মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভেবেছিলেন: মুসলমান সমর্থন, জনমুখী ভাতা প্রকল্প এবং ‘অর্ধেক আকাশ’ তাঁকে তরিয়ে দেবে। ‘নবান্ন’-য় ফেরার তাগিদে লড়াইটাকে তিনি বাঙালির সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও পরম্পরা বনাম বহিরাগত আগ্রাসনে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। ‘এসআইআর’ নামক ব্রহ্মাস্ত্রটি ভোঁতা করতে বাঙালির হয়রানি, অসম্মান ও অপমানের সুতলিতে আগুন ধরাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ। কেন? লিখছেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রত্যাবর্তন নয়, রাজ্যজুড়ে যে-পরিবর্তনের স্রোত বইছিল সে নিয়ে এখন আর কারও মনে কোনওরকম সন্দেহ থাকা ঠিক নয়। পক্ষকাল রাজ্যে কাটানোর প্রতিটি ক্ষণে সে প্রমাণ পেয়েছি। সেই স্রোতের টান তৃণমূল নেত্রীও কি পাননি? নিশ্চয়ই পেয়েছিলেন। কিন্তু ভেবেছিলেন– মুসলমান সমর্থন, জনমুখী ভাতাপ্রকল্প ও ‘অর্ধেক আকাশ’ তাঁকে তরিয়ে দেবে। আরও একবার ‘নবান্ন’-য় ফেরার তাগিদে লড়াইটাকে তাই তিনি বাঙালির সংস্কৃতি ও কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও পরম্পরা ‘বনাম’ বহিরাগত আগ্রাসনে পরিণত করতে চেয়েছিলেন।
নির্বাচন কমিশনের তূণ থেকে বেরিয়ে আসা ‘এসআইআর’ নামক ব্রহ্মাস্ত্রটি ভোঁতা করতে বাঙালির হয়রানি, অসম্মান ও অপমানের সুতলিতে আগুন ধরাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ। কেন, কী কারণে ব্যর্থতার এই নাগপাশ তাঁকে জড়াল নিশ্চয়ই সে ময়নাতদন্ত তিনি করবেন। উত্তরণের পথ খুঁজবেন। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করবেন। আর হয়তো ভাববেন– কংগ্রেস ২৭ বছর রাজত্ব করল, বামফ্রন্টও একটানা ৩৪ বছর, তাঁকে কেন ১৫ বছরেই সরে যেতে হল?
স্বাধীনতার ২০ বছর পরও যে-রাজ্যটি ছিল দেশের অর্থনীতির ‘নার্ভ সেন্টার’, শহর কলকাতা ছিল, যার অর্থনৈতিক রাজধানী, তার ক্রমাবনতি নিয়ে দশকের পর দশক আলোচনা চললেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। না-হওয়ার একটি প্রধান কারণ কেন্দ্র ও রাজ্যের রাজনৈতিক বৈরিতা। বামফ্রন্টের সময় থেকে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত দিন-দিন এই রাজ্যকে পিছিয়ে দিয়েছে। তৃণমূলের আমলেও তার পরিবর্তন ঘটেনি। সত্যি বলতে কী, পশ্চিমবঙ্গ ও কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্ক গত অর্ধশতক ধরে প্রায় অহি-নকুলে পরিণত। ‘বিমাতৃসুলভ’ মনোভাব শব্দের প্রকৃত অর্থ কী, অর্ধ শতাব্দী যাবৎ এ রাজ্যের শাসকেরা তা মজ্জায়-মজ্জায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
এটি এমন ভোজবাজি নয় যে, রাতারাতি সব পাল্টে যাবে। জনতা সেই সময়টুকু সরকারকে দেবে। কিন্তু দ্রুত যা করা যায়, সেই তালিকাও কম নয়। রন্ধ্রে-রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দুর্নীতি দূর করা না গেলেও সরকারি কাজে স্বচ্ছতা অন্তত আনা যেতে পারে।
এই প্রথম কলকাতা ও দিল্লির একদলীয় রাজনৈতিক আদর্শ ও তার মেলবন্ধন দুর্দশা ঘোচানোর আশা জাগাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বারবার রাজ্যের হৃত গৌরব ফেরানোর কথা বলেছেন। শ্যামাপ্রসাদের জন্মভূমিকে ‘সোনার বাংলা’ করে তোলার অঙ্গীকার করেছেন। পশ্চিমবঙ্গকে উন্নয়নের ‘সামনের সারি’-তে নিয়ে আসার কথা বলেছেন। বঙ্গবাসী তাই সর্বার্থে ‘ভাল থাকা’-র স্বপ্ন দেখতেই পারে। ভাবতেই পারে– পশ্চিমবঙ্গও হবে মহারাষ্ট্র, গুজরাত, তামিলনাড়ু, কর্নাটকের মতো উন্নত রাজ্য। যুব-জনতাকে আর কাজের সন্ধানে আর ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে হবে না। সাধারণ মানুষের জীবন ‘ভাতা-ভিত্তিক’ হয়ে থাকবে না। ‘ডাব্ল ইঞ্জিন’ সরকারের সুফলের আশায় থাকা বঙ্গবাসী হতাশায় নিমজ্জিত হলে ভবিষ্যতে তার মাশুল এখনকার শাসককেও গুনতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হুট করে হয় না।
এটি এমন ভোজবাজি নয় যে, রাতারাতি সব পাল্টে যাবে। জনতা সেই সময়টুকু সরকারকে দেবে। কিন্তু দ্রুত যা করা যায়, সেই তালিকাও কম নয়। রন্ধ্রে-রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দুর্নীতি দূর করা না গেলেও সরকারি কাজে স্বচ্ছতা অন্তত আনা যেতে পারে। পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা সিন্ডিকেট-রাজের অবসান ঘটাতে পারে। বেমালুম উবে যাওয়া আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে পারে। পুলিশের দলদাসবৃত্তি ঠেকাতে পারে। বেহাল সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে। নতুন সরকারকে এমন কিছু করে দেখাতে হবে যাতে জনতা বুঝতে পারে সত্যিই পরিবর্তন ঘটেছে।
নবকলেবরে পুরনোর প্রত্যাবর্তন নয়। এই নির্বাচনী ফলের দিকে সারা দেশের নজর যেমন চিটেগুড়ে আটকা থাকা মাছির মতো লেপ্টে ছিল, তেমনই প্রবল আগ্রহ ছিল বাংলাদেশেরও। ভোট দেখতে কলকাতায় আসার সময় থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে তিন-চারবার ফোন এসেছে-ওপার বাংলা থেকে। ওপারের সংখ্যালঘু হিন্দুদের আগ্রহ দিদির বদলে মোদি আসছেন কি না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশের হিন্দু সমাজ এখনও ‘ত্রাতা’ মনে করে। বিশ্বাস করে, মোদির প্রবল উপস্থিতি তাদের উপর ‘অত্যাচার’ বন্ধের সহায়ক। দিদির হার ও মোদির জয় তাদের নিশ্চিতই আশ্বস্ত করেছে। মানুষ নিজেদের নিরাপদ ভাবছে। যদিও মানুষের ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার মিল সবসময় হয় না।
অন্যদিকে, এক শঙ্কাও চাগাড় দিচ্ছে। বহু মানুষ মনে করছে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান ওদেশের ইসলামি মৌলবাদীদের শক্তি জোগাবে। বাংলাদেশের তিনদিকেই এখন বিজেপির রমরমা। ত্রিপুরায় বিজেপি-বিরোধী কোনও শক্তি এখনও সেভাবে মাথা তুলতে পারেনি। অসমে বিজেপি আরও শক্তি বাড়িয়ে ক্ষমতায় এল। সে-রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা দিন দিন যেভাবে মুখরা হয়ে উঠছেন বাংলাদেশে তার প্রভাব পড়ছে। মেঘালয়েও বিজেপি কনরাড সাংমার ন্যাশনাল পিপল’স পার্টি-র সরকারের শরিক। এবার পশ্চিমবঙ্গের মসনদও এল তাদের দখলে।
এটা তাদের চিন্তার একটা দিক। এপার বাংলায় বিজেপির এই উত্থান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রকে কীভাবে প্রভাবিত করবে এখনও অজানা। নির্বাচনের পর বিএনপির ক্ষমতাসীন হওয়া ও সম্পর্কের উন্নতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগ্রহ প্রকাশ মুহাম্মদ ইউনূসের আমলের আড়ষ্টতা কাটানোর ইঙ্গিতবাহী। দীনেশ ত্রিবেদীকে হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত করার ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক ভাবনাচিন্তা সরকারের রয়েছে। বিজেপির বাংলা দখলের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রবাহ কোন খাতে বয় তা দেখার। নবান্ন-দখলের পর ‘ঘুষপেটিয়া’ রাজনীতি ও অনুপ্রবেশকারীদের ‘চুন চুনকে’ বেছে ফেরত পাঠানোর আখ্যান ধরে রাখলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটবে কি?
নির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার পর যে-তত্ত্ব এখন নস্যাৎ। ফলে সংগত প্রশ্ন, এখন তিনি কী করবেন? কংগ্রেসের প্রতি কি নমনীয় হবেন?
প্রশ্নটি তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের পালাবদল ‘তিস্তা চুক্তি’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কিছুটা আশাবাদী করে তুলতে পারে। মনমোহন সিংয়ের সময় থেকে আটকে থাকা এই চুক্তি নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরেও এক পা এগয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় বারবার বাধা পেয়েছে। মোদিও বারবার শেখ হাসিনাকে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাধ্যবাধকতা বুঝিয়েছেন। বলেছেন, মমতা রাজি না হলে এটা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এবার কিন্তু সেই যুক্তির ‘অজুহাত’ হয়ে ওঠা কঠিন। দিল্লি-কলকাতার ডাব্ল ইঞ্জিন সরকার এবং উত্তরবঙ্গে বিজেপির একচ্ছত্র আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাধ্যবাধকতা হটিয়ে দিল। তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন না-করতে হলে প্রধানমন্ত্রীকে এখন অন্য যুক্তির সন্ধানে যেতে হবে। বাংলাদেশ যদিও আশাবাদী। কারণ, তারা জানে, কংগ্রেস আমলে স্থল সীমান্ত চুক্তির বিরোধিতা করেছিল অসমের বিজেপি নেতৃত্ব। মোদি ক্ষমতাসীন হয়ে সেই বিরোধিতা মিটিয়ে চুক্তি সই করেছিলেন।
এই নির্বাচন বহু দিনের এক ধারণা এবং রটনারও অবসান ঘটাল। ‘দিদি-মোদি সেটিং’ তত্ত্ব নিয়ে আর কাউকে গলা ফাটাতে দেখা যাবে না। অতঃপর প্রশ্ন, মমতার রাজনীতি এখন কোন খাতে বইবে? জাতীয় স্তরে কংগ্রেসের নেতৃত্ব কখনও কিছুতেই মেনে নেননি মমতা। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বের বিরোধিতা তিনি বারবার নানাভাবে করে গিয়েছেন। রাজনৈতিক দিক থেকে তাতে লাভবান হয়েছে বিজেপি। ওই বিরোধিতাও অনেকের কাছে ‘দিদি-মোদি সেটিং’ তত্ত্ব বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। নির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার পর যে-তত্ত্ব এখন নস্যাৎ। ফলে সংগত প্রশ্ন, এখন তিনি কী করবেন? কংগ্রেসের প্রতি কি নমনীয় হবেন? মমতার ‘১০০ আসন চুরি’-র অভিযোগে রাহুল একমত। ফল ঘোষণার পরপরই মমতাকে তিনি ফোন করেছেন। তৃণমূলকে পুরোপুরি কাছে টানার চেষ্টা রাহুল করবেনই। এই পরিস্থিতিতে মমতাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জিতলে জাতীয় স্তরে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতৃত্বদানের দাবি যতটা জোরালোভাবে জানাতে পারতেন, হারের পর অবশ্যই সেই অবস্থানে তিনি থাকবেন না। আবার, মায়াবতীর মতো বিচ্ছিন্ন থাকাও কঠিন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্যানভাসে নতুন রঙের পোঁচ লাগার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় স্তরের রাজনীতিতেও অনেক বদল ঘটে গেল। কেরলমের রাজনীতি কংগ্রেসকে চনমনে করে তুলে বামপন্থীদের রাজ্যহীন করে দিল। তামিলনাড়ুতে উদয় ঘটল তৃতীয় শক্তির। বিজয়কে ঘিরে আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি শুরু হয়েছে সঙ্গ পাওয়ার প্রতিযোগিতা। অপরিবর্তিত শুধু নরেন্দ্র মোদির ভাগ্য। এখনও তিনি সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
(মতামত নিজস্ব)
saumyabandyo@gmail.com
