নির্বাসনের কথা উঠলে মিলান কুন্দেরার নাম উচ্চারিত হয়। পুনরাবৃত হয় তাঁর জীবনকথা। যেমন--- তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিচ্ছেন (১৯৪৮) এবং দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিতাড়িত (১৯৫২) হচ্ছেন দল থেকে। আবার যোগদানের ডাক (১৯৫৬) পাচ্ছেন, আবার বিতাড়িত হচ্ছেন চিরতরে (১৯৭০)। অর্থাৎ ভদ্রলোক কর্তাভজা কথাবার্তায় অভ্যস্ত ছিলেন না। তাঁর প্রথম উপন্যাস 'দ্য জোক' বেরয় ১৯৬৭ সালে।
অভিযোগ, এই বইয়ে তিনি কমিউনিস্ট মতাদর্শ নিয়ে পরিহাস করেছেন। পূর্ব ইউরোপের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে চেকস্লোভাকিয়ার অস্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে তিনি সবসময় সওয়াল করতেন। কিন্তু গোল বাধল, যখন সাবেক চেকস্লোভাকিয়াকে সবক শেখাতে ও সেখানকার বামপন্থী মতাদর্শের সংস্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে রুশ ট্যাক্স ঢুকে পড়ল কুন্দেরার দেশে। তিনি প্রবলভাবে বিরোধিতা করলেন। সহায়তার নামে রুশ আধিপতা- রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রয়োজনীয় নয়, বলতে থাকলেন বারবার।
বিরোধীরা যথেষ্ট শক্তিশালী। কুন্দেরার পেশা ও লেখায় বিম্ন ঘটাতে থাকল। তাঁর চাকরিতে হাত পড়ল বই 'নিষিদ্ধ' হল। সরকারি লাইব্রেরিতে স্থান পেল না। সহজ ও স্বাভাবিকভাবে উপার্জন করে বেঁচে থাকার সব পন্থা যেন কুন্দেরার সামনে থেকে উধাও হয়ে যেতে থাকল। অবশেষে স্ত্রী ও কিছু বই সম্বল করে কুন্দেরা চলে গেলেন ফ্রান্সে, ১৯৭৫ সালে, চিরতরে। এর কয়েক বছর পরে ঘটবে এক মজার কাণ্ড।
দেশ থেকে নির্বাসিত সাহিত্যিকের গল্পে মিলান কুন্দেরর পাশে এসে দাঁড়ান তসলিমা নাসরিন। তিনিও মৌলবাদের শিকার।
১৯৯৫ সালে বেরল কুন্দেরার উপন্যাস 'স্নোনেস'। এটি তাঁর মাতৃভাষা চেকে লেখা নয়, ফরাসিতে লেখা। এরপর থেকে সব বই-ই তিনি লিখবেন ফরাসিতে। মাতৃভাষা থেকে দূরে থাকবেন। প্রশ্ন তুলে দেবেন, একজন একজন নির্বাসিতর কি নির্দিষ্ট মাতৃভাষা হয়। বা, একজন লেখকের স্বাধীনতা কেন মাতৃভাষার উপর নির্ভর করবে। লেখক যদি স্বাধীন হতে চান, তাহলে মাতৃভাষার আশ্রয়ও তাঁকে ছাড়তে হবে। কেননা, তাও তো এক ধরনের নির্ভরতা।
'নির্বাসন' বড় কঠিন শব্দ। না-ফেরার দেশে নিয়ে যাওয়ার মাশুল যেন না। দেশ থেকে নির্বাসিত সাহিত্যিকের গল্পে মিলান কুন্দেরর পাশে এসে দাঁড়ান তসলিমা নাসরিন। তিনিও মৌলবাদের শিকার। দেশ থেকে বিতাড়িত। রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন বিদেশে। কলকাতা থেকেও তাঁকে বছর কুড়ি দূরে থাকতে হয়েছে। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও ভোটের অঙ্কের খেলাকে উপেক্ষা করা যাবে না এর নেপথ্য কারণ রূপে।
২১ জুলাই 'সংবাদ প্রতিদিন' প্রকাশ করেছে তসলিমা নাসরিনের সাক্ষাৎকার। সেখানে লেখিকা বলেছেন- 'নির্বাসন আমাকে লেখক করেনি। নির্বাসনের আগেই আমি লেখক ছিলাম। নির্বাসন আমার লেখায় বিষয়, ভাষা ও দৃষ্টিকে প্রভাবিত করেছে।' আমাদের পরম সৌভাগ্য, 'লেখক' তসলিমা নাসরিনকে বিদেশি ভাষা বেছে নিতে হয়নি লেখার জন্য। তিনি মাতৃভাষায় লিখেছেন। লিখছেন মুক্তবুদ্ধি ও নারীর সার্বিক স্বাধীনতার জনা।
