম আধুনিকতার মধ্যে আটকে থাকা, হঁাসফঁাস করতে থাকা– কলকাতা মহানগরের একটি প্রজন্মের গভীর, গভীরতম উদ্বেগকে প্রকাশ করেন। চিত্রিত করেন নগর-জীবনের সংগ্রাম, আপস, অন্তহীন ইঁদুর-দৌড়ের গল্পকে– বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং কর্পোরেট লোভের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা তরুণদের অস্থির জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে।

ফিরে দেখি সত্যজিতের ‘মহানগর’-এর দিকে। সেখানে কলকাতা কেবল একটি পট কিংবা স্লেট নয়, বরং তা একটি গতিশীল ও থ্রিলারের ‘চরিত্র’, যা একটি প্রথাগত মধ্যবিত্ত পরিবারকে বাধ্য করে আধুনিক ও পুঁজিবাদী নব্য বাস্তবতা ও মানসিকতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে।

কিন্তু ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, ‘জন অরণ্য’ ছাড়া অন্য দু’টি সিনেমা আসলে যেন এক ‘জেনারেল’ মহানগরের পটভূমিকায় তৈরি সিনেমা মাত্র, যে মহানগর কলকাতা হতে পারে, কিংবা হতে পারে প্যারিস, নিউ ইয়র্ক, মুম্বই, লন্ডন কিংবা টোকিও, বা অন্য কোনও শহর। এমনকী হতে পারে, টি. এস. এলিয়টের কবিতার মতো ‘আনরিয়েল সিটি’, কোনও ‘অবাস্তব’ কিংবা ‘অচিন’ শহর। যা বোধকরি এক চিরন্তন মহানগরের বর্ণনা।

একটু ফিরে দেখি সত্যজিতের ‘মহানগর’-এর দিকে। সেখানে কলকাতা কেবল একটি পট কিংবা স্লেট নয়, বরং তা একটি গতিশীল ও থ্রিলারের ‘চরিত্র’, যা একটি প্রথাগত মধ্যবিত্ত পরিবারকে বাধ্য করে আধুনিক ও পুঁজিবাদী নব্য বাস্তবতা ও মানসিকতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে। চলচ্চিত্রটি দেশভাগ-পরবর্তী অস্থির মহানগরের খণ্ডচিত্র, যে মহানগরের জীবন-কাঠামো চ্যালেঞ্জ জানায় পিতৃতান্ত্রিক রীতিনীতিকে এবং নতুন বিন্যাস ঘটায় পারিবারিক গঠন-বিন্যাসের। এ ছবির শহর কিন্তু কোনও ‘আনরিয়েল সিটি’ হতে পারে না।

স্বাধীনতা এবং দেশভাগের পরের উত্তাল দশক, অর্থাৎ পঁাচের দশকের কলকাতার প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘মহানগর’ আদপে এক মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলায় আসে এক নতুন অর্থনৈতিক চাপ, যা গভীরভাবে প্রভাবিত করল কলকাতার মধ্যবিত্ত সমাজের জীবন-সংগ্রামকে।

এ একান্তভাবেই কলকাতা মহানগরের গল্প। ‘মহানগর’ প্রসঙ্গে আমার নিজের ছাত্রজীবনের একটি স্মৃতি রোমন্থন করি। আটের দশকের শেষদিকে আমি তখন কলেজ-ছাত্র। ইকোনমিক্সের এক ক্লাসে এ. সি. ম্যাম পড়াচ্ছিলেন ভারতে আনএপ্লয়মেন্টের কারণসমূহ। হঠাৎই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’ দেখেছ? চলচ্চিত্রটা তখন ২৫ বছরের পুরনো। কিন্তু সেদিনের ক্লাসে হাত তুলল অনেকেই। ম্যাম বললেন, ‘মহানগর’-এ মাধবী যে-মুহূর্তে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরে পা দিল, ভারতের বেকার সমস্যা একলাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল। কলেজের অনেক কিছুই ভুলেছি পরের প্রায় চার দশকে– কিন্তু পড়ানো এবং সুপ্রযুক্ত উদাহরণের গুণে এটি ভুলিনি এখনও। যদিও সেখানে সার্বিকভাবে বলা হয়েছিল দেশের কথা, তবু ‘মহানগর’-এর গল্পটা তো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো দেশভাগোত্তর কলকাতা শহরকে নিয়েই। চলচ্চিত্রে ১৯৫০ ও ’৬০-এর এই শহরকে যেন চিত্রিত করা হয়েছে এক পুঁজিবাদী ‘যন্ত্র’ রূপে। শহরটিই যেন পরিবর্তনের অনুঘটক, যেখানে টিকে থাকার স্বার্থে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই নামতে হয় উপার্জনে। তাই ‘মহানগর’-কে বাদ দিয়ে হতেই পারে না সত্যজিতের কলকাতা সিরিজ। প্রতিবেশীর রেডিও থেকে ভেসে আসা অবিরাম সুর, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া যানবাহনের শব্দ, রাস্তার হকারদের হঁাকডাক– সবকিছুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ধরেই।

স্বাধীনতা এবং দেশভাগের পরের উত্তাল দশক, অর্থাৎ পঁাচের দশকের কলকাতার প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘মহানগর’ আদপে এক মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলায় আসে এক নতুন অর্থনৈতিক চাপ, যা গভীরভাবে প্রভাবিত করল কলকাতার মধ্যবিত্ত সমাজের জীবন-সংগ্রামকে। পরিবারের আর্থিক চাহিদা মেটাতে নারী-পুরুষ উভয়েরই বাইরে গিয়ে কাজ করা হয়ে পড়ল অপরিহার্য। ওই যে মাধবী– অর্থাৎ ‘মহানগর’-এর আরতি– ঘরের চৌকাঠ পেরল, তাকে পেরতে হল, সে হয়ে উঠল এক নতুন আধুনিক নারীর প্রতীক– পরবর্তীতে কলেজের অর্থনীতির ক্লাসের উদাহরণ।

চলচ্চিত্রটি নিপুণভাবে তুলে ধরেছে কীভাবে নগরজীবনের বেঁচে থাকার লড়াই প্রথাগত শালীনতাবোধ এবং পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের সদস্যদের পারস্পরিক সম্প্রীতিকে ফেলে দেয় চ্যালেঞ্জের মুখে। চলচ্চিত্রটি তাই নগরজীবনের এক নতুন ‘এথোস’ বা জীবনদর্শন, বিশেষ করে কলকাতা মহানগরের প্রেক্ষিতে। ভেঙেচুরে তৈরি হতে থাকে নৈতিকতার এক নতুন পরিসর।

‘মহানগর’-কে বাদ দিয়ে হতেই পারে না সত্যজিতের কলকাতা সিরিজ। প্রতিবেশীর রেডিও থেকে ভেসে আসা অবিরাম সুর, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া যানবাহনের শব্দ, রাস্তার হকারদের হঁাকডাক– সবকিছুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ধরেই।

চলচ্চিত্রের পরিধিতে অনিল চট্টোপাধ্যায় অভিনীত আধা-পিতৃতান্ত্রিক চরিত্র সুব্রতকেও যুদ্ধ করতে হয়, সে তার স্ত্রীর নতুন ভূমিকা এবং তার প্রেক্ষিতে নিজের পরিবর্তিত অবস্থানকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে চলে। আরতির চরিত্রের মতোই হয়তো বা তার চেয়েও বেশি পরিমাণে কঠিন সুব্রতর জীবনের সংকট ও সংগ্রাম। তবু সমালোচকের চোখে সুব্রতকে ছাপিয়ে প্রধান হয়ে ওঠে আরতি চরিত্রটি, সমাজের এক পরিবর্তন-বিন্দুর রূপক রূপে। পরিবর্তনটা যদিও শুধুমাত্র আরতির হাত ধরে আসে না– সুব্রতর ভূমিকা সেখানে অতি গুরুত্বপূর্ণ। এবং গুরুত্বপূর্ণ ‘মহানগর’-এর নৈব্যক্তিক ভূমিকাও। ‘মহানগর’-এ বিবিধ চরিত্রর মধ্যের সংঘাত অবশ্য গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আসেনি। যেমন, আরতিকে তার বস বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে এবং সুব্রত দেখতে পেল তা। চলচ্চিত্রে বিষয়টা নিয়ে সংঘাত এড়িয়ে যাওয়া
হয়েছে এক শৈল্পিক দক্ষতায়। কিংবা এক প্রকাণ্ড, কঠিন মহানগর হয়তো গ্রাস করে ফেলে এসব ছোটখাট সংঘাতকে।

‘মহানগর’ চলচ্চিত্রটি যেন সামগ্রিকভাবে এক সামাজিক দিন-বদলকে, এক রূপান্তরকে তুলে ধরেছে কোলাহলপূর্ণ ও ক্রমবিকাশমান এক মহানগরের দৃষ্টিকোণ থেকে। নৈব্যক্তিক হয়েও শহর যেন এক প্রবল পরাক্রান্ত চরিত্র– এক ‘নীরব চালিকাশক্তি’ হিসাবে সুদৃঢ় হয়ে ওঠে শহরের ভূমিকা। এই মহানগরই পরিবারের অন্দরমহলে নিয়ে আসে স্বাধীনতা ও সংঘাতের দ্বৈত অভিঘাত– একসঙ্গে। এই প্রেক্ষিতে দঁাড়িয়ে ‘মহানগর’ চলচ্চিত্রে কলকাতার রোমাঞ্চকর রূপের বিশাল কোনও দৃশ্যপট নেই– বরং তা যেন সার্থকভাবে বয়ে নিয়ে চলে শহরের প্রকৃত সত্তাকে।

সত্যজিতের জীবনীকার অ্যান্ড্রু রবিনসন মনে করেছেন ছবিটি কলকাতার অস্তিত্বের বুননেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। চলন্ত ট্রামের উপরের বৈদ্যুতিক সংযোগ-তারে বিদ্যুতের ক্ষণস্থায়ী ঝলকানি ও স্ফুলিঙ্গ; ছবির একেবারে শেষ দৃশ্যে একটি আধ-ভাঙা রাস্তার বাতি– যা ‘মহানগর’ ছবিটিকে দেয় এক তৃপ্তিদায়ক ও অনাড়ম্বর সংহতি– সবই সেই মহানগরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

ছবির শেষে সুউচ্চ বিল্ডিংয়ের পটভূমিতে সুব্রতকে মৃদুস্বরে আরতি বলে, “এত বড় শহর! এত রকম চাকরি। দু’জনের একজনও কি পাব না একটা?” ‘মহানগর’ নামের একটি চলচ্চিত্রকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য সত্যজিৎ হয়তো সংলাপের মধ্যেও শহরকে একটি সত্তা হিসাবে তুলে ধরার তাগিদ অনুভব করে থাকবেন, এমনটাই মনে করেছেন অ্যান্ড্রু রবিনসন। সতর্ক আশাবাদের সুরে ভর করে স্বামী-স্ত্রী আর. এন. মুখার্জি রোড ধরে ডালহৌসি স্কোয়‌্যারের চারপাশের সন্ধ্যার অফিসের ভিড়ের মধ্যে হেঁটে চলে যায় এবং একসময় হারিয়ে যায় ফুটপাতের ভিড়ে। বলা ভাল, কল্লোলিনী তিলোত্তমার ভিড়ে। ক্যামেরা উপরের দিকে উঠে আবার পিছনের দিকে সরে যায়– প্রকাশ করে সেই আধ-ভাঙা রাস্তার বাতি।

চিদানন্দ দাশগুপ্ত আবার মনে করেছেন যে, এ ছবির পটভূমিতে কলকাতা মহানগর রয়েছে বেশ অস্পষ্টভাবে। তার জনসমাগম, তার টানাপোড়েন সম্পূর্ণভাবে ফুটে ওঠেনি সিনেমায়। ছবির শুরুতে ট্রামকারের উপরের প্যান্টোগ্রাফটি নিচ দিয়ে চলে যাওয়ার যে-দৃশ্য দেখানো হয়েছে, তা আকর্ষণীয় ও ইঙ্গিতবহ হলেও, বাস্তব রাস্তার জীবনকে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত বলে মনে হয়েছে তঁার। অফিসের দৃশ্যগুলি যথেষ্ট বাস্তবসম্মত হলেও, সেগুলি গভীর নৈরাশ্য, দুর্নীতি এবং জটিলতার ইঙ্গিত দেয় না। সত্যজিৎ পরে সেসব নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলবেন ‘জন অরণ্য’-তে, এমনটাই লিখেছেন চিদানন্দ দাশগুপ্ত। সেটা হয়তো ঠিকই। তবু সত্যজিৎ-কর্তৃক কলকাতা মহানগরের সেলুলয়েড রূপায়ণের একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রূপে ‘মহানগর’-কে উল্লেখ করতেই হবে– আরতির চৌকাঠের বাইরে পা রাখার মতোই একটি স্টেপ এটি। সুস্পষ্ট। তঁার কলকাতা সিরিজকে বোঝাই যাবে না একে ছাড়া।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement