প্রযুক্তিনির্ভর আদালতের পথে এগনোর ক্ষেত্রে মানবিক ভারসাম্য, অন্তর্ভুক্তি এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নগুলিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ভারতের বিচারব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দ্রুত এবং স্বচ্ছ করে তোলার লক্ষ্যে বহু দিন ধরেই ডিজিটাল রূপান্তরের প্রচেষ্টা চলছে। এবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দু'টি নতুন উদ্যোগের ঘোষণা করেছেন- 'ওয়ান কেস, ওয়ান ডেটা' বা 'ওসিওডি' এবং 'সু-সহায়ক'। প্রথমটি একটি সুসংহত বিচারকেন্দ্রিক তথ্যভাণ্ডার, যেখানে একটি মামলা বিভিন্ন আদালত ঘুরে যে-পথ অতিক্রম করে তার সম্পূর্ণ ডিজিটাল নথি এক জায়গায় সংরক্ষিত থাকবে। দ্বিতীয়টি, 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' নির্ভর একটি চ্যাটবট, যা সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট ব্যবহারকারীদের মামলা সংক্রান্ত তথ্য, আদেশ, রায় বা অন্যান্য পরিষেবা দ্রুত খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।
নিঃসন্দেহে এই উদ্যোগগুলি বিচারব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যসমৃদ্ধ করে তোলার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। তবে প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার মধ্যেই এমন কিছু প্রশ্ন উঠে আসছে, যেগুলি উপেক্ষা করলে ডিজিটাল সংস্কারই এক সময় বৈষম্যের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ওসিওডি প্রকল্পের মূল শক্তি: তথ্য একত্র করা। ভারতের অসংখ্য জেলা ও নিম্ন আদালতে এখনও নথি সংরক্ষণ, সফটওয়্যার ব্যবহার এবং তথ্য আপডেটের ক্ষেত্রে বিস্তর বৈচিত্র রয়েছে। সেখানে একটি মামলার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ট্রেল তৈরি করা সহজ নয়।
কিন্তু যদি এই প্রকল্প সফল হলে বিচারপ্রক্রিয়ার জট কমতে পারে এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও সহজ হবে।
আদালতের নথি যাচাই বা মামলার অগ্রগতি বোঝার জন্য সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীদের যে-সময় ও শ্রম ব্যয় হয়, তাও কমবে। বিচারব্যবস্থাকে মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করে তোলার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানেই প্রশ্ন, এই ডিজিটাল পরিকাঠামো কি সত্যিই সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য হবে? বড় শহরের কর্পোরেট আইন সংস্থাগুলির পক্ষে উন্নত স্ক্যানার, ক্লাউড ব্যাকআপ বা আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করা সহজ, কিন্তু জেলা বা মহকুমা স্তরের স্বাধীন আইনজীবীদের কাছে সেই আর্থিক সামর্থ্য সবসময় না-ও থাকতে পারে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তাঁদের উপর নতুন আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
নিঃসন্দেহে এই উদ্যোগগুলি বিচারব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যসমৃদ্ধ করে তোলার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। তবে প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার মধ্যেই এমন কিছু প্রশ্ন উঠে আসছে, যেগুলি উপেক্ষা করলে ডিজিটাল সংস্কারই এক সময় বৈষম্যের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আবার বহু সাধারণ মামলাকারী ডিজিটাল পোর্টাল ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়, ফলে 'ডিজিটাল সহায়তাকারী' বা মধ্যস্থতাকারীদের একটি নতুন শ্রেণি গড়ে উঠতে পারে, যারা অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ই-ফাইলিং বা নথি আপলোডের কাজ করবে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি নতুন ধরনের অনিয়ন্ত্রিত খরচেরও জন্ম দিতে পারে। 'সু-সহায়ক' নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। এই চ্যাটবট মূলত টেক্সট-ভিত্তিক। অর্থাৎ, ব্যবহারকারীকে টাইপ করতে হবে এবং ওয়েবসাইটের বিভিন্ন স্তর বুঝে ব্যবহার করতে হবে। ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও ডিজিটাল সাক্ষরতায় পিছিয়ে। তাই খেয়াল রাখতে হবে, বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য কেবল আধুনিকীকরণ নয়, ন্যায়সঙ্গত হওয়াও।
