পরিবেশ ও পরিস্থিতি বদলাতে থাকলে মানুষের অনুভূতি যে কত বিচিত্রভাবে ধরা পড়ে, সে-কথা উঠলে সত্যজিৎ রায়ের 'পটলবাবু ফিল্মস্টার' গল্পটির কাছে বারবার ফিরে যেত হয় যেন। জীবনের এমন পড়ন্ত বেলায় অভিনয়ের জন্য পটলবাবু ডাক পেলেন, যখন নতুন করে অভিনয় করার আশা প্রায় বিসর্জন দিয়েছিলেন তিনি। উঠতি নায়ক চঞ্চলকুমারের সঙ্গে চলতি পথে ধাক্কা লাগবে- চিত্রনাট্য তাই দাবি করছে। সেই সময় পটলবাবু বলবেন 'আঃ'। এই একটি মাত্র ধ্বনি মুখ থেকে নির্গত হবে তাঁর। সঙ্গে ডায়লগ নেই? এমন শুধিয়ে অবশ্য যথেষ্ট বেইজ্জত হতে হয়েছে। প্রোডাকশনের লোকজন তাঁকে বলেছে, 'বরেন মল্লিকের ছবিতে স্পীকিং পার্ট- আপনি বলছেন কী? আপনি তো ভাগ্যবান লোক মশাই! জানেন, আমাদের এই ছবিতে আজ পর্যন্ত দেড়শ জন লোক পার্ট করে গেছে যারা কোনও কথাই বলে নি।... এমনকী আমাদের যে নায়ক চঞ্চলকুমার- তারও আজ কোন ডায়ালগ নেই।'
পটলবাবু বিরক্ত হয়েছিলেন, হতাশও। ভেবেছিলেন, করবেন না অভিনয়। 'বিষের নামে খোঁজ নেই, কুলোপানা চক্কর'। বারবার 'সাইলেন্ট' হেঁকে শুটিং চলছে। উত্তেজনা নেই। অথচ থিয়েটার কত প্রত্যক্ষ, সজীব। পটলবাবু দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। এবং হঠাৎ করে তাঁর মনে পড়ে গগন পাকড়াশীর কথা, পটলবাবুর নাট্যগুরু। তিনি বলতেন, 'নাটকের এক-একটি কথা এক-একটি গাছের ফল।... তোমাকে জানতে হবে কী করে সে ফল পেড়ে খোসা ছাড়িয়ে তার থেকে রস নিংড়ে বার করে সেটা লোকের কাছে পরিবেশন করতে হয়...।'
'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' যখন মানুষের কাজের জগতে প্রবলভাবে নাক গলাচ্ছে, মানুষের কাজ এমন দক্ষতায় করছে যে, মানুষই কাজ হারাচ্ছে, তখন 'অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার্স' দু'টি তাৎপর্য ঘোষণা করেছে।
পটলবাবু তাই নতুন করে মন বাঁধলেন। 'আঃ'- এই ধ্বনি উচ্চারণ করতে থাকলেন নানা মাত্রায়, নানা অভিব্যক্তিতে। গলা কখনও খাদে, কখনও উচ্চগ্রামে, কখনও অস্ফুট হল। ধাক্কা লাগার সময় যদি হাতে একটি খবরের কাগজ থাকে, বেশ হয়। এ-কথা উপযাচক হলে পরিচালকের টিমের কাছে পেশ করলেন। তারপর দশ আনা বিরক্তির সঙ্গে তিন আনা বিস্ময় ও তিন আনা ধাক্কার যন্ত্রণাজনিত তেতো মিশিয়ে মোক্ষম টাইমিংয়ে বললেন- 'আঃ!' সে-অভিনয় উচ্চ প্রশংসিত হল। অন্তরের অভিনেতা মরেনি, আবিষ্কার করে পটলবাবু তৃপ্ত। অভিনয় করে প্রাপ্য টাকা না নিয়েই চলে এলেন।
'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' যখন মানুষের কাজের জগতে প্রবলভাবে নাক গলাচ্ছে, মানুষের কাজ এমন দক্ষতায় করছে যে, মানুষই কাজ হারাচ্ছে, তখন 'অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার্স' দু'টি তাৎপর্য ঘোষণা করেছে। 'এআই' অবতারবিশিষ্ট অভিনেতা অস্কার পাবে না। আর সেরা চিত্রনাট্যের স্বীকৃতি পাবেন কোনও রক্তমাংসের মানুষই, চ্যাটবট নয়। মানুষের অনুভূতি ও উপলব্ধি, কল্পনা ও অবচেতনের গুরুত্ব যেন এতদ্দ্বারা রক্ষিত হল। পটলবাবু যেভাবে 'আঃ!' বলেছিলেন, তার মধ্যে শিল্পী-মনের জ্যান্ত স্বাক্ষর ছিল, 'এআই' শত অনুকরণেও যা ছুঁতে পারবে না। মানুষের মনের যে আশ্চর্য গতি, তা-ই মানুষের শিল্পসৃজনে মূর্ত হয়ে উঠেছে চিরকাল। 'অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার্স' সেই মানব-মহিমার জয়গান গাইল।
