অসংখ্য লেখায় তসলিমার ‘নারীবিশ্ব’ মহিলাদের দিয়েছে স্বতন্ত্র মানুষের মর্যাদা। তালিবানি ফতোয়া উড়িয়ে, পড়ার বইয়ের মলাটের ভিতর তাঁর বই লুকিয়ে পড়ে কত মেয়ের মনেই না বিপ্লব চারিয়ে গিয়েছে! সে বিপ্লবের স্পর্শেই আলোকিত হয়েছে কত ছেলে! আজ দীর্ঘ দু’-দশক পরে মহানগরী শুনবে তাঁর প্রদীপ্ত কণ্ঠ!
২০০৭ সালের নভেম্বর মাসের সেই ভয়াবহ দিনটায় কতগুলো রাস্তার গুন্ডা নিজেদের বিরাট বড় সন্ত্রাসী ভেবে নিয়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল সারা কলকাতা জুড়ে, আর তৎকালীন সরকার হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছিল তাদের সামনে। সেদিন কলকাতা শহর এবং সংলগ্ন এলাকায় যেসব বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল, তাতে ৪০০ জন নিমন্ত্রিত থাকলে, ৫০ জন গিয়ে উঠতে পেরেছিল কিনা সন্দেহ! ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্কুলবাসগুলি দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিল শহরের রাস্তায়, আর তার ভিতরের ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত বাচ্চারা অসহায়ের মতো কাঁদছিল।
এ সমস্ত কিছুর পরিণাম: তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল, এবং ওই ঘৃণার থেকেও বেশি ঘৃণার্হ তাণ্ডবের অন্যতম পান্ডা ইদ্রিস আলি পৌঁছে গিয়েছিলেন লোকসভায়। তারপর ১১টা বছর অতিক্রান্ত। কিন্তু একটা জায়গায় কোনও পরিবর্তন হয়নি। তা হল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মৌলবাদের প্রতি ২০১১-র আগের এবং পরের সরকারের ‘সফ্ট কর্নার’। প্রেস কর্নার ভাঙা পড়লেও সফ্ট কর্নার যেহেতু জায়গামতোই থেকে যায়, তাই প্রত্যয়ী পুলিশ অফিসার বিনোদ মেহতার নৃশংস খুনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ মন্ত্রী হয়ে কলি ফোটাতে পারেন বাম আমলে। আর, ভারতে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার কাজে ব্যস্ত সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বকলমে খবরের কাগজ চালানোর পাশাপাশি পৌঁছে যেতে পারে রাজ্যসভায়।
এই যদি আবহ হয়, তাহলে তার মধ্যে তসলিমা নাসরিনের ফিরে আসার সম্ভাবনা কোথায়? উলটে তাঁর কাহিনি নিয়ে সিনেমা কিংবা ‘ওটিটি’ সিরিজ হওয়ার কথা হাওয়ায় ভেসে এলেও সেই হাওয়াকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে তৎক্ষণাৎ। তসলিমা নাসরিন– নামটাকেই উখো দিয়ে ঘষে মানুষের স্মৃতি থেকে নির্মূল করে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চলেছে। সেই চেষ্টায় শুধু সরকার নয়, একটা মস্ত ইকোসিস্টেমও সর্বস্ব পণ করেছে।
তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল, এবং ওই ঘৃণার থেকেও বেশি ঘৃণার্হ তাণ্ডবের অন্যতম পান্ডা ইদ্রিস আলি পৌঁছে গিয়েছিলেন লোকসভায়। তারপর ১১টা বছর অতিক্রান্ত। কিন্তু একটা জায়গায় কোনও পরিবর্তন হয়নি। তা হল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মৌলবাদের প্রতি ২০১১-র আগের এবং পরের সরকারের ‘সফ্ট কর্নার’।
সেই ইকোসিস্টেমের মধ্যে প্রামাণ্য মিডিয়া থেকে সামান্য এনজিও– প্রত্যেকের ভূমিকা ছিল। ভূমিকা ছিল সেই সমস্ত বিদেশি রসজারিত দেশীয় তাত্ত্বিকের, যঁাদের নারীমুক্তি বিষয়ক সেমিনারে আর প্রত্যেকের নাম উচ্চারিত হলেও, তসলিমার নাম উচ্চারিত হয়নি কখনও। তারপরও তসলিমাকে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যায়নি। মোহিত রায়, ওসমান মল্লিক, শান্তনু সিংহের চেষ্টায় এবং ’২৬ বিধানসভা ভোটে পালাবদলের পর শপথ নেওয়া নতুন সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এখন যে তসলিমা নাসরিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে নিজের কথা ও কবিতা বলবেন রবীন্দ্র সদনে, তার জন্য সবচেয়ে বড় করতালি তসলিমারই প্রাপ্য। কারণ তিনি সাইক্লোনের মুখেও নুয়ে পড়েননি। বেঁচে ছিলেন, বাঁচানোর চেষ্টায় ছিলেন।
আমরা জানি, রক্তবীজকে ক্রমাগত আঘাত করেও যুদ্ধে জেতা যেত না কিছুতেই; যদি না চণ্ডিকা যখন তাকে ক্ষতবিক্ষত করছেন, তখনই চামুণ্ডা তার রক্তধারা মাটিতে পড়তে না দিয়ে পান করে নিতেন। আর পৈশাচিক শক্তি যখন ধর্ম কিংবা ঐতিহ্যের ঢাল ব্যবহার করে সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন তার বিরুদ্ধে চণ্ডিকা আর চামুণ্ডার সমন্বয়ী শক্তিকে কী নামে ডাকব? ‘তসলিমা নাসরিন’ বলে যদি ডাকি, ভুল হবে কি?
ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে কর্নাটকের শৈব কবি মহাদেবী আক্কা লিখছেন, ‘মানুষ পুরুষ হোক বা নারী, লজ্জা পায় যখন অঙ্গবস্ত্র থাকে না তাদের গায়ে। কিন্তু যখন প্রভুর চোখই হল পৃথিবী, যা সবকিছু দেখতে পায়, তখন কী আমি ঢাকা দেব আর কী লুকব?’ ভাবলে আশ্চর্য লাগে, কীভাবে নগ্নতাকে সেলিব্রেট করছে হাজার বছর আগেকার এক ভারতীয় নারী। তার মানে সেই সময় নারী কবিরাও এমন কবিতা লিখতে পারতেন! কে কেড়ে নিল তাদের সেই অধিকার?
তসলিমাকে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যায়নি। মোহিত রায়, ওসমান মল্লিক, শান্তনু সিংহের চেষ্টায় এবং ’২৬ বিধানসভা ভোটে পালাবদলের পর শপথ নেওয়া নতুন সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এখন যে তসলিমা নাসরিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে নিজের কথা ও কবিতা বলবেন রবীন্দ্র সদনে, তার জন্য সবচেয়ে বড় করতালি তসলিমারই প্রাপ্য।
পূজায় মেয়েদের যে বিপুল যোগদান, ননীর হাঁড়ি নিয়ে গোপবালাদের নাচ, কিংবা শিবের মাথায় জল ঢালতে এসে মেয়েদের পরস্পরকে ভিজিয়ে দেওয়া, উৎসবে আনন্দের ভিয়েন ঘন করত। কিন্তু মধ্যযুগে, মেয়েরা যত অন্তরিন হতে শুরু করল, মেয়েদের বাড়ির ভিতরে আটকে রেখে আকাশ দেখানোর জন্য ‘উঠোন’ জনপ্রিয়তা লাভ করতে আরম্ভ করল, নারীমাতৃক পূজাপদ্ধতি ততই বদলাতে শুরু করল পুরুষতান্ত্রিক আড়ম্বরে।
অথচ প্রাচীন কালের অপালা, লোপামুদ্রা, মৈত্রেয়ী বা গার্গীর কথা প্রত্যেকেই প্রায় জানি। ভাবুন একবার, গার্গীর সেই একের-পর-এক প্রশ্ন, যা তীক্ষ্ণ শরের মতো ধেয়ে আসছিল যাজ্ঞবল্ক্যর দিকে। পণ্ডিতপ্রবরদের লেখায় পাই, উপনিষদে কোথাওই কখনও ‘নারী’ বলে গার্গীকে আলাদা করা হয়নি। কিন্তু তসলিমা যখন তঁার ‘নির্বাচিত কলাম’-এর প্রশ্নগুলি ছুড়ে দিয়েছেন একের-পর-এক, তখন হিংস্র মৌলবাদী শক্তি ক্রমাগত তঁাকে চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছে, চেয়েছে খুন করে ফেলতে। তসলিমার লড়াই তাই, দেখতে গেলে পর, সবার থেকে কঠিন। অন্যরা লড়েছেন একটা তন্ত্র কিংবা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে; তসলিমাকে লড়তে হয়েছে এক বিরাট বিপুল লেভিয়াথানের বিরুদ্ধে।
‘নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য’ থেকে শুরু করে অসংখ্য লেখায় তসলিমা সে-ই ‘নারীবিশ্ব’ গড়ে তুলেছেন যা মেয়েদের কেবল কারও স্ত্রী, বোন বা মেয়ে করেই রাখেই না, স্বতন্ত্র মানুষের মর্যাদা দেয়। মেয়েদের বাড়ির ভিতরে আটকে রেখে আকাশ দেখানোর জন্য ‘উঠোন’-এর উৎপত্তি।
‘মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী হবে?’ প্রশ্ন তুলেছিলেন মল্লিকা সেনগুপ্ত– ‘আপনি বলুন মার্ক্স’ কবিতায়। গার্গীর প্রশ্নের মতোই ক্ষুরধার এই প্রশ্ন কারণ ইতিহাস মূলত আগ্রাসনেরই লেখা হয়ে এসেছে। আর পৃথিবীতে কোথাও, কখনও মেয়েরা দলবদ্ধভাবে শহর ধ্বংস করতে, মহল্লার পর মহল্লায় আগুন দিতে, জাতি-ধর্মের নামে মানুষকে খুন করতে বা লাইব্রেরি পোড়াতে বেরয়নি। তাই ইতিহাস, ‘হিজ স্টোরি’ হয়েই থেকেছে, বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া ‘হার স্টোরি’ হতে পারেনি।
তবে ‘নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য’ থেকে শুরু করে অসংখ্য লেখায় তসলিমা সে-ই ‘নারীবিশ্ব’ গড়ে তুলেছেন যা মেয়েদের কেবল কারও স্ত্রী, বোন বা মেয়ে করেই রাখেই না, স্বতন্ত্র মানুষের মর্যাদা দেয়। মেয়েদের বাড়ির ভিতরে আটকে রেখে আকাশ দেখানোর জন্য ‘উঠোন’-এর উৎপত্তি। তসলিমা সেই উঠোনের ঘেরাটোপ ভেঙে মেয়েদের এনে দঁাড় করিয়েছেন, বাইরের রাস্তায়। তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, দুনিয়া দেখার দূরবিন।
তালিবানি ফতোয়া উড়িয়ে, পড়ার বইয়ের মলাটের ভিতর তসলিমার বই লুকিয়ে পড়ে কত মেয়ের মনে না বিপ্লব চারিয়ে গিয়েছে! আর, সেই বিপ্লবের স্পর্শে আলোকিত হয়েছে কত ছেলে, কে হিসাব রেখেছে তার? হিসাবের আঁক কষে প্রত্যেকে যেখানে চুপ, তসলিমা সেখানে কথা বলেন। বাংলাদেশে, বছরের পর বছর হিন্দু-বৌদ্ধদের উপর যে সীমাহীন নির্যাতন, যে লাগাতার হিংসা-খুন-ধর্ষণের শিকার হিন্দু-বৌদ্ধরা, জাফর ইকবাল কিংবা হুমায়ূন আজাদকে মাথায় রেখেও বলছি, তসলিমার মতো লাগাতার তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে গিয়েছেন কে? তাই তো তসলিমার ‘লজ্জা’ তালিবানি ফ্যাসিস্টদের গলার কঁাটা এখনও। তসলিমাকে জন্মভূমি থেকে তাড়িয়ে, তসলিমাকে কলকাতা থেকে তাড়াতে সফল হওয়ার পরেও তারা ভীত-সন্ত্রস্ত। সন্ত্রস্ত তালিবানি মালিকের পোষা সেই সমস্ত ছদ্ম-লিবারাল টিয়াপাখিও যারা দু’-একবার ‘স্বাগত তসলিমা’ বলার পরেই অ্যাজেন্ডা অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস আর পাড়াতুতো উগ্রতাকে একাসনে বসিয়ে জানতে চাইবে, ‘তসলিমা ওইটে নিয়ে বলেছেন সে তো ঠিকই আছে– কিন্তু এইটে নিয়ে বলেননি কেন?’ তা, তসলিমা কী নিয়ে বলবেন– সেটা তসলিমা নাসরিনকেই ঠিক করতে দিন না!
যারা প্রায় ২০ বছর তসলিমাকে এই পশ্চিমবঙ্গে পা রাখতে দেয়নি, যারা ৩০ বছরেরও আগে তসলিমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল মাতৃভূমি বাংলাদেশ থেকে, এখন তাদের চুপ করে থাকার সময়। আজ তসলিমা বলবেন। আমরা সবাই শুনব।
(মতামত নিজস্ব)
