ভারতের অর্থনীতি যে ভিতরে ভিতরে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই তার ইঙ্গিত কি পাওয়া যাচ্ছিল? সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে সেই সংকেত কিন্তু স্পষ্ট। এই ফেব্রুয়ারিতে ‘ইনডেক্স অফ এইট কোর ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর তথ্য বলছে, এই গুরুত্বপূর্ণ সূচকের বৃদ্ধির হার তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমেছে, যা জানুয়ারির তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
একে কেবল ‘বেস এফেক্ট’-এর দোহাই দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, কারণ গত বছরের এই সময়ও বৃদ্ধির হার খুব বেশি ছিল না। বরং ক্ষেত্রভিত্তিক বিশ্লেষণই প্রকৃত সমস্যাকে সামনে নিয়ে আসে। যেমন: দেশীয় অপরিশোধিত তেল উৎপাদন টানা ছ’-মাস ধরে সংকুচিত, এবং গত ২৪ মাসে ২০ বার এই ক্ষেত্র সংকোচনের মুখ দেখেছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই ছবি– ২০ মাস ধরে অবনমন।
এই পরিস্থিতি মোটেই আকস্মিক নয়। গত বছরের মাঝামাঝি থেকেই আমেরিকা-ইরান উত্তেজনা বাড়ছিল। তা যে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে রূপ নেবে, এমন আশঙ্কা ছিলই। ভারতের মতো জ্বালানি-নির্ভর আমদানিকারী দেশের জন্য এটি ছিল এক সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা। সস্তা আমদানির সুবিধা নিয়ে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া হয়তো স্বল্পমেয়াদে লাভজনক মনে হয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করেছে।
একে কেবল ‘বেস এফেক্ট’-এর দোহাই দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, কারণ গত বছরের এই সময়ও বৃদ্ধির হার খুব বেশি ছিল না।
অন্তত গত আট মাসে দেশীয় তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে মজুত গড়ে তোলা যেত, যা এখনকার সরবরাহ সংকট অনেকটাই কমাতে পারত। নীতিনির্ধারণে এই দূরদর্শিতার অভাব নতুন নয়, ২০১৬ সালের ‘প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা এলপিজি’-র ব্যাপক ব্যবহার বাড়ালেও, তার সমান্তরাল জোগান সুরক্ষা ও মজুত বাড়ানোর কোনও সুসংহত নীতি সম্পর্কে সরকার চিন্তা করেনি। ফলে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহের ভিত্তি দুর্বলই থেকে গিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও এক উদ্বেগজনক দিক।
নতুন জিডিপি সিরিজ অনুযায়ী ভারতের অর্থনীতি আগের ধারণার চেয়ে সংকুচিত। ২০২২-’২৩ থেকে ২০২৫-’২৬ পর্যন্ত ব্যক্তিগত খরচ, পুঁজি বিনিয়োগ, রপ্তানি ও আমদানির মতো প্রধান চালিকাশক্তিগুলির জিডিপিতে অবদান কমেছে। বিপরীতে ‘স্টক পরিবর্তন’-এর অংশ বেড়েছে। এর অর্থ, উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে না। এই চাহিদাহীনতা অব্যাহত থাকলে উৎপাদনও শিগগির কমে যাবে। ফলে অর্থনীতি আরও মন্থর হবে।
এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার উপর এসে পড়েছে বৈশ্বিক সংকটের চাপ। জ্বালানির দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে, সরবরাহ অনিশ্চিত, এবং বিশ্ব অর্থনীতি অস্থির। ফলে অর্থনীতিবিদ ও রেটিং সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে প্রায় ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে তার ‘ম্যাক্রো-ইকোনমিক ফান্ডামেন্টাল’ এবং ‘রেজিলিয়েন্স’-এর কথা বলে এসেছে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবটি হল, এই ভিত্তি ততটা মজবুত নয় যতটা প্রচার হয়। এখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, বাস্তববাদী মূল্যায়ন এবং দ্রুত নীতিগত সংশোধন। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
