'আইএসআই' সংক্রান্ত বিল পাস হলে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ-সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানটি তার বর্তমান স্বকীয়তা এবং স্বাতন্ত্র্য হারাবে বলে আশঙ্কা।
ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট' তথা 'আইএসআই' সংক্রান্ত বিল নিয়ে কিছু দিন ধরেই দেশজুড়ে বিতর্ক চলছে। খসড়া বিলের পর এবার চূড়ান্ত বিলটি অনুমোদনের জন্য সরকার সংসদে নিয়ে আসতে চাইছে। 'আইএসআই' প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে রাজ্যবাসীর বিশেষ আবেগ জড়িয়ে। বিশিষ্ট পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ১৯৩১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে আইএসআই প্রতিষ্ঠা করেন। পরে বরানগরে বিটি রোডের উপর যার বিশাল ক্যাম্পাস গড়ে ওঠে। অধ্যাপক মহলানবিশ দেশের উন্নয়ন ও দারিদ্র্যমোচনের জন্য পরিসংখ্যান এবং তথ্য বিশ্লেষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। সেই লক্ষ্যে 'আইএসআই' তৈরিতে উদ্যোগী হন, যে-প্রতিষ্ঠানের কাজ হবে পরিসংখ্যানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চর্চা করা ও দেশে পরিসংখ্যানবিদ তৈরি করা। যদিও 'আইএসআই'-তে গোড়া থেকেই পরিসংখ্যান ছাড়াও সমাজ ও ভৌতবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় গবেষণা করা হয়। সে-সময় একটি 'সমিতি' হিসাবে 'আইএসআই' নথিবদ্ধ হয়। প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক, কর্মী ও সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় 'আইএসআই'-এর পরিচালন সমিতি। প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে কোনও ধরনের ব্যবসা অধ্যাপক মহলানবিশের দূরতম লক্ষ্যেও ছিল না। তাঁর নেতৃত্বেই 'ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে' শুরু হয়। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার মতো কাজ দেশের দারিদ্র্য দূর করা ও উন্নয়নের পরিকল্পনা রচনার ক্ষেত্রে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা সকলেই বোঝে। দেশে 'আইএসআই'-এর মতো প্রতিষ্ঠান না থাকলে এই কাজ করা স্বাধীন দেশের পক্ষে দুরূহ হয়ে উঠত। শ্রীমহলানবিশ দেশের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা রচনায় যুক্ত ছিলেন। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা 'মহলানবিশ মডেল' হিসাবেই সুখ্যাত। এটি তৈরির কাজে 'আইএসআই'-এর গবেষকদের অবদান অনস্বীকার্য।
১৯৫৯ সালে কেন্দ্র 'আইএসআই'কে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে মর্যাদা দিয়ে আইন তৈরি করে। সেই আইনেও 'আইএসআই-এর 'সোসাইটি' চরিত্রটিকে রক্ষা করা হয়। কিন্তু বর্তমান যে-বিলটি কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে সেখানে 'আইএসআই'-কে একটি 'কর্পোরেট' সংস্থা হিসাবে গড়ে তোলার কথা বলা রয়েছে। যে পদ্ধতিতে দেশের আইআইটি ও আইআইএমের মতো সংস্থা পরিচালিত হয়, ঠিক সেই কায়দাতেই 'আইএসআই' চালানোর কথা বলা হচ্ছে। বিলটি আইনে পরিণত হলে 'আইএসআই'-এর বর্তমান পরিচালন কাঠামোটি থাকবে না। বরানগরের ক্যাম্পাসের মর্যাদাও চলে যাবে।
কলকাতার বাইরে দেশের অন্যান্য কয়েকটি শহরে 'আইএসআই'-এর শাখা থাকলেও এখনও 'আইএসআই' বলতে লোকে বরানগরের ঐতিহ্যসম্পন্ন ক্যাম্পাসটিকেই বোঝে। নতুন আইন হলে দেশের অন্যান্য শহরের 'আইএসআই' শাখাগুলিও সমমর্যাদার হয়ে যাবে। নিজেদের মতো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে এগতে পারবে। সরকারকে রেভিনিউ এনে দেওয়ার লক্ষ্যেই তখন তাদের কাজ পরিচালিত হবে। 'আইএসআই' তার বর্তমান স্বকীয়তা এবং স্বাতন্ত্র্য হারাবে বলেও আশঙ্কা। 'আইএসআই'-কে তার মর্যাদার জায়গা থেকে সরানো কতটা সমীচীন হচ্ছে ভেবে দেখা দরকার।
