শিব্রাম চক্রবর্তীর গল্পের সেই মাস্টারমশাইকে ভোলা যায় না, যিনি 'গুরুচণ্ডালী' দোষ একদম সহ্য করতে পারতেন না। ভাষায় সাধুর সঙ্গে চলিত মিশে গেলে ভয়ংকর ক্রুদ্ধ হতেন। সেই সময় তাঁর মুখখানি 'উচ্ছের পায়েস' খেলে যেমন তিতিবিরক্ত ও বিসদৃশ লাগে, তেমনই হয়ে যেত। ছাত্ররা ভয়ে থাকত, পাছে রোজের কথায় সামান্যতম গুরুচণ্ডালী ঘটে যায়!
তা, একদিন এই মাস্টারমশাই রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সর্পিল লাইনটি মন্থর গতিতে এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ মাস্টারমশাই দেখলেন, পিছন থেকে কে যেন সমানে বলে চলেছে- 'মাস্টারমশাই ব্যগ্র হন কল্য'। ফিরে দেখলেন, লাইনের অনেকখানি পিছনে তাঁরই স্কুলের এক ছাত্র দাঁড়িয়ে। সে-ই বলে চলেছে- 'ব্যগ্র হন কল্য'। মাস্টারমশাই আশ্চর্য হলেন। এ-কথার মানে কী? অনেক ভেবেও যখন মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে পারলেন না- তখন ছাত্রর উপর বেজায় চটলেন। এরা এমন জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলে যে, বলার নয়। ক্লাসে কত করে বোঝান, কিন্তু কে শোনে কার কথা।
যাই হোক, এক সময় মাস্টারমশাই রেশনের দোকানের সামনে চলে এলেন, কিন্তু রেশন সংগ্রহ করে টাকা দিতে গিয়ে দেখলেন, পকেটে মানিব্যাগটি নেই। অর্থাৎ লাইনে যখন দাঁড়িয়েছিলেন তখনই তাঁর মানিব্যাগটি আত্মসাৎ করেছে কেউ। বিষণ্ণ মুখে লাইন থেকে সরে এলেন। ইতিমধ্যে লাইনের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রটি এগিয়ে এসেছে। মাস্টারমশাইকে বিধ্বস্ত দেখে সে বলল- 'তখন কত করে সাবধান করলাম, আপনি তো শুনলেন না!' মাস্টারমশাই রেগে কাঁই। বললেন- "তুই তো বলছিলিস 'ব্যগ্র হন কল্য'। এর মানে কী?" ছাত্র জিভ কেটে বলল, "বলেছিলাম 'ব্যাগ গ্রহণ করল'! আপনি শুনেছেন 'ব্যগ্র হন কল্য'!" মাস্টারমশাই এবার ক্ষোভে ফেটে পড়লেন- 'পকেট মারছে বলতে পারলি না হতভাগা?' ছাত্র বলল- 'ছিঃ, এমন অশুদ্ধ, গুরুচণ্ডলী দোষে ভরা বাক্য আপনার সামনে কীভাবে উচ্চারণ করি!'
ভোটের রাজনীতিতে একপক্ষ যখন অন্যদের সমালোচনা করে, তখন প্রায়ই শব্দের প্রয়োগ বল্লাহীন হয়ে যায়। ব্যক্তিগত আক্রমণ পাল্লায় ভারী হয়ে আদর্শগত বিশ্লেষণকে সংকুচিত করে।
এখানেই গল্পটি শেষ। কিন্তু নিহিত বক্তব্যটি মনে ধাক্কা দিতে থাকে। ভাষার সংসারে শব্দের কৌলীন্য ও শুদ্ধতা ধরে রাখার বাতিক অবান্তর। শব্দের মধ্যে যত উঁচু-নিচু থাকবে, নানা জাতের শব্দ যত থাকবে, তত বাড়বে ভাষার মর্যাদা। এই বার্তা দিতে চেয়েছেন শিব্রাম চক্রবর্তী। কিন্তু ভাষার প্রয়োগে অপশব্দ প্রধান হয়ে উঠলে, একটানা খারাপ শব্দ বক্তার কথায় উঠে এসে শালীনতা ও রুচির গণ্ডি অতিক্রম করলে, সেই 'গুরুচণ্ডালী' দোষ 'রোলমডেল' হতে পারে না!
ভোটের রাজনীতিতে একপক্ষ যখন অন্যদের সমালোচনা করে, তখন প্রায়ই শব্দের প্রয়োগ বল্লাহীন হয়ে যায়। ব্যক্তিগত আক্রমণ পাল্লায় ভারী হয়ে আদর্শগত বিশ্লেষণকে সংকুচিত করে। 'সংবাদ প্রতিদিন'-এর সম্পাদকীয় পাতায় (১৩ মে, '২৬) রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সদ্য বলেছেন: বিরোধীদের প্রতি 'বিভাজনমূলক' শব্দপ্রয়োগে আপত্তি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই রুচি, এই সৌজন্যকে স্বাগত। রাজনীতিতে 'অপর' স্বরের স্বার্থে এটিই কর্তব্য।
