একাধিকবার নির্বাচন লড়েছি। বারবার জনতার উদ্দেশে বলতাম– নিজের ভোট নিজে দিন। এবার মানুষ নিজের ভোট নিজে দিয়েছে। ‘এসআইআর’-এর সবচেয়ে ভাল দিকের কথা উঠলে, এটাই বলব। লিখছেন অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায়।
দেশের আর কোনও প্রধানমন্ত্রী কি প্রতিটি জনসভায় বারবার এই আবেদন করেছেন রাজ্যবাসীর কাছে যে, পশ্চিমবঙ্গকে তিনি ‘প্রথম সারি’-র একটি ‘প্রগতিশীল’ রাজ্য হিসাবে দেখতে চান? না, নরেন্দ্র মোদি ছাড়া অন্য নাম এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না আমার। এই বিধানসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গে যে ঐতিহাসিক জয় বিজেপি অর্জন করল, তার অন্যতম প্রধান কান্ডারি রূপে তাই প্রধানমন্ত্রীকেই স্মরণ করব।
‘প্রথম সারি’-র রাজ্য কাকে বলব? যেখানে শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, শিল্পোন্নয়ন থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার– পূর্ণমাত্রায় রক্ষিত হবে। চাকরির সন্ধানে এ রাজ্যের সন্তানদের যেখানে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে হবে না। পশ্চিমবঙ্গ থেকে এই কাঙ্ক্ষিত পরিমণ্ডলটি যেন হারিয়ে গিয়েছিল। দুর্নীতি– মারণরোগের ভাইরাসের মতো সর্বত্র সঞ্চারিত হয়েছিল। মানুষ– দুর্নীতি ও তার দোসর ঘুষতন্ত্রের জেরে জেরবার। ফলে বিজেপির হয়ে রণকৌশল নির্মাণের সময়ে, আমরা জোর দিয়েছিলাম যথাসম্ভব নিচুতলার মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষের কারণ অনুসন্ধান করে, তার ভিত্তিতে নির্বাচনের ন্যারেটিভ রচনা করতে। জনসাধারণের যে-অংশের ভোট আমরা পাই না, তা কেন পাই না, সেটি যেমন আমাদের আলোচনায় স্থান পেয়েছিল; তেমনই যে-অংশের ভোট আমরা পেতে অভ্যস্ত, কী করে তার বাইরেও সংগঠনকে বিস্তার করা যেতে পারে, সে নিয়েও আমরা ভাবনাচিন্তা করেছি। আমাদের দল সর্বভারতীয় দল। পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে, তঁাদের মতামতের উপর, আমাদের নির্বাচনী কৌশল নির্ণীত হয়েছে।
‘প্রথম সারি’-র রাজ্য কাকে বলব? যেখানে শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, শিল্পোন্নয়ন থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার– পূর্ণমাত্রায় রক্ষিত হবে। চাকরির সন্ধানে এ রাজ্যের সন্তানদের যেখানে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে হবে না। পশ্চিমবঙ্গ থেকে এই কাঙ্ক্ষিত পরিমণ্ডলটি যেন হারিয়ে গিয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গে ভারী মাপের শিল্পের সম্ভাবনা অঙ্কুরিত হয়নি। শিল্প বিনিয়োগের রোড ম্যাপ খুঁজে পাওয়া ভার! সে-কারণে কর্মসংস্থান নেই। তার পাশাপাশি, সংঘাতের রাজনীতির বয়ানকে বারবার সামনে আনা হয়েছে। রাজ্যসফরে আসা প্রধানমন্ত্রীকে যখন ‘ট্যুরিস্ট’ বলে অভিহিত করা হয়, তখন একটি দ্বিখণ্ডিত ও সংঘাতপূর্ণ আবহের ছবি আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ-প্রসঙ্গে বলব যে, বিগত বেশ কয়েক বছর পশ্চিমবঙ্গ যেন বিচ্ছিন্নতাকামী রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। যখন একটি আঞ্চলিক দলের সর্বভারতীয় সম্পাদক সগর্বে বলেন– ‘দ্য ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া ক্যান কাম, স্টিল মাই ডায়মন্ড হারবার মডেল উইল সারভাইভ’– আমরা বুঝতে পারি, আসলে ‘ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ এবং এই প্রদেশের মধ্যে পার্থক্য তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে সুকৌশলে। এই ধরনের ভাষা কি আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবের দিকে ঠেলে দেয় না?
মানুষ তাই মনে-মনে বিতৃষ্ণায় ভুগছিল! মানুষ ‘বিকল্প’-র সন্ধান করছিল। এবার সেই ‘বিকল্প’ মানুষ খুঁজে পেয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য স্বচ্ছতা প্রয়োজন। প্রয়োজন ‘রুল অফ ল’ বা আইনের নিরপেক্ষ সত্তার সর্বাঙ্গীণ বিকাশ ঘটতে দেওয়া। সাম্প্রদায়িক তোষণের অভিযোগ বারবার বিদায়ী প্রশাসনের বিরুদ্ধে উঠেছিল। ‘ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট’ হচ্ছে বুঝতে পেরেও তারা নড়েচড়ে বসেনি। সামশেরগঞ্জ থেকে মোথাবাড়ি– তৎকালীন প্রশাসনের তরফে যে তৎপরতা কাম্য ছিল, তা কি আমরা দেখতে পেয়েছিলাম? এই নিয়ে যখন আমরা প্রশ্ন তুলেছি, উলটে আমাদেরই ‘সাম্প্রদায়িক’ বলা হয়েছে। মানুষ এত দিনে এসব প্রশ্নের উত্তর ইভিএমের মাধ্যমে প্রদান করল।
সামশেরগঞ্জ থেকে মোথাবাড়ি– তৎকালীন প্রশাসনের তরফে যে তৎপরতা কাম্য ছিল, তা কি আমরা দেখতে পেয়েছিলাম? এই নিয়ে যখন আমরা প্রশ্ন তুলেছি, উলটে আমাদেরই ‘সাম্প্রদায়িক’ বলা হয়েছে। মানুষ এত দিনে এসব প্রশ্নের উত্তর ইভিএমের মাধ্যমে প্রদান করল।
‘এসআইআর’-এর প্রয়োজনীয়তা ছিল ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের স্বার্থে। ‘এসআইআর’-কে তাই ‘গণশত্রু’ প্রমাণের চেষ্টা বু্যমেরাং হল। ভোটার তালিকা বরং ‘সার’-প্রয়োগে আরও নিশ্ছিদ্র হয়েছে। যারা ‘অবৈধ’ ভোটার, তারা ভোট দিতে না-পারার পরিণতিও উজ্জ্বলভাবে ধরা পড়েছে। ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি আসলে বিদায়ী দলটির তরফে করা হত। একটি সম্প্রদায়ের মানুষের উপর তারা নির্ভর করত ভোটের জন্য। অথচ, সেই মানুষদের আত্মিক ও সামাজিক উন্নতির জন্য কী করা হয়েছিল– প্রশ্নটি উঠবে।
আমি একাধিকবার নির্বাচন লড়েছি। বারবার জনতার উদ্দেশে বলতাম– নিজের ভোট নিজে দিন। এবার কিন্তু প্রতিটি মানুষ নিজের ভোট নিজে দিয়েছে। ‘এসআইআর’-এর সবচেয়ে ভাল দিকের কথা উঠলে, এটাই বলব। ‘প্রথম সারি’-র রাজ্য হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এটি যেন একধাপ এগনো। ভয় দেখিয়ে এবার আর মানুষকে গৃহবন্দি করে রাখা যায়নি। এরাজ্যে বিনিয়োগ আসুক, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে উঠুক, শিল্পায়নের রোড ম্যাপ তৈরি হোক, এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকুক– তবেই না নির্বাচনী সাফল্যের স্বাদ মানুষ অনুভব করতে পারবে!
(মতামত নিজস্ব)
