shono
Advertisement
Odyssey

‘দ্য ওডিসি’র হেলেন চরিত্রে কৃষ্ণাঙ্গী অভিনেত্রী, মহাকাব্যের চরিত্র এভাবে বদলে নেওয়া যায়?

হোমারের কাব্যের সত্যতা অন্য জায়গায়। তিনি এমন কিছু চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন, যারা ইতিহাসের চেয়েও দীর্ঘজীবী। হেলেন তাদেরই একজন।
Published By: Amit Kumar DasPosted: 03:06 PM Jul 31, 2026Updated: 05:25 PM Jul 31, 2026

ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’-তে হেলেনের চরিত্রে দেখা যাচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গী অভিনেত্রী লুপিতা নিয়ং’ও। বিতর্ক দানা বেঁধেছে, গ্রিক মহাকাব্যের চরিত্র কেন গ্রিক চেহারার অনুরূপ হবে না। প্রশ্ন উঠছে, ‘ঐতিহাসিক নির্ভুলতা’ বলতে কী বোঝায়? মহাকাব্যের গল্প বারবার বলা হয় বলেই কি তা বদলে নেওয়া যায়? লিখছেন, অতনু বিশ্বাস

Advertisement


ক্রিস্টোফার নোলানের সর্বার্থে মহাকাব্যিক ছবি ‘দ্য ওডিসি’ মুক্তি পাওয়ার আগেই শুরু হয়েছিল বেশ কিছু যুদ্ধ। যে-যুদ্ধের কথা হোমার লিখেছিলেন তা ছিল ৩ হাজার বছর আগের পটভূমিতে– যা নাকি হয়েছিল এক নারীর জন্য– হেলেন। গ্রিক পুরাণ বলে, তাঁর সৌন্দর্যের কারণে এজিয়ান সাগর পেরিয়ে ট্রয় অভিমুখে যাত্রা করেছিল এক হাজার জাহাজ। ইতিহাসবিদরা এখনও অবশ্য তর্ক করেন, সত্যিই ট্রয়ের যুদ্ধ হয়েছিল কি না। তবে একটি সত্য নিয়ে বিতর্ক নেই– খুব কম চরিত্রই হেলেনের মতো এত দীর্ঘকাল ধরে আচ্ছন্ন করে রেখেছে মানুষের কল্পনাকে।

তিন সহস্রাব্দ পরে যুদ্ধক্ষেত্র বদলেছে। ঢাল-তলোয়ারের বদলে এখন ঝনঝনিয়ে বাজে এক্স, ইউটিউব, ফেসবুক, পডকাস্ট। আছে সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার, আর অগণিত অনলাইন বিতর্ক, লেখালখি। কোমর বেঁধে আলোচনার যুদ্ধে নেমেছেন চলচ্চিত্রকার, ইতিহাসবিদ, গবেষক, রাজনীতিক, অভিনেতা, এবং অবশ্যই সাধারণ দর্শক। এবং, কী আশ্চর্য, এই নতুন যুদ্ধের কেন্দ্রেও সেই নারী– হেলেন।

‘মেমেন্টো’, ‘দ্য ডার্ক নাইট’, ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘ডানকার্ক’, ‘ওপেনহাইমার’– প্রতিটি ছবিতেই নোলান নতুন চোখে দেখেছেন পরিচিত গল্পকে। তাই হোমারের মহাকাব্যকে কীভাবে পর্দায় ব্যাখ্যা করবেন, তা নিয়ে আগ্রহ ছিল বিস্তর। একটি মস্ত আলোচনা শুরু হল, যখন জানা গেল, হেলেনের চরিত্রে অভিনয় করবেন কেনিয়ায় জন্মানো অস্কারজয়ী কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী লুপিতা নিয়ং’ও। যেন দু’-ভাগ হয়ে গেল সমাজ এবং মিডিয়া।

ব্রুকের যুক্তি , মহাভারত কেবল ভারতের মহাকাব্য নয়, মানব সভ্যতার মহাকাব্য। তাই পৃথিবীর যে কোনও শিল্পী এই কাহিনি বলতে পারেন। অনেকেই অভিনন্দন জানায় এই ভাবনাকে। আপত্তিও তোলে অনেকে। তাদের প্রশ্ন ছিল– বিশ্বজনীন হওয়া আর শিকড়হীন হওয়া কি একই কথা?

প্রশ্ন ও প্রতিপ্রশ্ন
অনেকের কাছে প্রশ্নটি অত্যন্ত সহজ– ‘দ্য ওডিসি’ তো গ্রিক মহাকাব্য, তাহলে এর গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলি কেন গ্রিক চেহারা-অনুরূপ হবে না? অতীতে এলিজাবেথ টেলর, আইরিন পাপাস, ডায়ান ক্রুগার, রোসানা পোদেস্তা এবং নির্বাক চলচ্চিত্রের তারকা মারিয়া কর্ডা-র মতো অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন হেলেনের চরিত্রে। ওদিকে, যারা নোলানের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে, তাদের বক্তব্যও জোরালো। পৌরাণিক কাহিনিগুলি বা ক্লাসিকগুলি টিকে থাকে কারণ সেগুলি বারবার বলা হয়– অনেক ক্ষেত্রেই নতুন করে, খানিক নতুন রঙে রাঙিয়ে। শেক্সপিয়রের নাটক যদি নতুনভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে আধুনিক পোশাক-পরিচ্ছদ সহযোগে ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে, বর্তমান সময়ের আবহে মঞ্চস্থ হতে পারে ‘কিং লিয়ার’-এর মতো নাটক, তবে হোমারকে কেন চাপা পড়ে থাকতে হবে কালের গর্ভে? প্রতিটি যুগই তার নিজস্ব কল্পনার আলোকে নতুন রূপ দেয় হোমার, শেক্সপিয়র কিংবা মহাভারতকে। তাহলে, চরিত্র নির্বাচনের বিষয়টি কেন আটকে থাকবে প্রাচীন কোনও এক ছাঁচে? মোটকথা, একদলের মত– একজন অভিনেতার যোগ্যতার সঙ্গে তাঁর গায়ের রঙের কী সম্পর্ক? অন্য দলের বক্তব্য– আপত্তিটা কোনও অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে নয়। লুপিতা অসাধারণ অভিনেত্রী। কিন্তু একটি সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত সাংস্কৃতিক প্রতীককে নবরূপে নির্মাণ করার সীমারেখা কোথায়?

স্মৃতি ও বিস্মৃতি
প্রশ্নটি সরল হলেও তার ভিত কিন্তু সুগভীর। হেলেন তো কেবল একটি চরিত্র নন– তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক প্রগাঢ় অংশ। গ্রিক শিশুদের কাছে হোমারের ‘ইলিয়াড’ আর ‘ওডিসি’ অনেকটা আমাদের কাছে রামায়ণ-মহাভারতের মতো। এই ধরনের কাহিনির চরিত্রদের নিয়ে আমরা তৈরি করি একপ্রকার মানসিক প্রতিকৃতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিল্প, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, অপেরা, সাহিত্য এবং সিনেমা সেই প্রতিকৃতিকেই দেয় দৃঢ় অবয়ব। তাই অনেকেরই প্রশ্ন, একটি চরিত্রকে নতুনভাবে কল্পনা করার স্বাধীনতা কি সীমাহীন? না কি এমন চরিত্রের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতেই হবে ইতিহাস, ভূগোল এবং সংস্কৃতির স্মৃতিকে?

পাল্টা যুক্তিও জোরালো। হেলেন তো পুরাণের চরিত্র। আর, ওই যে, পুরাণের আশ্চর্য বৈশিষ্ট্যই হল, প্রতিটি যুগ তাকে নিজের মতো নির্মাণ করে নতুন রূপে। আবার মধ্যযুগের হোমার আর আধুনিক যুগের হোমার তো এক নন। গ্রিকদের হেলেন আর হলিউডের হেলেনও তো কখনও এক ছিলেন না। তাহলে এখন যদি আর একটি নতুন রূপ তৈরি হয়, তাহলে আপত্তি কীসের?

কিন্তু বৃহত্তর প্রশ্নটা বোধকরি স্মৃতি নিয়ে। অতীতের স্মৃতিকে কত দূর পর্যন্ত বদলাতে পারেন একজন শিল্পী? কোনও মহাকাব্য কি তার সৃষ্টিভূমিরই সম্পত্তি, না কি এক সময় তা হয়ে যায় বিশ্বজনীন– সমগ্র মানবজাতির সম্পত্তি? এর কোনও সহজ উত্তর অবশ্যই নেই। আর তাই হেলেনের গায়ের রং নিয়ে বিতর্ক সিনেমার সীমানা ছাড়িয়ে দ্রুত চলে যায় দর্শন, ইতিহাস এবং সংস্কৃতির আলোচনায়। হেলেনের কিংবা নিয়ঙ্গ’ও-র গাত্রবর্ণের বিষয়টা হয়ে যায় তুচ্ছ।

অতীতের স্মৃতিকে কত দূর পর্যন্ত বদলাতে পারেন একজন শিল্পী? কোনও মহাকাব্য কি তার সৃষ্টিভূমিরই সম্পত্তি, না কি এক সময় তা হয়ে যায় বিশ্বজনীন– সমগ্র মানবজাতির সম্পত্তি? এর কোনও সহজ উত্তর অবশ্যই নেই।

মৎস্যকন্যার গল্প
এ বিতর্ক অবশ্য এই প্রথম নয়। বরং এ এক দীর্ঘ গল্পের নতুন অধ্যায়। কয়েক বছর আগে প্রায় একই প্রশ্ন উঠেছিল আর-একজন তরুণীকে নিয়ে। সে ছিল সমুদ্রের রাজকন্যা– এক অসম্ভব জনপ্রিয় রূপকথার নায়িকা। তাঁর নাম ‘এরিয়েল’। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ডিজনি যখন ‘দ্য লিট্‌ল মারমেড’ ছবির প্রথম টিজার প্রকাশ করল– তখন তার গান, দৃশ্য বা প্রযুক্তিকে ছাপিয়ে সমস্ত আলো এসে পড়ল একটি মুখের উপর। এরিয়েলের ভূমিকায় অভিনয় করছেন কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী হ্যালে বেইলি। পৃথিবী যেন দু’-ভাগ হয়ে গেল। একদল লিখল– এটি তাদের শৈশবের এরিয়েল নয়। অন্য দল বলল– রূপকথার চরিত্রর কি কোনও নির্দিষ্ট গায়ের রং হয়? ওদিকে, একটির পর একটি ভিডিওতে দেখা গেল, কৃষ্ণাঙ্গ শিশুরা বিস্ময়ে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে বলছে, এই এরিয়েল তাদের মতো দেখতে! ছবিটির সমর্থনে যারা ছিল, তাদের কাছে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় যুক্তি। এত দিন রূপকথার রাজকন্যারা যেন প্রতিনিধি ছিল না পৃথিবীর সব শিশুর। এবার অন্তত কিছু শিশু প্রথমবারের মতো নিজেকে দেখতে পাচ্ছে সেই জায়গায়।

আর, বিরোধীদের বক্তব্য ছিল, প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু সেজন্য কি অতি-পরিচিত পুরনো চরিত্রকেই বদলাতে হবে? বৈচিত্র আনার সবচেয়ে সৃজনশীল পথ কি নতুন গল্প সৃষ্টি নয়? এই প্রশ্নের সর্বসম্মত উত্তর অবশ্যই নেই। এবং বিতর্কটি কেবল একটি চরিত্রকে নিয়েও নয়। মোটকথা, পৃথিবী নতুন করে ভাবতে থাকল, প্রতিনিধিত্ব বলতে ঠিক কী বোঝায়?

এরিয়েলের অধ্যায়ের পরে বিতর্ক থামেনি। ২০২৩ সালে ডিজনির ‘পিটার প্যান অ্যান্ড ওয়েন্ডি’-তে টিঙ্কার বেলের চরিত্রে নেওয়া হল কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী ইয়ারা শাহিদিকে। আবার বিতর্ক। তারপর ২০২৫ সালে এল ‘স্নো হোয়াইট’। সেখানে কলম্বিয়ান এবং পোলিশ বংশোদ্ভূত অভিনেত্রী রেশেল জেগলার-কে দেওয়া হল ‘স্নো হোয়াইট’-এর ভূমিকা। এবার অবশ্য বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু শুধুমাত্র কাস্টিংই নয়, সাত বামনের পুনর্নির্মাণও।

অনৈতিহাসিক
এদিকে, ২০২০ থেকে হয়ে চলা নেটফ্লিক্সের ‘ব্রিজেটন’ যেন নিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ। সেখানে আঠারো শতকের ইংল্যান্ডকে কল্পনা করা হল এমন এক সমাজ হিসাবে, যেখানে রাজ পরিবার থেকে অভিজাত সমাজ– সর্বত্রই স্বাভাবিক বর্ণের বৈচিত্র। ইতিহাসের সঙ্গে তার মিল নেই– কিন্তু সিরিজটি কখনও দাবিও করেনি যে, সেটি-ই ইতিহাস। আর বোধ করি সে কারণেই তাকে অন্য চোখে দেখল দর্শকও।
প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল ২০১৫-র ব্রডওয়ের বিখ্যাত মিউজিকাল ‘হ্যামিলটন’-এ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের ভূমিকায় সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো ও এশীয় অভিনেতাগণ। প্রথমে অনেকেই অবাক হয়। পরে বোঝা গেল, এটিই নাটকের শিল্পভাষা। সেখানে অভিনেতাদের পরিচয়, অতীতকে বদলাতে নয়, বর্তমান আমেরিকাকে বোঝাতে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের ভূমিকায় সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো ও এশীয় অভিনেতাগণ। প্রথমে অনেকেই অবাক হয়। পরে বোঝা গেল, এটিই নাটকের শিল্পভাষা।

এ দু’টি উদাহরণ বোঝায় যে, সব ধরনের রেস-সোয়‌্যাপিং এক নয়। কখনও নির্মাতা ইতিহাসকে ‘পুনর্নির্মাণ’ করতে চান। কখনও তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বিকল্প’ এক জগৎ নির্মাণ করেন। আবার কখনও তিনি নতুন রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পড়তে চান একটি ক্লাসিককে। দর্শকের প্রতিক্রিয়াও বদলায় সে-অনুযায়ী। আর এ কারণেই নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ নিয়ে বিতর্ক আরও জটিল।

কারণ, নোলান এমন একজন পরিচালক, যাঁর নির্মাণে জড়িয়ে থাকে গবেষণার নিখুঁত প্রলেপ। ‘ডানকার্ক’-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ‘ওপেনহাইমার’-এ পারমাণবিক বোমার ইতিহাস– সব ক্ষেত্রেই তিনি প্রশংসিত হয়েছেন তথ্যের সূক্ষ্মতার জন্য। কিন্তু হোমারের নির্মাণ করা জগৎ কি আদৌ ‘ঐতিহাসিক’? সেখানে দেবতারা কথা বলেন মানুষের সঙ্গে। এথেনা মানুষের সামনে আসেন রূপ বদলে। সমুদ্রদেব পোসাইডন ঝড় তুলে দেন। যুদ্ধ হয় সাইক্লোপস নামে একচোখো দৈত্যের সঙ্গে। মানুষকে পশুতে পরিণত করেন জাদুকরী সির্সে। তাহলে ‘ঐতিহাসিক নির্ভুলতা’ বলতে সত্যিই কী বোঝাচ্ছি আমরা? বাস্তব না কি বহু শতাব্দী ধরে শিল্প, ভাস্কর্য, চিত্রকলা আর সিনেমা মিলিয়ে যে মানসিক ছবিটি গড়ে উঠেছে আমাদের মধ্যে তাকে?

হোয়াইটওয়াশিং
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমরা বুঝতে পারি, বর্তমান বিতর্কের শিকড় আরও গভীরে। এক-দুই দশক আগেও হলিউডের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, হলিউড পৃথিবীর গল্প বলত, কিন্তু পৃথিবীর মানুষদের দেখাত না। আফ্রিকার গল্পে আফ্রিকান থাকত না, এশিয়ার গল্পে এশীয় ছিল না, মিশরের ইতিহাসে ছিল না মিশরীয়– পৃথিবীর প্রায় সব গল্পই শেষ পর্যন্ত বলা হত ইউরোপীয় বা আমেরিকান মুখের মাধ্যমে। এই প্রবণতারই নাম– হোয়াইটওয়াশিং। যেমন, ১৯৬১ সালের জনপ্রিয় ছবি ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিজ’-এ জাপানি প্রতিবেশী মিস্টার ইউনিওশির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মার্কিন অভিনেতা মিকি রুনি। চোখের আকৃতি বদলানোর মেক-আপ, কৃত্রিম দাঁত, অতিরঞ্জিত উচ্চারণ– এসবকে নিছক কৌতুক হিসাবে দেখেছিলেন অনেকে। হালে বদলেছে দর্শকের সংবেদনশীলতা। একই প্রশ্ন উঠেছিল ২০১৭-র ‘ঘোস্ট ইন দ্য শেল’ ছবিতে জাপানি চরিত্রে স্কারলেট জোহানসনকে নিয়ে। আবার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ২০১৬-র ‘গডস্‌ অফ ইজিপ্ট’ কিংবা ২০১৪-র ‘এক্সোডাস: গড্‌স অ্যান্ড কিংস’-এ প্রাচীন মিশরের ইতিহাস প্রায় সম্পূর্ণভাবে ইউরোপীয় অভিনেতাদের মুখে তুলে ধরার সিদ্ধান্তও। এই সমালোচকদের মূল বক্তব্য ছিল– যদি একটি সংস্কৃতির গল্প বারবার অন্য সংস্কৃতির মানুষদের দিয়ে বলা হয়, তবে সেই সংস্কৃতির মানুষদের জন্য সুযোগ কোথায়? প্রতিনিধিত্ব তো শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্লোগান নয়– এটি শিল্পের ন্যায্যতারও প্রশ্ন। ধীরে ধীরে হলিউড শুরু করল সেই সমালোচনা শুনতে। বোঝা গেল– পৃথিবী বদলেছে, দর্শকও বদলেছে। তবে কেবল ‘বাজার’-এর কারণে নয়, বৈচিত্রকে গুরুত্ব দিতে হবে নৈতিক কারণেও। হালের রেস-সোয়‌্যাপিংয়ের বিতর্ককে এই দীর্ঘ ইতিহাসের বাইরে রেখে বোঝাই যাবে না। অনেকের মতে, তাই এ আসলে পেন্ডুলামের মতো। বহুদিন একদিকে ঝুঁকে থাকার পরে হলিউড হঠাৎ যেন দুলে উঠেছে অন্যদিকে। ফলে কোথাও ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টাও জন্ম দিচ্ছে বিতর্কের।

মহাভারত কথা
তবে এ প্রশ্ন তো শুধু হলিউডের নয়। অনেক আগে, অন্য এক মঞ্চে, অন্য এক মহাকাব্যকে ঘিরেও উঠেছিল প্রায় একই বিতর্ক। ১৯৮৫ সাল। প্যারিসে মঞ্চস্থ হচ্ছে ‘মহাভারত’। ডাকসাইটে নাট্য পরিচালক পিটার ব্রুকের এই কিংবদন্তি প্রযোজনায় দর্শকদের অভিজ্ঞতা ছিল বিস্ময়ের। দেখা গেল– অভিনেতারা এসেছেন পৃথিবীর নানা অংশ থেকে: আফ্রিকা, ইউরোপ, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা।

ব্রুকের যুক্তি ছিল– মহাভারত কেবল ভারতের মহাকাব্য নয়, মানব সভ্যতার মহাকাব্য। তাই পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের শিল্পী এই কাহিনি বলতেই পারেন। অনেকেই অভিনন্দন জানিয়েছিল এই ভাবনাকে। আবার আপত্তিও তুলেছিল অনেকে। তাদের প্রশ্ন ছিল– বিশ্বজনীন হওয়া আর শিকড়হীন হওয়া কি একই কথা? মহাভারত নিশ্চয়ই বিশ্বের সম্পদ। কিন্তু তার জন্ম তো একটি নির্দিষ্ট সভ্যতার পরিমণ্ডলে। তার ভাষা, তার দর্শন, তার পুরাণ, তার লোকবিশ্বাস, তার সামাজিক অভিজ্ঞতা– সবই ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। সেই শিকড়কে প্রায় অদৃশ্য করে দিলে, মহাকাব্যের আত্মাটিও কি বদলে যায় না? হালে নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের মধ্যে পিটার ব্রুকের মহাভারত ঘিরে সেই পুরনো বিতর্কের প্রতিধ্বনি স্পষ্ট। মহাকাব্য কি কেবল শিল্পীর সৃষ্টিভূমির সম্পত্তি? না কি এক সময় তা হয়ে যায় পৃথিবীর? হলেও, কোথায় তার লক্ষ্মণরেখা?

ওথেলোর বিবর্তন
একটি নাটকের কথা ধরা যাক এ প্রসঙ্গে। শেক্সপিয়রের ‘ওথেলো’। দীর্ঘ দিন ধরে ইউরোপ ও আমেরিকার মঞ্চে ওথেলোর ভূমিকায় অভিনয় করতেন শ্বেতাঙ্গ অভিনেতারা। মুখে কালো রং মেখে। এখন আমরা যাকে বলি ‘ব্ল্যাকফেস’। চলচ্চিত্রে কিংবা টিভিতে লরেন্স অলিভিয়ার এবং অ্যান্থনি হপকিন্‌সের মতো শ্বেতাঙ্গ অভিনেতারা কৃষ্ণাঙ্গ সেজে অভিনয় করেছেন ওথেলোর চরিত্রে। তারপর সময়ের সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতারা শুরু করলেন ওথেলোর চরিত্রে অভিনয় করতে। সংলাপ বদলায়নি, কাহিনি বদলায়নি– কিন্তু দর্শকের অভিজ্ঞতা গেল বদলে। অভিনেতার পরিচয় নতুন মাত্রা দিল চরিত্রটির আবেগকে। অর্থাৎ ‘কাস্টিং’ কখনও শুধু মুখ বদলায় না। তা বদলে দেয় গল্পের অর্থও।

এ প্রসঙ্গেই ইউভাল নোয়া হারারি-র ‘সেপিয়েন্স: আ গ্রাফিক হিস্ট্রি’-র (২০২০) ‘দ্য পিলার্স অফ সিভিলাইজেশন’ নামক দ্বিতীয় পর্বের একটি চিত্র আমাদের ভাবায়। ছবিটিতে ওথেলো শ্বেতাঙ্গ, আর ডেসডিমোনা কৃষ্ণাঙ্গ। চমকে উঠতেই হয়। তাহলে কোনও চরিত্রকে আমরা যেভাবে কল্পনা করি, সেটি কি সত্যিই স্বাভাবিক? না কি তা ইতিহাস, শিক্ষা, শিল্প ও সমাজের তৈরি একটি মানসিক অভ্যাস মাত্র?

পুনর্কথন না পুনর্নির্মাণ?
এ কারণেই হয়তো হেলেনকে নিয়ে বিতর্ক পৌঁছে যায় এত গভীরে। প্রশ্নটি আর সিনেমার থাকে না। তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, পরিচয় এবং সভ্যতার প্রশ্ন। এটি হয়ে পড়ে আমাদের সময়ে কীভাবে পড়া হবে কোনও ক্লাসিক, সেই বিতর্ক। উল্লেখ্য, এই বিতর্কে প্রায় প্রত্যেক পক্ষই ব্যবহার করছে ‘ঐতিহ্য’ এবং ‘শিল্পের স্বাধীনতা’– এই দু’টি শব্দ বা শব্দবন্ধ। শুধু তাদের অর্থ বদলে বদলে যায়। ক্রিস্টোফার নোলানের কাস্টিংয়ের সমর্থনকারীদের মতে, প্রতিটি যুগ তাকে নিজের মতো করে পড়তে পারলেই তা হয়ে ওঠে সত্যিকারের ক্লাসিক সাহিত্য। হোমারের ‘ওডিসি’ কেবল প্রাচীন গ্রিসেই আটকে থাকলে এখন হয়ে উঠত না পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অনুবাদ, পুনর্কথন, অপেরা, নাটক, উপন্যাস, চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে তাকে নতুন করে ব্যাখ্যা করেছে প্রতিটি যুগ। নোলান সেই দীর্ঘ ধারারই একজন উত্তরসূরি।

অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য– ‘পুনর্কথন’ ও ‘পুনর্নির্মাণ’ এক জিনিস নয়। একটি কাহিনিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু সেই কাহিনির সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া কি উচিত? ইলন মাস্ক প্রবল সমালোচনা করলেন এই কাস্টিংয়ের। বললেন, হোমারের কালজয়ী ক্লাসিককে সমকালীন পরিচয়-রাজনীতির পরীক্ষাগারে পরিণত করা উচিত নয়। ‘দ্য ওডিসি’-র কাস্টিংকে তিনি অভিহিত করলেন, ‘হোমারের প্রতি অপমান’ বলে। জবাবে লুপিটা নিয়ঙ্গ’ও বললেন, ‘আমাদের কুশীলবরা প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্বের’। দুনিয়া জুড়ে প্রধান সংবাদপত্রগুলির আলোচনা মোটের উপর ছিল অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও সতর্ক। ব্রিটেনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ লিখল, এই বিতর্ককে শুধু একটি কাস্টিংয়ের প্রশ্ন হিসাবে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন এক সময়ের প্রতিফলন, যখন পশ্চিমি সমাজ নিজেদের অতীত, উপনিবেশবাদ, প্রতিনিধিত্ব এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র– সবকিছু নিয়েই ভাবছে নতুন করে। হেলেনকে ঘিরে বিতর্কও সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সংঘাতের অংশ।

ফরাসি দৈনিক ‘লে মন্ডে’ বিষয়টিকে দেখল অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে। লিখল, গ্রিকদের অস্বস্তিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ইলিয়াড আর ‘ওডিসি’ শুধু সাহিত্য নয়– এগুলি গ্রিসের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অন্যতম ভিত্তি। সেই স্মৃতির প্রতি সংবেদনশীল হওয়াও শিল্পীর দায়িত্ব। আর ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইম্‌স’ আনল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কয়েক বছর আগে হলিউডে ‘রেস-সোয়‌্যাপিং’ নিয়ে আলোচনার সময় তারা প্রশ্ন তুলেছিল– যদি কোনও পরিচালক বারাক ওবামার চরিত্রে একজন শ্বেতাঙ্গ অভিনেতাকে নেন, আমরা কি সেটিকে গ্রহণ করব ‘শিল্পের স্বাধীনতা’ বলে? এর উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে হেলেনের ক্ষেত্রে যুক্তিটা কেন ও কোথায় আলাদা?

পাল্টা যুক্তি অবশ্যই রয়েছে। ওবামা একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু হেলেন তো ইতিহাস, পুরাণ এবং কল্পনার মাঝখানে দঁাড়িয়ে থাকা এক চরিত্র। তাই দু’জনকে একই মানদণ্ডে বিচার করা কতটা যুক্তিসংগত, সেই প্রশ্নও থেকেই যায়। বিতর্ক তাই চলতেই থাকে– এখানে বোধহয় কোনও সহজ উত্তর নেই।

এই প্রসঙ্গে আবার মনে পড়ে হারারির বইয়ের সেই ছবিটির কথা। শ্বেতাঙ্গ ওথেলো, কৃষ্ণাঙ্গ ডেসডিমোনা। সে-যুগে সত্যিই এমন হলে ‘ওথেলো’ নাটকটাই লেখা হত কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন বটে। হারারির বইতে ছবিটি প্রথম দেখলে ধাক্কা লাগে বইকি। তারপর ধীরে ধীরে বোঝা যায়, ছবিটি শেক্সপিয়রকে বদলাতে আসেনি। বরং আমাদের অভ্যাসকে প্রশ্ন করতে এসেছে। আমরা কোনও চরিত্রকে যে-রূপে কল্পনা করি, সেটি কি প্রকৃত সত্য? না কি সেটিও ইতিহাসের তৈরি একটি মানসিক ছবি? ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ নিয়েও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো একদিন একই প্রশ্ন করবে। এখন যে বিতর্ক চলছে, তাও হয়তো একদিন হয়ে যাবে ইতিহাসের অংশ।

ট্রয়ের যুদ্ধের সত্যতা নিয়ে এখনও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। কিন্তু হোমারের কাব্যের সত্যতা অন্য জায়গায়। তিনি এমন কিছু চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন, যারা ইতিহাসের চেয়েও দীর্ঘজীবী। হেলেন তাদেরই একজন। ৩ হাজার বছর ধরে তিনি কবিদের অনুপ্রাণিত করেছেন, চিত্রশিল্পীদের ক্যানভাসে উঠে এসেছেন, ভাস্কর্যের পাথরে প্রাণ পেয়েছেন, নাট্যমঞ্চে জীবন্ত হয়েছেন, সিনেমার পর্দায় ফিরে এসেছেন। এখনও তিনি মানুষের মতামতকে বিভক্ত করেন। এখনও তিনি প্রশ্ন তোলেন। এখনও তিনি আমাদের বাধ্য করেন ভাবতে– একটি মহাকাব্যের মালিক কে? একটি দেশ? একটি সমাজ? একটি সভ্যতা? না কি সমগ্র মানবজাতি?

এর উত্তর সম্ভবত ‘অথবা’-র মধ্যে নয়। হোমার যেমন গ্রিসের, তেমনই পৃথিবীরও। মহাভারত যেমন ভারতের, তেমনই বিশ্বেরও। শেক্সপিয়র যেমন ইংল্যান্ডের, তেমনই প্রতিটি ভাষারও। ক্লাসিকের প্রকৃত শক্তি এখানেই। তারা নিজেদের সৃষ্টিভূমি ভুলে যায় না, আবার সীমানার মধ্যেও বন্দি থাকে না। অভিযাত্রীর মতো তারা ভ্রমণ করে। তারা ভাষা বদলায়, মাধ্যম বদলায়, মুখও বদলায়। কিন্তু এই নতুন যাত্রাপথে তারা বারবার আমাদের আবার ফিরিয়ে দেয় একটি পুরনো প্রশ্ন– আমরা কি অতীতকে নতুন করে পড়ছি, না কি নতুনের নামে অতীতকেই বদলে দিচ্ছি? হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ কেবল আর-একটি চলচ্চিত্র হয়ে থাকবে, নাকি এই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিতর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে পরিগণিত হবে।

গ্রিক পুরাণে ট্রয়ের যুদ্ধ শেষ হয়েছে বহু আগের প্রেক্ষিতে। কিন্তু হেলেনকে নিয়ে যুদ্ধ চলছে এখনও। এবং সম্ভবত ক্লাসিক যত দিন বেঁচে থাকবে, এই যুদ্ধও শেষ হবে না। হেলেন থেকে এরিয়েল, কিংবা পিটার ব্রুকের ‘মহাভারত’ থেকে শেক্সপিয়রের ‘ওথেলো’– সবক্ষেত্রেই প্রশ্নগুলি আশ্চর্যজনকভাবে একইরকম। শিল্পকলা মানেই কেবল নান্দনিকতা নয়– এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, আত্মপরিচয়, নিজস্ব সত্তার বোধ এবং কোনও সমাজ নিজের সম্পর্কে যেসব কাহিনি তুলে ধরতে চায়, সেগুলি। কালজয়ী কাহিনিগুলি টিকে থাকে, কারণ সেগুলি নতুন নতুন ব্যাখ্যার সুযোগ করে দেয়। অথচ একই সঙ্গে তারা বহন করে সেই সংস্কৃতির স্মৃতি, যা তাদের জন্ম দিয়েছিল। এক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ হয়তো কোনও একটি সত্যকে বেছে নেওয়া নয়, বরং দু’টি ভিন্ন সত্যের মধ্যের ভঙ্গুর কথোপকথনকে জিইয়ে রাখা– তাকে সঞ্জীবিত করা। সেটা কীভাবে সম্ভব, সভ্যতাও তা শেখে ক্রমশ। শেখে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement