'হে মহাজীবন' কবিতায় সুকান্ত ভট্টাচার্যর সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি 'ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি' অনেকেরই মনে থাকতে পারে। বাস্তবের রুক্ষ জীবনে বিশ্বের বহু মানুষই পেটে খিদে নিয়ে ঘুমতে যায়। পর্যাপ্ত খাবার জোটে না অনেকের। আবার পেট ভরলেও কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পায় না। ফলে অপুষ্টিজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে রেহাই মেলে না।
তবে বিশ্বব্যাপী নাকি অনাহারক্লিষ্ট মানুষের সংখ্যা কমছে। টানা তৃতীয় বছর এই হার কমা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থাকছে। রাষ্ট্র সংঘের ৫টি সংস্থার যৌথ সর্বশেষ 'বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা' শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত থেকেছে। কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি মানুষ পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত। যার সংখ্যা প্রায় ২৬৯ কোটি। এর অর্থ: বিশ্বের প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনের থালায় নেই স্বাস্থ্যকর খাবার।
বিশ্বব্যাঙ্ক ২০২১ সালের ক্রয়ক্ষমতা সমতা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক চরম দারিদ্র্যসীমা প্রতিদিন জনপ্রতি ৩ মার্কিন ডলার।
যুদ্ধ, অর্থনৈতিক ধাক্কা, চরম জলবায়ু পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এখনও তীব্র খাদ্য সংকটে। বিশ্বে ক্ষুধার প্রধান কেন্দ্র বা 'হটস্পট' আফ্রিকা। ২০২৫ সালে আফ্রিকায় আনুমানিক ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে, যা মহাদেশের প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজন এবং বিশ্বের মোট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় অর্ধেক। এর তুলনায় এশিয়ায় মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ৪.৮ শতাংশ মানুষ অপুষ্টির শিকার। কেন এই পরিস্থিতি?
প্রথমত দারিদ্র্য। বিশ্বব্যাঙ্ক ২০২১ সালের ক্রয়ক্ষমতা সমতা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক চরম দারিদ্র্যসীমা প্রতিদিন জনপ্রতি ৩ মার্কিন ডলার। সেখানে ২০২৫ সালে পুষ্টিকর খাবারের বৈশ্বিক গড়ের দৈনিক মূল্য ৪.২৮ ডলার। এই দাম ২০২১ সালে ছিল ৩.৪৪ ডলার, এবং ২০১৭ সালে ছিল ২.৯৪ ডলার। যার অর্থ- পুষ্টিকর খাবার ক্রমশ গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষের সাধ্য ও পরিধির বাইরে চলে যাচ্ছে। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে পুষ্টিকর খাবার ক্রয় করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা বা ওশেনিয়ায় যা অনেক কম। বিভিন্ন অঞ্চলে পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতায় বৈষম্যের চিত্রও এতে স্পষ্ট।
রাষ্ট্র সংঘর রিপোর্টে স্পষ্ট খাবার থেকে ক্যালরি পেলেও পুষ্টিগুণে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ফল, শাকসবজি, দুধ, ডিম, মাংস-সহ পুষ্টিকর খাবার নাগালের বাইরে। আবার পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে মুখরোচক, অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি বর্তমান প্রজন্মের আকর্ষণ বেশি। ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবারের 'পর নির্ভরতা, অনলাইন ফুড ডেলিভারির সহজলভ্যতা এর বড় কারণ। অপুষ্টির পাশাপাশি বাড়ছে তাই ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি। পেট ভরলেই যে শরীরের পুষ্টি হয় না, রাষ্ট্র সংঘের রিপোর্ট সে-ছবি ফের সামনে আনল।
