ভারতে শ্রম ও মেধা থাকলেও মালিকানা অপ্রতুল। ২০২৬ সালেও উচ্চমানের প্রসেসর বা মেমোরি চিপ উৎপাদনে আমরা অক্ষম। তাই সাম্প্রতিক ‘রোবট কুকুর’-এর ঘটনা কেবল হাস্যরসের উপকরণ হয়েই রয়ে গেল। আমরা মঞ্চ বানিয়ে আন্তর্জাতিক অতিথি অভ্যর্থনা করতে পারি। কিন্তু ল্যাবরেটরির ব্যর্থতায় ভরা পথে কি হঁাটছি আমরা? লিখছেন দীপ্র ভট্টাচার্য।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬। দিল্লির ঝলমলে ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত ‘ইন্ডিয়া এআই সামিট’-এর স্টলে-স্টলে, মঞ্চে আলো, ক্যামেরা, করতালির ঝড়। ঘোষণায়-ঘোষণায় ভেসে যাচ্ছে, ভারত ‘এআই’-যুগের অগ্রদূত। বক্তৃতা শুনে মনে হচ্ছিল, ভবিষ্যৎ যেন ইতিমধ্যেই আমাদের পকেটে। কিন্তু প্রযুক্তির ইতিহাসে প্রায়ই দেখা গিয়েছে– যখন আলো খুব বেশি ঝলমলে হয়, তখন ছায়াও গাঢ় হয়। সেই সম্মেলনেই একটি স্টলে চারপেয়ে এক ‘রোবট কুকুর’ ছিল। দাবি– দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স’-এর বিস্ময়। উপস্থাপনায় আত্মবিশ্বাস ছিল, ভঙ্গিতে দেশপ্রেম। কিন্তু প্রদর্শনের মাঝেই ধরা পড়ে যায় আসল কাহিনি। যন্ত্রটি আসলে চিনের সংস্থা ‘Unitree Robotics’-এর তৈরি ‘Unitree Go2’, যা অনলাইনে কেনা যায়। স্টলের আয়োজক গ্যালগটিয়াস ইউনিভার্সিটিকে শেষ পর্যন্ত সরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আসল প্রশ্নটা থেকে যায়– এ কি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ভুল, না কি বৃহত্তর মানসিকতার লক্ষণ? আমরা কি তবে সত্যিই স্রষ্টা, না কি সাজসজ্জাকারী?
আমরা বর্তমানে ‘এআই’-কে ঘিরে বিপুল আশাবাদী। সরকারি বিবৃতিতে ‘এআই সুপারপাওয়ার’ শব্দবন্ধ বারবার শোনা যায়। কিন্তু সুপারপাওয়ার হওয়ার প্রথম শর্ত– মৌলিক ক্ষমতা। ভারতের অধিকাংশ ‘এআই স্টার্ট-আপ’ এখন মূলত বিদেশি মডেলের উপর নির্ভরশীল। যেমন– ‘OpenAI’-এর ChatGPT বা ‘Meta’-র Llama মডেলের API ব্যবহার করে নানা পরিষেবা তৈরি হচ্ছে। এতে দক্ষতা আছে, ব্যবসায়িক বুদ্ধি আছে, কিন্তু ভিত্তিগত গবেষণা কোথায়? নিজেদের প্রশিক্ষিত ‘ফাউন্ডেশনাল মডেল’– যা আন্তর্জাতিক মানচিত্রে স্বীকৃত, তার অভাব স্পষ্ট। এটি অনেকটা রঁাধা খাবার কিনে প্লেটে সাজিয়ে পরিবেশন করার মতো। বা, বড় কোম্পানির ফ্র্যাঞ্চাইজি যেমন। সাজানোর শিল্প অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু রান্নাঘরের আগুন আর মশলাপাতি অন্যের। সেখানেই চলে আসে ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। ‘এআই’ চালাতে প্রয়োজন বিপুল কম্পিউট শক্তি—বিশেষত উচ্চক্ষমতার জিপিইউ ক্লাস্টার। উন্নত দেশসমূহ সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বে নিজেদের গবেষণা-উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তুলছে। ভারতে এখনও তেমন বৃহৎ পাবলিক জিপিইউ অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে গবেষণা ও স্টার্টআপ– উভয়ই বিদেশি ক্লাউড পরিষেবার উপর নির্ভরশীল। ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের কথা আমরা বলি, কিন্তু ডেটা, কম্পিউট ও মডেল– তিন স্তম্ভের একটিও পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রশ্নটা প্রযুক্তিগত যেমন, তেমনই কৌশলগতও।
সুপারপাওয়ার হওয়ার প্রথম শর্ত– মৌলিক ক্ষমতা। ভারতের অধিকাংশ ‘এআই স্টার্ট-আপ’ এখন মূলত বিদেশি মডেলের উপর নির্ভরশীল। যেমন– ‘OpenAI’-এর ChatGPT বা ‘Meta’-র Llama মডেলের API ব্যবহার করে নানা পরিষেবা তৈরি হচ্ছে। এতে দক্ষতা আছে, ব্যবসায়িক বুদ্ধি আছে, কিন্তু ভিত্তিগত গবেষণা কোথায়?
এবার আসি, চিপের গল্পে। সে কি কারখানা না প্যাকেটঘর? সেমিকন্ডাক্টরের প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই শোনা যায়– ভারতে সেমিকন্ডাক্টর প্লান্ট বসছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলি ATMP ইউনিট অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং, মার্কিং আর প্যাকেজিং। অর্থাৎ, মূল চিপ তৈরি হয় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, চিনে; ভারতে তার পরীক্ষা ও প্যাকেজিং। গুজরাতে একটি ফ্যাব প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে বটে, কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব গড়ে তোলা এবং বাণিজ্যিকভাবে সফল করা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া– প্রায় এক দশক বা তারও বেশি সময়, বিপুল পুঁজি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং স্থিতিশীল সাপ্লাই চেন প্রয়োজন। ভারতীয় প্রকৌশলীরা বিশ্বের শীর্ষ সংস্থাগুলির জন্য নকশা তৈরি করেন, কিন্তু সেই নকশার মেধাসত্ত্ব সংশ্লিষ্ট বহুজাতিক কোম্পানির। আমরা শ্রম ও মেধা দিই, কিন্তু মালিকানা পাই না। ২০২৬ সালেও ভারত উচ্চমানের প্রসেসর বা মেমরি চিপ উৎপাদনে সক্ষম হয়নি। নিম্নমানের চিপও বৃহৎ বাণিজ্যিক স্কেলে তৈরির পরিকাঠামো এখনও সীমিত। জমি ও ভরতুকি দিয়ে বিদেশি সংস্থাকে আকর্ষণ করা যায়, কিন্তু তাতে মৌলিক গবেষণা-সংস্কৃতি তৈরি হয় না। ‘ইনোভেশন থিয়েটার’ শুনতে বেশ গুরুগম্ভীর, কিন্তু এই রোবট কুকুরের ঘটনাটি কেবল হাস্যরসের উপকরণ হয়েই রয়ে গেল। এটি আদতে আমাদের প্রযুক্তি-সংস্কৃতির এক প্রতীক। আমরা মঞ্চ বানাতে পারি, অনুষ্ঠান সাজাতে পারি, আন্তর্জাতিক অতিথিকে অভ্যর্থনা জানাতে পারি। কিন্তু ল্যাবরেটরির দীর্ঘ, ক্লান্তিকর, ব্যর্থতায় ভরা পথ– সেটি কি আমরা হঁাটছি?
সংবাদমাধ্যম প্রায়ই ঘোষণা করে– ‘ভারত বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে’। কিন্তু সেই পথচলার নেপথ্যে গবেষণা– তহবিল, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগ, দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণ– এসব কতটা মজবুত? কেন আমাদের বহু মেধাবী ছাত্র বিদেশে গিয়ে গবেষণার পরিকাঠামো খোঁজে? প্রযুক্তি কেবল পণ্য নয়, একটি পরিবেশ। সেখানে প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা লাগে, ব্যর্থতার সহনশীলতা লাগে, এবং সবচেয়ে বড় কথা– মালিক হওয়ার ইচ্ছা লাগে। তাহলে, সামনে পথ কোনদিকে? গ্যালগোটিয়াসকে স্টল গুটিয়ে বাড়ি পাঠানো সহজ কাজ।
কঠিন কাজ হল– আত্মসমীক্ষা। আমরা কি সত্যিই অ্যালগরিদম, চিপ, রোবট– সবক্ষেত্রে নিজস্ব চিন্তার ভিত্তি তৈরি করছি? না কি বিদেশি প্রযুক্তির উপর দেশি রং মেখে আত্মতুষ্ট হচ্ছি? ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ যদি কেবল সংযোজন আর প্যাকেজিংয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা শিল্পোন্নয়ন হতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব নয়। নেতৃত্ব আসে জ্ঞান-উৎপাদন থেকে। চতুর্থ, শিল্পবিপ্লবের ইমারত ধীরে ধীরে বাড়ছে। হাইটেক লিফটে উঠতে হলে কেবল ঘোষণা করলে হবে না; লাগবে গবেষণা, বিনিয়োগ, এবং দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিভঙ্গি। না হলে, আমাদের সেই সিঁড়ির ভরসাতেই থাকতে হবে। তাই, শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা পাঠকের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া যায়– আমরা কি আলো ঝলমলে প্রদর্শনীতে সন্তুষ্ট থাকব, নাকি ল্যাবে বসে সত্যিকারের ভবিষ্যৎ গড়ার ধৈর্য দেখাব? কারণ প্রযুক্তির ইতিহাসে স্টিকার টেকে না, টেকে কেবল সৃষ্টিশীলতা।
(মতামত নিজস্ব)
