লোকসভার আসন বৃদ্ধি, মহিলা সংরক্ষণ ও ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি অনুযায়ী লোকসভার সঙ্গেই সারা দেশের বিধানসভার ভোট করানো। কোনওটাই সার্থক হল না। সৌভাগ্য, বিরোধীরা সেই যজ্ঞে জল ঢেলেছে। বাধ্য করেছে প্রধানমন্ত্রীকে মাথা নোয়াতে।
১২ বছরে এই প্রথম সংসদে মাথা নোয়াতে হল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে (PM Modi)। মহিলাদের জন্য আইনসভায় আসন সংরক্ষণের ধুয়ো নতুন করে তুলে ক্ষমতায় থাকার বন্দোবস্ত পাকাপাকি করার যে চমৎকার ছকটা কষেছিলেন, সম্মিলিত বিরোধী প্রতিরোধে তা বানচাল হল। এমনটা হতে পারে, সেই অনুমানও তঁারা করেছিলেন। তবু জেনেশুনেও সেই পথে তঁারা হেঁটেছেন, যেহেতু তঁাদের মনে হয়েছিল এটা হবে ‘দো ধারি তরোয়াল’। সংবিধান সংশোধন বিলটা পাশ হয়ে গেলে মোদি বন্দিত হবেন নারীমহলের মসিহা হিসাবে, না হলে বিরোধীদের কপালে নারী-বিরোধী তকমা সেঁটে ভোট ময়দানে ফুল ফোটানোর চেষ্টা করবেন। দেশের মা-বোনেদের কাছে বিরোধীদের ভিলেন করে তুলবেন। ঢাকঢোল পিটিয়ে সেই প্রচার শুরুও হয়ে গিয়েছে। জাতির প্রতি ভাষণে বিরোধীদের ‘ভ্রূণহত্যা’-র দায়ে দুষেছেন। তিন বছর আগে হওয়া আইন এত দিন পরেও কী করে ‘ভ্রূণ’ থাকে বোঝা দায়! দেখা যাক, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর মহিলা মহলের কাছে অতঃপর মোদি হ্যামলিনের বঁাশিওয়ালা হয়ে ওঠেন কি না।
এটা ছিল এক সূক্ষ্ম চালাকি। চালাকিটা ধরে ফেলতে বিরোধীরা দেরি করেননি। উপযুক্ত জবাবও তঁারা দিয়েছেন। বলছেন, লোকসভায় পা হড়কানোর পর মোদি এখন ‘নাকি কান্না’ কঁাদছেন। শনিবাসরীয় রাতের ভাষণ সেই কুম্ভীরাশ্রু। বিরোধীদের শাপশাপান্ত করতে করতে বলেছেন, মা-বোনেরা নাকি তঁাদের কখনও ক্ষমা করবেন না।
তঁাদের মনে হয়েছিল এটা হবে ‘দো ধারি তরোয়াল’। সংবিধান সংশোধন বিলটা পাশ হয়ে গেলে মোদি বন্দিত হবেন নারীমহলের মসিহা হিসাবে, না হলে বিরোধীদের কপালে নারী-বিরোধী তকমা সেঁটে ভোট ময়দানে ফুল ফোটানোর চেষ্টা করবেন।
দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পাওয়া যাবে না-জেনেও এই কাজে নামার অনেকগুলো তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর ছিল। এপস্টিন ফাইলসে তঁার চরিত্র আগামী দিনে কীভাবে চিত্রিত হবে, সে নিয়ে তিনি যথেষ্ট সন্দিহান। বেশ ভয়ে ভয়েও রয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে সুব্রহ্মণ্যম স্বামী ও মধু কিশওয়ারেরা তঁার চরিত্রে লাগাতার কালি ছেটাচ্ছেন। এপস্টিন ফাইলসের রহস্য পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হলে মুখ দেখানো দায় হবে। আমেরিকার সঙ্গে খারাপ ও ক্ষতিকর এমন বাণিজ্য চুক্তি সেই কারণেই করতে বাধ্য হলেন কি না তা তিনিই ভাল বলতে পারবেন। দেশে এ নিয়ে খোলাখুলি সমালোচনা হচ্ছে। অনেকের বিশ্বাস, তঁার দুর্বলতায় ঘা মেরে ট্রাম্প নিজের বাণিজ্যিক স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। এত দিন ধরে নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ বলে ঢাক পেটালেও পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ থামাতে পাক ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তঁাকে টেক্কা দিয়েছেন। ভাবমূর্তি অটুট রাখতে কিছু একটা করতে তঁাকে হতই। সেই কারণেই কোল্ড স্টোরেজ থেকে মহিলা সংরক্ষণ আইনকে টেনে বের করা। ভাবলেন, যে-দুর্বলতার জন্য তঁাকে কথা শুনতে হচ্ছে, সেই মহিলাদেরই মসিহা হতে হবে। ক্ষমতায় থাকার পাকাপাকি বন্দোবস্তের পথ ‘অর্ধেক আকাশ’-ই দেখিয়ে দেবে।
চালাকিটা যদিও ধরা পড়ে গিয়েছে। লোকসভায় বিরোধীরা যা বলেছেন, সংবাদ সম্মেলন করে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও সেই খোঁটা দিয়েছেন। মোদিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছেন, মহিলাদের জন্য প্রাণ এতই যদি কঁাদে, তাহলে ৩ বছর আগে পাশ হওয়া সংরক্ষণ আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে ২০২৯ সালের ভোট থেকেই তা কার্যকর করুন। জনগণনা ও ডিলিমিটেশনের অপেক্ষায় না থেকে লোকসভার ৫৪৩ আসনের এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষণ করুন। সবাই সমর্থন করবে। মোদি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেননি। জাতির প্রতি ভাষণে প্রিয়াঙ্কার ওই প্রস্তাবের উল্লেখও করেননি। তিনি শহিদ হতে চাইলেন। ক্ষমা চেয়ে বিরোধীদের ভিলেন করে তোলার চেষ্টা চালালেন। একটা কথা মানতেই হবে। মোদি-শাহ রাজনীতিটা করেন ১০-১৫ বছরের কথা ভেবে। স্রেফ ভোট জেতার জন্য নয়। এই সিদ্ধান্তটিও তারই প্রমাণ।
চালাকিটা যদিও ধরা পড়ে গিয়েছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী মোদিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছেন, মহিলাদের জন্য প্রাণ এতই যদি কঁাদে, তাহলে ৩ বছর আগে পাশ হওয়া সংরক্ষণ আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে ২০২৯ সালের ভোট থেকেই তা কার্যকর করুন।
লোকসভার আসন বাড়ানোর বিষয়টা মোদির মাথায় এসেছিল দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। তিনি জানতেন, ইন্দিরা গান্ধী ও অটলবিহারী বাজপেয়ী ২৫-২৫ করে ৫০ বছর লোকসভার আসন সংখ্যা ‘ফ্রিজ’ রাখার যে-সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা ২০২৬ সালে শেষ হবে। ২০২১ সালের জনগণনার নিরিখে তারপর লোকসভার আসন বাড়াতে হবে। কোভিডের জন্য ২০২১ সালের জনগণনা স্থগিত রাখা হয়। সেই অবসরে নতুন পার্লামেন্ট ভবন তৈরির সিদ্ধান্ত নেন মোদি। তিনি বুঝেছিলেন, জনগণনার ভিত্তিতে আসন বাড়ানো হলে দক্ষিণের চেয়ে উত্তরের বৃদ্ধি অনেক বেশি হবে। তখন মহিলা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করাও সহজ হবে। তিনি এ-ও বুঝেছিলেন, জনসংখ্যার নিরিখে আসন বাড়ানোর প্রস্তাবে দাক্ষিণাত্যের সম্মতি মিলবে না। প্রতিরোধ হবেই। অতঃপর নতুন ছকের আমদানি। ২০২৩ সালে মহিলা সংরক্ষণ আইন পাশ করালেন সর্বসম্মতিতে। যদিও রূপায়ণে এমন শর্ত চাপানো হল যাতে কোনওভাবেই তা ২০৩৪ সালের নির্বাচনের আগে বলবত না হয়।
তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, ১১ বছর অপেক্ষা কেন? বর্তমান সংসদেই কেন বলবৎ করা হচ্ছে না? মোদিরা তাতে কান দেননি। তঁাদের কাছে মহিলা ক্ষমতায়নের চেয়েও বড় ছিল সংসদ দখলের পাকাপাকি বন্দোবস্ত করা। তাই জনগণনা। তাই ডিলিমিটেশনের সঙ্গে সংরক্ষণকে জুড়ে দেওয়া। আদর্শ ও নীতিগতভাবে মহিলা-বিরোধী আরএসএস-বিজেপি জেনেবুঝেই এই ফরমুলা হাজির করে যাতে বিরোধীরা মানলে সোনায় সোহাগা, না-মানলেও ক্ষতি নেই। তাদের দুই হাতেই থাকবে রসগোল্লার হঁাড়ি।
২ এপ্রিল বাজেট অধিবেশনের শেষ দিনেই তাই জানিয়ে দেওয়া হয়, এপ্রিলের মাঝামাঝি ৩ দিনের বিশেষ অধিবেশন বসবে। সেদিন থেকেই সর্বভারতীয় ইংরেজি ও হিন্দি দৈনিকের পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্বপূর্ণ খবরের কাগজের মাস্টহেডের নিচে মহিলা বিলের মাহাত্ম্য প্রচার শুরু হয়। কোটি কোটি টাকা খরচ করে দেওয়া বিজ্ঞাপনে মোদি সরকারের মহিমা প্রচার হতে থাকে। একই সঙ্গে হতে থাকে সব রাজ্যের আসন ৫০ শতাংশ বাড়ানোর প্রচার। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা বলতে থাকেন– কারও আসন কমানো হবে না, সবার আসন সমান হারে বাড়ানো হবে। যার ২টি আসন আছে, তার আসন হবে ৩, যার ৪০ তার হবে ৬০। তাঁরা ভেবেছিলেন, দাক্ষিণাত্যের ক্ষোভ ও শঙ্কা ওই টোপে মিটে যাবে। দাক্ষিণাত্যে আসন বাড়বে ৬৬টি, অন্যত্র ২০০। লোকসভার আসন বেড়ে হবে ৮৫০। জনগণনার উপর ভিত্তি করে লোকসভার আসন আর বাড়াতে হবে না। ডিলিমিটেশনও তাঁরা করবেন নিজেদের কোলে ঝোল টেনে, ঠিক যেমন করা হয়েছে জম্মু-কাশ্মীর ও অসমে। এবং এইভাবে দাক্ষিণাত্যের সমর্থন ছাড়াই তঁাদের পাকাপাকি ক্ষমতায় থাকার পথ প্রশস্ত হবে। এটাই ছিল পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখলের পাকাপাকি বন্দোবস্ত।
চালাকি আরও একটা ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন, এর পাশাপাশি ২০২৯ সালেই ‘এক দেশ এক ভোট’ চালু করে দেবেন। এক ফাঁদে তিনটি পাখি ধরতে চেয়েছিলেন। লোকসভার আসন বৃদ্ধি, মহিলা সংরক্ষণ, ও ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি অনুযায়ী লোকসভার সঙ্গেই সারা দেশের বিধানসভার ভোট করানো। সৌভাগ্য, বিরোধীরা সেই যজ্ঞে জল ঢেলেছেন। বাধ্য করেছেন মাথা নোয়াতে।
দেশের মা-বোনেদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আগামী দুই সপ্তাহ বিরোধীদের বাপবাপান্ত করবেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় সংসদ ভবন চত্বরে বিজেপির মহিলাদের প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ মিছিল ছিল তারই মহড়া। শনিবার তঁারা রাহুল গান্ধীর বাড়ি ঘেরাওয়ের কর্মসূচি নেন। এই সঙ্গে নতুনভাবে লেখা হচ্ছে মোদি-শাহর নির্বাচনী ভাষণ।
চালাকি আরও একটা ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন, এর পাশাপাশি ২০২৯ সালেই ‘এক দেশ এক ভোট’ চালু করে দেবেন। এক ফাঁদে তিনটি পাখি ধরতে চেয়েছিলেন।
মহিলাদের শৃঙ্খলমোচনের প্রচেষ্টা বিরোধীরা কীভাবে বানচাল করলেন সেই আখ্যান এবার সাতকাহন করে শোনানো হবে। মোদির দৃষ্টিতে এখন শুধুই পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু। কনভয় থামিয়ে ঝালমুড়ি কেনা, খাওয়া ও বিলানোর মধ্য দিয়ে পাবলিককে ‘আমি তোমাদেরই লোক’ বোঝানোর পাশাপাশি তিনি নিজেকে তুলে ধরছেন নারীদের ত্রাতা হিসাবে। এপস্টিন ফাইলসের বিপ্রতীপে খুলতে চাইছেন অমলিন নতুন খাতা। নতুন বঁাশিওয়ালা।
(মতামত নিজস্ব)
