২৬ জুলাই 'সংবাদ প্রতিদিন'-এর সম্পাদকীয়তে আলোচিত হয় হাওড়ার উলুবেড়িয়ার এক যুগলের বিয়েতে পাড়ার কিছু মোড়লের ভয়ংকর আপত্তি এবং নানাবিধ ত্রাসের সঞ্চার-কথা। পুলিশের কাছে কোনওরকম সাহায্য না পেয়ে ওই যুগল কলকাতার হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। সোমবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যর এজলাসে ওই মামলা ওঠে। মামলাকারীদের আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ও সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় জানান, উলুবেড়িয়ার ওই যুগল তাঁদের বিয়ের জন্য 'স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট' অনুসারে নোটিস দেন। সেই নোটিস ফাঁস হয়ে যায়।
এবং এই খবর রটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকার কিছু মোড়ল পাত্রীর বাড়িতে হুমকি দেওয়া
শুরু করে। পাত্রীর বাবাকে বাধ্য করে যুগলের বিরুদ্ধে এফআইআর করতে। এদের আপত্তির প্রধান কারণ, পাত্র ভিন্ন ধর্মের। এবং বিয়ে হলে এই যুগলের প্রাণহানির সম্ভাবনা আছে, এমন ফতোয়াও জারি করেছে এলাকার কিছু মাতব্বর। আজ, বুধবার 'স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট' অনুসারে ওই যুগলের বিবাহবন্ধনে সই করার দিন।
ভিন্ন ধর্মে বিয়ে, তার মধ্যে সাহস, রোম্যান্টিকতা, এবং সমাজ-সংসারের পরিচিত গণ্ডির বাইরে পা ফেলার জোরালো উচ্চারণ আছে।
এ কথা মনে রেখে কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যর এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যের: 'এ-দেশের প্রাপ্তবয়স্ক যুগলের জীবনসঙ্গী বাছার অধিকার আছে'। এই মন্তব্যের পরে বিচারপতি বলেন, যুগলের ধর্ম আলাদা হলেও বাধা দেওয়া যাবে না। বিচারপতি ভট্টাচার্য এই নির্দেশও দেন--- আজ, বুধবার, ওই যুগলের বিয়ের অনুষ্ঠানে উলুবেড়িয়া থানাকে যথাযোগ্য নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করতে হবে। এবং আদালতের এই নির্দেশ পালন নিয়ে উলুবেড়িয়া থানার আইসি-কে ১০ আগস্ট রিপোর্ট দিতে হবে।
প্রশ্ন, ওই যুগলের আগামী জীবনে সংশয় ও ত্রাসের ছায়া কাটল কি? এই মোড়লদের অবাধ প্রতিপত্তি কোনওভাবে কি বিঘ্নিত হল? আমাদের আইনে কি তাদের কোনও শাস্তির ব্যবস্থা নেই? আমাদের সমাজ-সংসার জুড়ে যত দিন থাকবে ধর্মীয় কুসংস্কার এবং ধর্মান্ধ জেহাদের প্রাধান্য, তত দিন আমাদের দেশে বিধর্মে সম্পর্ক ও বিয়ে নানাভাবে আক্রান্ত হবেই। ধর্ম যে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, ভালবাসা, প্রেম ও বিয়েতে কোনও বাধা হয়ে উঠতে পারে না--- যত দিন না আমাদের শিক্ষাদীক্ষা এবং সমাজ সংসারের চেহারা এই উদারতা ও জীবনদর্শনে আমাদের প্রতিষ্ঠিত করছে, তত দিন ভিন্ন ধর্মে বিয়ে আমাদের দেশে মুক্ত পরিসর ও স্বীকৃতি পেতে পারে না। এবং এমন বিয়ের ঈশান কোণে মেঘও কাটবে না।
ভিন্ন ধর্মে বিয়ে, তার মধ্যে সাহস, রোম্যান্টিকতা, এবং সমাজ-সংসারের পরিচিত গণ্ডির বাইরে পা ফেলার জোরালো উচ্চারণ আছে। এবং সেই সঙ্গে আছে কিছু বাস্তব সমস্যাও, যা মনে থাকে না প্রেমের তাড়নায়। বিয়েশাদি কিন্তু শুধু দু'জনের মধ্যে নয়। দু'টি সংসার, সমাজ, রীতিনীতি, শিক্ষাদীক্ষা, সংস্কার, অভ্যাস ও বিশ্বাসের মধ্যেও। কখনও কখনও দুস্তর হয়ে উঠতে পারে এই প্রভেদ। এবং পদে পদে সেই প্রভেদের মাতব্বরি মেনে নেওয়াও কঠিন মনে হতে পারে।
