shono
Advertisement
Kerala

কেরলেও নিভল দেউটি! আরও পিছিয়ে পড়ল বামেরা, পশ্চাৎগমন কেন?

লক্ষ‌ করলে দেখা যাবে, পি. ভি. নরসিংহ রাওয়ের সময় থেকেই কিন্তু বারেবারে কেন্দ্রে কংগ্রসকে ঘুরপথে সমর্থন দিয়ে আসছে সিপিএম। তার পরও কংগ্রেসের সমর্থনে দেশের ক্ষমতার বৃত্তে আসার সুযোগ তারা এড়িয়ে গিয়েছে। এই ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতির জন্যই পশ্চাৎগমন।
Published By: Kishore GhoshPosted: 09:24 PM May 13, 2026Updated: 09:24 PM May 13, 2026

বাংলার ভোট নিয়ে আমরা ব‌্যস্ত ছিলাম। নিঃশব্দে কিন্তু বড় পট পরিবর্তন হয়ে গেল দক্ষিণ ভারতে। ডিএমকে (দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজাঘম) এবং এআইএডিএমকে-র (অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজাঘম) ৫০ বছরের লড়াই মুছে তামিল সুপারস্টার থলাপতি বিজয়ের নতুন দল টিভিকে (তামিলগা ভেত্রি কজাঘম) যেমন তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় এল, তেমনই দেশের সর্বশেষ কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটে গেল কেরলে।

Advertisement

ঘটনাচক্রে ৬৯ বছর আগে প্রথম কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠাও হয় এই আরব সাগর পারেই। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে পদ্মফুলের সরকার তৈরি হলেও কেরল-তামিলনাড়ু হিন্দুত্বের সমীকরণের বাইরেই রইল এবারও। কেরলে ১০ বছর পর বামেদের জোট এলডিএফ (লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট)-কে হারাল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ (ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট)। এই রাজ‌্যতে ৫ বছর পরপর সরকার পরিবর্তন হওয়াটা রীতি। ভোট শতাংশের ফারাকও কম থাকে। তবু ২০১৬ এবং ২০২১ টানা দুই বিধানসভা নির্বাচনে জিতেছিল সিপিএম।

এক সময় পশ্চিমবঙ্গ, কেরল ও ত্রিপুরায় সিপিএমের সরকার ছিল। তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান-সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভায় বাম দলগুলির জোর ছিল। সংসদের দুই কক্ষে একটি বড় অংশে উড়ত লাল নিশান। লোকসভায় কখনও ৪০, কখনও ৫০, কখনও আবার ৬০ জনের বেশি সাংসদ জিতে এসেছেন। রাজ‌্যসভাও ছিল লাল পার্টির উল্লেখযোগ‌্য ভাগীদারিত্ব। লোকসভা নির্বাচনে ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতিতে বামেদের আসন সংখ‌্যাই হয়ে উঠত ভরকেন্দ্র। তাদের প্রত‌্যক্ষ অথবা পরোক্ষ সমর্থনে সরকার তৈরি হত। কিন্তু এখন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। বিজেপির উত্থানের পর তাদের ক্ষতি হয়েছে বেশি।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার পরাজিত হয়। ক্ষমতা দখল করে তৃণমূল কংগ্রেস। তিনবার সরকারে আসীন হওয়ার পর এবার তাদের পতন। কিন্তু সিপিএম নয়, ক্ষমতা দখল করল ভারতীয় জনতা পার্টি। ২০১৮ সালে সিপিএমের হাতছাড়া হয় ত্রিপুরা। এখানেও কংগ্রেস নয়, সিপিএম ক্ষমতা হারায় বিজেপির কাছে। ওই রাজ্যে এখন কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেও বিজেপিকে হারাতে পারছে না বামেরা। সদ‌্য এডিসি নির্বাচনে দেখা গেল বিজেপির প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে স্থানীয় দল তিপরা মোথা। পাহাড়ি এলাকায় দশরথ দেবের তৈরি সংগঠন নিশ্চিহ্ন।

গণতান্ত্রিক ব‌্যবস্থায় পৃথিবীর প্রথম কমিউনিস্ট সরকার নির্বাচিত হয়েছিল কেরলে। রাজ‌্য গঠনের পরে ১৯৫৭ সালে প্রথম নির্বাচনে মুখ‌্যমন্ত্রী হয়েছিলেন প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্ট নেতা ই. এম. এস. নাম্বুদিরিপাদ। যদিও ২ বছরের মধ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন করে সরকার ফেলে দেয় কংগ্রেস। সেই প্রথম ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে কোনও অঙ্গরাজ্যের নির্বাচিত সরকার ফেলা। অচিরেই কংগ্রেস ক্ষমতা দখল করে। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হওয়ার পর সিপিএম-এর নেতৃত্বে বাম দলগুলি ‘লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ গঠন করে ক্ষমতা দখল করে। কংগ্রেসও জোট করে। যার নাম ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’। সেই ভাগাভাগিই এত দিন চলছে। যদি ৫ বছর পর-পর সরকার পরিবর্তনের রীতি বজায় থাকে, তাহলে হয়তো বামেরা ভবিষ‌্যতে কেরলে ফিরবে। কিন্তু এমন একটা সময়ে তারা ক্ষমতা হারাল যখন বাম আন্দোলন গভীর সংকটে। আপতত সংসদের কোনও কক্ষেই পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা থেকে বাম প্রতিনিধি নেই। কেরল থেকে মাত্র ১। মোট ১০ জন বাম সাংসদ লোকসভায় আছেন। সিপিএমের ৪ জন। সিপিআইয়ের ৩। আরএসপির ৩। নকশালপন্থী সিপিআইএম লিবারেশনের ২ জন।

২০০৯ সালে বাংলায় কংগ্রেস এবং তৃণমূল জোট করে লড়াই করে। এই রাজ্যে বামেদের ৩৫ আসন নামে ১৫-তে। তৃণমূল ১৯টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের শরিক হয়। তৃণমূলের শক্তির উপর ভর করে কংগ্রেস ৬টি আসন পায়।

অথচ, একটা সময় ছিল জাতীয় রাজনীতি দাপিয়ে বেড়াত বাম দলগুলি। তাদের সমর্থনের উপর দাঁড়িয়ে থাকত কেন্দ্রীয় সরকার। শেষ চার দশকের ইতিহাস যদি ধরা যায় তা হলে দেখা যাবে ১৯৮৯ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং সরকারের অন‌্যতম সমর্থক ছিল সিপিএম তথা বামফ্রন্ট। একদিকে বাম অন‌্যদিকে বিজেপির উপর ভর করেই রাজীব গান্ধীকে ক্ষমতাচ্যুত করেন বিশ্বনাথ প্রতাপ। পরে ১৯৯১ সালে নরসিংহ রাওকে বাইরে থেকে সিপিএম সমর্থন না দিলে কংগ্রেসের সরকার পাঁচ বছর চলতই না। ১৯৯৬ সালে সিপিএমের সামনে কেন্দ্রে সরকার গড়ার সুযোগ এসে গিয়েছিল। জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাব দিয়েছিল অনেকগুলি দল। বিজেপিকে ঠেকাতে সমর্থনও দিত কংগ্রেস। অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকার আস্থা পেতে ব‌্যর্থ হওয়ার পর জ্যোতিবাবুকে প্রধানমন্ত্রী হতে অনুরোধ করে সবাই। সেবার লোকসভায় বামদলগুলির শক্তি মেলালে প্রায় ৫২ জন সাংসদ। সিপিএমের একারই ৩২ জন। কিন্তু দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার সোনার সুযোগ হেলায় ফেলে দেয় সিপিএম। দু’-দু’বার কেন্দ্রীয় কমিটিতে বসুকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাব ভোটাভুটিতে খারিজ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত জনতা দলের নেতা দেবগৌড়া প্রধানমন্ত্রী হন।

জ্যোতিবাবু সরকারে না যাওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ বললেও কমিউনিস্ট শৃঙ্খলা দেখান। তিনি চাইলে সেদিন সিপিএম পার্টি ভেঙে প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। তাঁর ঐতিহাসিক উক্তিটিই এখন সত‌্য প্রমাণিত। সিপিএম দিল্লিতে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। সিপিএম পিছিয়ে গেলেও এগিয়ে যায় সিপিআই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন। চতুরানন মিশ্র কৃষিমন্ত্রী। ভারতীয় সংসদে তাঁরাই প্রথম ও শেষ কমিউনিস্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। সেদিন জ্যোতিবাবু প্রধানমন্ত্রী হলে বড় বড় মন্ত্রক পেত সিপিএম। অর্থ-রেল, প্রতিরক্ষা-বিদেশের মতো মন্ত্রক সামলে নিজেদের বিকল্প প্রশাসনিক পথ দেখাতে পারত। বসু ঠিক এটাই চেয়েছিলেন।

সিপিএমের সামনে আবার সুযোগ আগে ২০০৪ সালে। অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের পতন হল, কিন্তু লোকসভা ত্রিশঙ্কু। কংগ্রেস ১৪৫ আসন। সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি ও নানা ছোট দল নিয়ে ইউপিএর আসন সংখ‌্যা ২২৫। যা ২৭২ ম‌্যাজিক সংখ‌্যা থেকে অনেকটা কম। এনডিএ দাঁড়িয়ে ১৮৯-এ। আবার বামেরাই হয়ে ওঠে সরকার গড়ার মুখ‌্য শক্তি। তাদের সাংসদ সংখ‌্যা ৬১। যা স্বাধীনতার পর কখনও হয়নি। সিপিএম একাই ৪৩। আবার সরকারে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব এলেও শর্তসাপেক্ষে ইউপিএকে বাইরে থেকে সমর্থন করে সিপিএম। তবে মনে রাখতে হবে, ১৯৯৬-এর সরকারে বামেরাই হত চালিকাশক্তি। কংগ্রেস সমর্থক মাত্র। কিন্তু ২০০৪ সালে মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হতেনই। ১৯৯৬-এর চেয়েও অনেক বেশি আসন পেলেও বামেদের প্রধানমন্ত্রিত্ব চাওয়ার মুখ ছিল না। যদিও সমর্থনের বিনিময়ে সরকারে যোগ দিলে বড় ভাগীদারি তারা পেতে পারত। অন্তত ৫-৬টা বড় দপ্তর, বিভিন্ন সাংবিধানিক ও সরকারি পদ বামেদের দিতে বাধ‌্য হত কংগ্রেস। কিন্তু কংগ্রেস তখন ‘অচ্ছুৎ’। জলে নামব, বেণী ভেজাব না। বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে কংগ্রেসকে চাপে রাখাই ছিল সিপিএম-এর কৌশল।

কমিউনিস্টরা যত পিছিয়ে গিয়েছে, তত উত্থান ঘটছে বিজেপির। অথচ আদর্শকে সামনে রেখে বারে বারে সুযোগ এসেছিল বামেদের সামনে।

মনে আছে, প্রথম শহিদ মিনারে একটি সভায় তৎকালীন মুখ‌্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘মনে রাখবেন, কেন্দ্রে ইউপিএ সরকারের প্রাণভোমরা আমাদের হাতে। আমরা উঠতে বসলে উঠবে, আমরা বসতে বললে বসবে।’ সরকারে বা জোটে না গিয়ে কার্যত এই ব্ল‌্যাকমেলিংয়ে লাভের লাভ কিছু হয়নি। কিছু দিন পরে সিপিএম সমর্থন প্রত‌্যাহার করলেও মনমোহন সিং সরকারের পতন হয়নি। আরও নানা দল এগিয়ে আসে।

উলটে সিপিএম সরতেই তৃণমূলের সঙ্গে জোটের দরজা খুলে যায়। ২০০৯ সালে বাংলায় কংগ্রেস এবং তৃণমূল জোট করে লড়াই করে। এই রাজ্যে বামেদের ৩৫ আসন নামে ১৫-তে। তৃণমূল ১৯টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের শরিক হয়। তৃণমূলের শক্তির উপর ভর করে কংগ্রেস ৬টি আসন পায়। জোটসঙ্গী এসইউসিআই পায় ১টি। এই বিরাট সমর্থন দিয়ে দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের রেলমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ‌্যায়। ১৯৯৬ থেকে ২০০৪ কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব ছুঁৎমার্গ করে আদতে লাভ কী হল? সেই তো এখন জোটের জন‌্য কংগ্রসকে ধরাধরি করতে হচ্ছে। বাংলায় ভোটে জোটের প্রস্তাবে সিপিএমকে মুখের উপর না বলে দিয়েছে কংগ্রেস। লক্ষ‌ করলে দেখা যাবে, পি. ভি. নরসিংহ রাওয়ের সময় থেকেই কিন্তু বারেবারে কেন্দ্রে কংগ্রসকে ঘুরপথে সমর্থন দিয়ে আসছে সিপিএম। তার পরও কংগ্রেসের সমর্থনে দেশের ক্ষমতার বৃত্তে আসার সুযোগ তারা এড়িয়ে গিয়েছে। এই ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতির জন‌্যই পশ্চাৎগমন। কমিউনিস্টরা যত পিছিয়ে গিয়েছে, তত উত্থান ঘটছে বিজেপির। অথচ আদর্শকে সামনে রেখে বারে বারে সুযোগ এসেছিল বামেদের সামনে। সামনে নয়, তাদের পিছনে জড়ো হতে চেয়েছিল সবাই। কিন্তু সাহস করে এগিয়ে যাওয়া হল না।
একে-একে নিভল সব দেউটি।

kingshukpratidin@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement