সোমনাথ মন্দির ভারতের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, আধ্যাত্মিক প্রাণশক্তি, রাষ্ট্রীয় আত্মবিশ্বাসের উজ্জ্বল শিখা। ‘সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব’ অনুষ্ঠিত হয় চলতি বছরের ৮-১১ জানুয়ারি। এ উদ্যোগ ১০২৬ সালে সোমনাথ মন্দিরে ঘটা কুখ্যাত হামলার হাজার বছরের পূর্তি। আবার, স্বাধীনতার পর ১৯৫১ সালে পুনর্নির্মিত মন্দিরের ৭৫ বছরের পূর্তিকেও তা মনে করায়। আজ, ১১ মে বৃহৎ জাতীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসবের সমাপ্তি। লিখলেন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত।
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে
দেহ ধ্বংস হলেও আত্মার বিনাশ হয় না। ‘শ্রীমদ্ভগবদগীতা’-র এই শ্লোক, এবং ভারতীয় ধর্মগ্রন্থ ও ঐতিহ্যে নিহিত সভ্যতার জ্ঞান থেকে যে সারমর্ম আহরণ করা হয়েছে, তা বর্তমান গুজরাত রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ঐতিহাসিক কাথিয়াওয়াড়ের দক্ষিণ তীরে প্রভাস পাটনে সোমনাথ মন্দিরের মর্মস্থলে প্রতিফলিত। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম হিসাবে বিবেচিত এই মন্দিরের প্রাচীর বহুবার বর্বর হামলাকারীদের আঘাত সহ্য করেছে, কিন্তু প্রতিবার জেগে উঠে পুজোর ঢাক ও ঘণ্টা বাজিয়েছে।
সনাতন ধর্ম– ভারতীয় ইতিহাসে হাজার বছরের বেশি সময়কাল জুড়ে– রাজনৈতিক দখলদারি, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, এবং ক্ষমতার পরিবর্তনশীল ব্যবস্থাপনার জন্য বারবার সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। সনাতন ধর্মকে ধর্মীয় অনুশীলন, দর্শন, রীতিনীতি এবং প্রতিষ্ঠানের এক বৈচিত্রময় ও বিকেন্দ্রীভূত সমাহার হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই ধর্ম যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে– তার মধ্যে ছিল মন্দির, মঠ এবং জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলি ধ্বংস করে অন্য কাজে ব্যবহার করা। এছাড়াও ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য পৃষ্ঠপোষকের অভাব।
দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম হিসাবে বিবেচিত এই মন্দিরের প্রাচীর বহুবার বর্বর হামলাকারীদের আঘাত সহ্য করেছে, কিন্তু প্রতিবার জেগে উঠে পুজোর ঢাক ও ঘণ্টা বাজিয়েছে।
তবে এই সংকট সত্ত্বেও সনাতন ধর্মের প্রবাহ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছে নিজের অস্তিত্বের এবং বৃহত্তর ধর্মীয় ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। এমনকী, শুধু নিজের প্রভাব বজায় রাখার মধ্যেই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ঐতিহাসিক তাৎপর্যটি নিরবচ্ছিন্নভাবে নিহিত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়ক্ষতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা জয় করেও ধর্মচর্চা জারি রাখার মাধ্যমেই তার প্রভাব স্থায়িত্ব পেয়েছে।
মধ্যযুগের সূচনা থেকে ভারতীয় মন্দিরগুলি কেবল উপাসনালয় হিসাবে নয়; বরং অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসাবেও কাজ করত। শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে সামরিক সংঘাতের সময় এগুলিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠত। গজনির সুলতান মামুদের সোমনাথ মন্দিরে হামলা চালানো এরকমই একটি উদাহরণ। পারস্যের ইতিহাসে এই ঘটনা ‘বিজয়’ রূপে বর্ণিত। অন্য দৃষ্টিতে বর্বরোচিত আগ্রাসন। পরে, ভারতীয় ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণের উপর তাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই মন্দির ধর্মীয় জীবন থেকে হারিয়ে যায়নি; চালুক্যদের মতো আঞ্চলিক শাসকগণ এর পুনর্নির্মাণ করেন, পরবর্তীতে এই মন্দির আবারও ভক্তিস্থল হয়ে ওঠে, যা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।
মধ্যযুগের সূচনা থেকে ভারতীয় মন্দিরগুলি কেবল উপাসনালয় হিসাবে নয়; বরং অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসাবেও কাজ করত। শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে সামরিক সংঘাতের সময় এগুলিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠত।
সোমনাথের ইতিহাসকে একটি মাত্র পর্বে সীমাবদ্ধ করা যায় না। প্রাচীনয ুগ থেকেই প্রভাস পাটন পবিত্র স্থান। পাটন বিভিন্ন জায়গায় ‘প্রভাস পাটন’, ‘শিব পাটন’ এবং ‘প্রভাস তীর্থ’-সহ নানা নামে পরিচিত। প্রাচীন এই শহর তিন সুন্দর নদীর ত্রিবেণী সঙ্গমের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। কথিত, ভগবান কৃষ্ণর দেহ এখানে দাহ করা হয়, তাই এই স্থান পবিত্র। এর পাশেই ‘বৈরাগ্য ক্ষেত্র’ এবং ‘গোপী তুলো’। ভক্তরা এই গোপী তুলো থেকে গোপী চন্দন সংগ্রহ করেন। এই পবিত্র ভূমি দর্শন না-করলে এই অঞ্চলের তীর্থযাত্রা অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়। এই অঞ্চলে যেসব ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়, সেগুলি সম্পর্কে নানা তথ্য কাথিয়াওয়াড় ও কচ্ছের পুরাকীর্তি বিষয়ক প্রতিবেদন বা রিপোর্ট ‘অন দ্য অ্যান্টিকুইটিজ অফ কাথিয়াওয়াড় অ্যান্ড কচ্ছ’ এবং গুজরাতের ডাবোই শহরের পুরাকীর্তি বা ‘দ্য অ্যান্টিকুইটিজ অফ দ্য টাউন অফ ডাবোই’ শীর্ষক প্রতিবেদন দু’টিতে পাওয়া যাবে। সোমনাথ শৈব ও বৈষ্ণব ধারার এক বিরল মিলনস্থল। এটি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, ভারতীয় ঐতিহ্য সব সময়ই বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
স্বাধীন ভারতে সোমনাথের ইতিহাসে আধুনিক অধ্যায় সূচিত হয় ১৯৪৭ সালের ১২ নভেম্বর– কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের পয়লা তারিখ– দীপাবলির দিনে। এর ঠিক আগেই দেশভাগের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে গিয়েছে। সেই দিন আমাদের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল পবিত্র সোমনাথ ভূমি দর্শনে এসেছিলেন। একজন ‘স্বাধীন’ ভারতবাসী রূপে, তিনি প্রবীণ নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের পাশে নিয়ে, ঐতিহাসিক মন্দিরটির পুনরায় প্রতিস্থাপনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। ফলে সেই সময় যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়, তা জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিল। তখন সোমনাথকে ঘিরে যে উদ্যোগ, তা ছিল একটি তীর্থস্থান পুনর্নির্মাণের চেয়েও বেশি, কারণ এই অঞ্চলকে, একটি সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা হয়। ১৯৫১-র ১১ মে প্রভাতে রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের উপস্থিতিতে যে অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়, তা জাতির অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।
সোমনাথ শৈব ও বৈষ্ণব ধারার এক বিরল মিলনস্থল। এটি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, ভারতীয় ঐতিহ্য সব সময়ই বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
দেশ যখন ‘২০৪৭’-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন ভারতীয় সভ্যতার এই মূল্যবোধগুলি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। একদিকে প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুত অগ্রগতি এবং অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভরা একটি সময়পর্ব– দুয়ের সন্ধিক্ষণেই সভ্যতার সমীপে ভারতের উপহার হল সোমনাথ। এর মাধ্যমে যে-বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে তা হল: ‘উন্নয়ন’ মানেই সহানুভূতির বিসর্জন নয়; আবার ক্ষমতারও সঙ্গেও আপস করা না। সোমনাথের সহনশীলতা আমাদের মনে করায়, শুধু ক্ষমতা দিয়েই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে প্রকৃত নেতৃত্ব স্থায়ী করা যায় না; তাকে স্থিতি দিতে জ্ঞান, স্মৃতিচারণা এবং প্রত্যেকের জন্য সমান মানবিক মর্যাদার প্রতি অবিচল অঙ্গীকার প্রয়োজন।
গুজরাতের প্রভাস পাটনে সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা, সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যর ধারাবাহিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। একে কেন্দ্র করে “সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব ২০২৬-’২৭” শীর্ষক একটি জাতীয় উৎসব উদ্যাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসে সোমনাথের একটি অনন্য স্থান রয়েছে। সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, আধ্যাত্মিক প্রাণশক্তি এবং রাষ্ট্রীয় আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল প্রমাণ হিসাবে সোমনাথ মন্দির দঁাড়িয়ে রয়েছে।
‘সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব’ অনুষ্ঠিত হয় চলতি বছরের ৮ থেকে ১১ জানুয়ারি। এই উদ্যোগ ভারতীয় সভ্যতার যাত্রাপথে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আমাদের মনে করায়। প্রথমটি, ১০২৬ সালে সোমনাথ মন্দিরে ইতিহাসে উল্লেখ্য হামলার হাজার বছরের পূর্তি। দ্বিতীয়টি, স্বাধীনতার পর ১৯৫১ সালে পুনর্নির্মিত মন্দিরের ৭৫ বছরেরও পূর্তি। ১১ মে বৃহৎ এক জাতীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হবে। সেই সময় দেশের প্রতিটি, রাজ্য, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, জেলা এবং শিবালয়জুড়ে যাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা এবং সমন্বিত নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শ্রীসোমনাথ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান রূপেও দায়িত্ব পালন করছেন। তঁার নেতৃত্বে সোমনাথ মন্দির পুনরুজ্জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। প্রশাসনিক সংস্কার, পরিকাঠামোর উন্নয়ন, ঐতিহ্যের সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক উদ্যোগ মন্দিরটিকে একটি জীবন্ত আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসাবে আরও শক্তিশালী করেছে। সুস্থায়ী ব্যবস্থাপনা, নারী-পরিচালিত বিবিধ সেবামূলক উদ্যোগ বর্তমান সময়কালে দায়িত্ববোধ ও অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সভ্যতার মূল্যবোধগুলির এক প্রতিফলন।
সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক, শিক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে আধুনিক সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড় একটি সংযোগ স্থাপন করেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রত্যেক প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা গিয়েছে যে, সোমনাথ মন্দির শুধুমাত্র তার শারীরিক অস্তিত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রকৃত মর্ম নিহিত সেই মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের মধ্যে, যা সচেতনভাবে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।
একবিংশ শতাব্দীতে ভারত যখন তার জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছে, তখন সোমনাথের চেতনা আমাদের পথ দেখায়। আমরা জানি, যে কোনও সভ্যতা ততক্ষণই শক্তিশালী, যতক্ষণ তার শিকড় গভীরে প্রোথিত থাকে। ততক্ষণই প্রাসঙ্গিক, যতক্ষণ তা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলে, ঐক্যবদ্ধ থাকে। সোমনাথের উত্তরাধিকার আমাদের অনুপ্রাণিত করুক। আমরা যেন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ গড়তে পারি, ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করতে পারি এবং নিজেদের সম্পর্কে যথাযথ মূল্যায়ন করে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে পারি।
জয় সোমনাথ! বন্দে মাতরম্!
(মতামত নিজস্ব)
