মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর জেলার বার্গি ড্যামে পর্যটন দপ্তরের পরিচালিত ক্রুজ বোট ডুবির দুর্ঘটনা প্রশাসনিক গাফিলতির অনন্য নজির। এটি শুধুমাত্র একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়– মানুষের অবহেলা, প্রস্তুতির অভাব, নিয়ম লঙ্ঘনের পরিণতি। ঝড়ের মধ্যে নৌকাটি উলটে যায়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার সতর্কতা কি আগে থেকে ছিল না? থাকলে কেন যাত্রীবোঝাই নৌকা ছেড়ে দেওয়া হল? আরও গুরুতর অভিযোগ, যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই সময়মতো ‘লাইফ জ্যাকেট’ পাননি। যদি এই অভিযোগ সত্যি হয়, তবে তা নিছক গাফিলতি নয়, এক ধরনের অপরাধ। সামান্য প্রস্তুতি ও সচেতনতা থাকলে আরও বহু প্রাণ রক্ষা করা যেত।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ২৯ জন যাত্রী এবং ২ জন ক্রু সদস্য নিয়ে বার্গি বাঁধের জলাধারে বিহার করছিল একটি ক্রুজ বোট। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, হঠাৎ করেই প্রবল ঝড় শুরু হয় এবং জলাধারের জল উত্তাল হয়ে ওঠে। আতঙ্কে পর্যটকরা চিৎকার করে চালককে নৌকাটি তীরে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু প্রবল বাতাসের শব্দে সেই চিৎকার চালকের কানে পৌঁছায়নি। শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ক্রুজটি মাঝ-জলাধারে উল্টে যায়।
এরপর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে– দুর্ঘটনার পরে বিপুল তৎপরতা যদি সম্ভব হয়, তবে দুর্ঘটনা এড়াতে আগাম কঠোরতা কেন ছিল না? সিসিটিভি ফুটেজে ৪৩ জনকে নৌকায় উঠতে দেখা গেলেও শনাক্ত হয়েছে ৪১ জন। এই বিভ্রান্তিও দেখায়– যাত্রীতালিকা ও নিয়ন্ত্রণে কতটা ঢিলেঢালা ব্যবস্থা ছিল। রাজ্য সরকার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, তিনজন ক্রু সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
শুধু দোষীদের শাস্তি দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নীতি গড়ে তোলা জরুরি।
সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে এ ধরনের নৌকা-চলাচল। কিন্তু এসব ব্যবস্থা প্রায়শই দুর্ঘটনার পরেই নেওয়া হয়, যখন আর কিছুই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এফআইআর দায়ের হবে, দায় নির্ধারণ হবে। কিন্তু যাদের প্রাণ গেল, তাদের জন্য এই বিচার কতটা সান্ত্বনা? এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পর্যটন শিল্পে নিরাপত্তা কোনও আনুষঙ্গিক বিষয় নয়– এটিই মূল ভিত্তি। প্রতিটি নৌযান চালানোর আগে আবহাওয়ার মূল্যায়ন, যাত্রীসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক করা, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রশিক্ষণ– এসবকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার বার্তা স্পষ্ট– দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এই প্রেক্ষিতে শুধু দোষীদের শাস্তি দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নীতি গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে নিয়মিত সুরক্ষার নিরীক্ষা, কর্মীদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালু করা দরকার। পাশাপাশি, যাত্রীদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে– নিরাপত্তা বিধি মানার ক্ষেত্রে যেন কোনও শিথিলতা না থাকে। আমাদের সাফ কথা: দুর্ঘটনা প্রতিরোধই হোক প্রশাসনের প্রথম লক্ষ্য, মানবিক দায়বদ্ধতা রক্ষা করাই হোক প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু।
