shono
Advertisement
Mohun Bagan

সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রণঘোষ! ইতিহাসের মোহন সম্পদ

২৯ জুলাই ছিল ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে মোহনবাগানের সেই অসামান্য বিজয়ের ১১৫ বছরের পূর্তি।
Published By: Biswadip DeyPosted: 07:48 PM Jul 30, 2026Updated: 07:50 PM Jul 30, 2026

১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ ঘোষণার পরে ‘বন্দে মাতরম্‌’ গানটি নতুন রূপ পরিগ্রহ করে। সেই সময়পর্বে সমাজের সব স্তরের মানুষ– শিক্ষক, ছাত্র, শিল্পী, ক্রীড়াবিদ– প্রত্যেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনও না কোনওভাবে যোগ দিতে উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। এ পর্যায়ে অন্যতম বড় সাফল্য ১৯১১ সালে মোহনবাগানের আইএফএ শিল্ড জয়। যা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে শৃঙ্গজয়। এ বছর সেই অসামান্য বিজয়ের ১১৫ বছরের পূর্তি। লিখছেন জিষ্ণু বসু।

Advertisement

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম্‌’ গান ১৮৭৫ সালে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত। ১৮৮২ সালে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে এই গানটি যুক্ত করেন তিনি। কিন্তু ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার পরে এই ‘বন্দে মাতরম্‌’ এক নতুন রূপ নিল। ঋষি অরবিন্দ জাতিকে দিলেন ‘বন্দে মাতরম্‌ মন্ত্র’। সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেল ‘বন্দে মাতরম্‌’। হয়ে উঠল দেশের একাত্মতার মন্ত্র, স্বদেশি ভাব প্রকাশ আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রণঘোষ। তাই স্কুলে-কলেজে ছাত্ররা পর্যবেক্ষণের সময় ‘বন্দে মাতরম্‌’ ধ্বনি দিয়ে উঠত, পথের মোড়ে মোড়ে বিলিতি কাপড় পোড়ানোর সময় বলা হত ‘বন্দে মাতরম্‌’, ১৯-২০ বছরের বিপ্লবী ছেলেটি ‘বন্দে মাতরম্‌’ গাইতে গাইতে হাসি মুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরে নিত।

সেই ‘বন্দে মাতরম্‌’ পর্বে সমাজের সব স্তরের মানুষ– শিক্ষক, ছাত্র, শিল্পী, ক্রীড়াবিদ– প্রত্যেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনও না কোনওভাবে যোগ দিতে উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। ১৯০২ সালে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় লিখলেন ‘হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রি’। রসায়ন শাস্ত্রে ভারতের অবদান। এই বইটি যুবক-যুবতী,
ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে উন্মাদনা এনেছিল। আচার্য বললেন, ‘বিজ্ঞান অপেক্ষা করতে পারে কিন্তু স্বরাজ অপেক্ষা করবে না।’

১৯১১ সালের ২৯ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টায় খেলা শুরু হয়েছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট খেলছিল দামি জুতো পরে। ভারতীয় দল মোহনবাগানের সেই ‘অমর’ ১১ জন খেলেছিলেন খালি পায়ে।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞানে ভারতের যে-সাফল্য, তাকে কখনওই ‘ঔপনিবেশিক বিজ্ঞান’ বলা চলে না। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটরমন, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা– প্রত্যেকে আসলে বিজ্ঞানের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছেন। ঠিক তেমনই শিল্পের ক্ষেত্রে ভগিনী নিবেদিতা, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু তৈরি করেছিলেন ‘বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট’, ‘মডার্ন ইন্ডিয়ান আর্টস’-এর ভিত্তিভূমি। এসব প্রতিভাবান বিজ্ঞানী, শিল্পী, সাহিত্যিক নিজ-নিজ ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের পরাজিত করাকে এক অর্থে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান বলে মনে করতেন।

এ পর্যায়ে অন্যতম বড় সাফল্য ১৯১১ সালে মোহনবাগানের আইএফএ শিল্ড জয়। ১৯১১ সালের ২৯ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টায় খেলা শুরু হয়েছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট খেলছিল দামি জুতো পরে। ভারতীয় দল মোহনবাগানের সেই ‘অমর’ ১১ জন খেলেছিলেন খালি পায়ে। প্রথমার্ধে মোহনবাগানের ভুল, হ্যান্ডবল। তার জেরে ফ্রি কিক থেকে জ্যাকসন দিলেন প্রথম গোল। সাহেবরা ১ গোলে এগিয়ে গেল। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই শিবদাস ভাদুড়ী গোল শোধ করে দিলেন। খেলা শেষ হওয়ার একটু আগে সেই শিবদাসেরই বাড়ানো পাস থেকে স্ট্রাইকার অভিলাষ ঘোষ করেন জয়সূচক গোলটি। ‘বঙ্গভঙ্গ’ বিরোধী আন্দোলনে সমগ্র ভারতের মানুষ পথে নেমেছিল। মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, মাদ্রাজ থেকে লাহোর– বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছিল প্রত্যেকে। সেদিন স্বদেশি মোহনবাগান গঠনে দুই বাংলা তো বটেই– সারা ভারতের ছোঁয়া ছিল। পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরের হীরালাল মুখার্জি ছিলেন গোলরক্ষক আর সুধীর চ্যাটার্জি রাইট ব্যাক। ঢাকার রাজেন সেনগুপ্ত আর বরিশালের নীলমাধব ভট্টাচার্য হাফ ব্যাকে। ঢাকার আরও দুই সন্তান জ্যোতিন্দ্রনাথ ওরফে কানু রায়, আর অভিলাষ ঘোষ খেলেছিলেন ফরওয়ার্ড পজিশনে। রাজশাহি জেলার দুই ফরওয়ার্ড শিবদাস আর বিজয়দাস ভাদুড়ী, এর মধ্যে শিবদাস ভাদুড়ী ছিলেন মেরিনার্স সিংহ বাহিনীর অধিনায়ক। রক্ষণভাগে ছিলেন ভুটি সুকুল। সম্ভবত, যুক্তপ্রদেশ মানে এখনকার উত্তরপ্রদেশ থেকে এসেছিলেন তিনি।

১৮৮৯ সালের ১৫ আগস্টের দিনেই উত্তর কলকাতার শোভাবাজারের ফুটিংস ফায়ার ও মোহনবাগান ভিলায় যে-যুবকরা খেলতেন, বসুবাড়িতে তাঁরা একটি সভায় বসলেন। শুরু হল মোহনবাগানের যাত্রা।

এসব দেশপ্রেমিক মানুষের জন্মস্থান, বেড়ে ওঠা ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক আকর বই আছে কি? ‘বন্দে মাতরম্‌’ রচনার সার্ধশতবর্ষে এঁদের নতুন করে আবিষ্কার করা প্রয়োজন। ভারতের নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্র ছিল বাংলা। আর, বাংলার এই নবজাগৃতির কেন্দ্রে ছিল রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাবান্দোলন। স্বামী বিবেকানন্দ শরীরচর্চার কথা বলতেন। বলতেন: সুস্থ মনের জন্য চাই সুস্থ শরীর। বলেছিলেন, ফুটবল খেলতে। স্বামীজির ঘনিষ্ঠ নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী ১৮৮০ সালে শুরু করেছিলেন ‘বয়েজ ক্লাব’।

শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেবের পুত্র রাজা গোপীমোহন দেব। ১ নম্বর ফরিয়াপুকুর স্ট্রিট ঠিকানায় বাগানের ভিতরে সুন্দর শ্বেতপাথরে ভিলা তঁারই তৈরি। তিনি অবশ্য খুব বেশি দিন থাকেননি সেই বাড়িতে। বাড়ির পাশের মাঠে ছেলেরা আনন্দ করে ফুটবল খেলত। মোহনবাবুর বাগান তাই ‘মোহনবাগান’। কালক্রমে এই বাগান বাড়ির মালিক হলেন বড় পাট-ব্যবসায়ী কীর্তিচন্দ্র মিত্র। তিনি সম্পত্তি বাড়িয়ে ১৩ বিঘে জমি-সহ বাগানবাড়িটি পুত্র প্রিয়নাথ মিত্রর জন্য রেখে গেলেন। সেই মহাজাগরণে কলকাতা ক্রীড়া ক্ষেত্রে একের-পর-এক প্রতিষ্ঠান গড়েছে। মহারাজা দুর্গাচরণ লাহার তেলিয়াপাড়ায় মাঠেও তৈরি হল একটি ফুটবল ক্লাব।

দেশপ্রেমিক মানুষের জন্মস্থান, বেড়ে ওঠা ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক আকর বই আছে কি? ‘বন্দে মাতরম্‌’ রচনার সার্ধশতবর্ষে এঁদের নতুন করে আবিষ্কার করা প্রয়োজন। ভারতের নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্র ছিল বাংলা। আর, বাংলার এই নবজাগৃতির কেন্দ্রে ছিল রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাবান্দোলন।

কিন্তু বসু, সেন, আর মিত্র পরিবারের সক্রিয় সহযোগিতায় মোহনবাগানে স্কুল আর কলেজের ছাত্রদের ফুটবল খেলার শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকে উল্লেখযোগ্যভাবে। শেষ পর্যন্ত ১৮৮৯ সালের ১৫ আগস্টের দিনেই উত্তর কলকাতার শোভাবাজারের ফুটিংস ফায়ার ও মোহনবাগান ভিলায় যে-যুবকরা খেলতেন, বসুবাড়িতে তাঁরা একটি সভায় বসলেন। শুরু হল মোহনবাগানের যাত্রা। প্রথম সভাপতি হলেন ভূপেন্দ্রনাথ বসু আর সম্পাদক জ্যোতিন্দ্রনাথ বসু। বিজ্ঞান, শিল্প, দর্শনের মতো ফুটবলেও ঔপনিবেশিক শাসকদের হারিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল ভারত। যার নেতৃত্বে ছিল মোহনবাগান। ২৯ জুলাই ছিল সেই অসামান্য বিজয়ের ১১৫ বছরের পূর্তি।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement