সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন রিলের ছড়াছড়ি যেখানে মজা করেই মেয়েদের অবমাননা করা হয়। নির্বোধ বলা হয়। মেয়েরা তা 'লাইক'-ও করে!
একটি খেলায় অবতীর্ণ হয়েছে স্বামী ও স্ত্রী। প্রস্তাবটি দিয়েছে। স্বামীই। পরস্পরকে চড় মারা হবে। যে আস্তে চড় মারবে, সে পাবে ৫০০ টাকা নগদ পুরস্কার। স্ত্রী প্রথমে চড় মারল। মারল মানে আলতো করে স্বামীর গাল ছুঁয়ে দিল। তাতে আঘাত বা ক্ষতের ব্যাপার নেই। এবার স্বামীর পালা। স্বামীটি কিন্তু বেশ ঠাটিয়ে চড় মারল। তারপর বলল স্ত্রীকে- আমার চেয়ে তুমিই আস্তে মেরেছ। বাজির টাকা তোমার! স্ত্রী টাকা পেল, কিন্তু অত জোরে একটি থাপ্পড় খেয়ে তার গাল লাল হয়ে গিয়েছে। স্ত্রী স্তম্ভিত। বাজিতে তাকে যে ছল করে হারানো হল, সেটি বুঝতে পারছে বটে, তবে পুরোপুরি বিশ্বাসও হচ্ছে না।।
স্বামী ও তার বন্ধু একত্রে নেশার আসর বসিয়েছে। স্ত্রী ভেতরঘর থেকে এসে বলল- রোজ তোমার নেশার আসর বসানো! এসব চলবে না। তা শুনে স্বামী ডানহাত তুলে রাগত স্বরে স্ত্রীকে বলে- একদম বাড়াবাড়ি করবে না। স্ত্রী এবার চুপ করে যায়। ভালমানুষের মতো বলে- তোমাদের জন্য কিছু ভাজাভুজি করে আনছি। খাবার না খেলে অ্যাসিড হয়ে যাবে। স্বামীর বন্ধু তো হতবাক। এমন করে তরোয়ালের ধারের উপর স্ত্রীকে রাখা যায়, বারে! কী রসায়ন? তখন জানা গেল, ডানহাতের তেলোয় স্বামী লিখে রেখেছিল, নেশায় ব্যাঘাত না ঘটালে ৫ হাজার টাকা দেবে স্ত্রীকে! তাই স্ত্রী সুর বদলেছে।
বাপ, মেয়ে, স্ত্রী। ছোট সংসার। সুখী সংসার। মেয়ে জানতে চায় বাপের কাছে- রেডিও কে আবিষ্কার করেছিল? বাপ বলে- মনে পড়ছে না, তবে আমাদের গ্রামে প্রথম রেডিও এনেছিল আমার বাবা। স্ত্রী পাশ থেকে ফোড়ন কাটে: ছি, শাশুড়ি মাকে নিয়ে অমন মজা করতে নেই!
তিনটেই সোশ্যাল মিডিয়ায় লোকপ্রিয় হওয়া রিল। তিনটি রিলেই মেয়েদের নিয়ে মজা করা হয়েছে। মজার সঙ্গে মিশেছে অবমাননা। অবমাননার সঙ্গে মিশেছে চরিত্রহননের ফাঁদ। ফাঁদের সঙ্গে লেপটে রয়েছে মেয়েদের নির্বোধ, লোভী, এবং কুচুটে বলে দাগানোর অভিপ্রায়। যেন টাকা ধরিয়ে দিলেই মেয়েরা সন্তুষ্ট। যেন টাকার বিনিময়ে সহজেই মেয়েদের গায়ে হাত তোলা যায়। আবার একজন মহিলা, অন্যজন মহিলাকে নিয়ে রসিকতা করে, এবং পুরুষতন্ত্রের সাজানো ভাষ্যকে পুষ্ট করে তোলে।
২০২৪ সালের মার্চে 'সিএনএন' সোশ্যাল মিডিয়ায় মেয়েদের উপর ঘটে চলা নির্যাতন প্রসঙ্গে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল অনলাইন এডিশনে। সেখানে জোর দেওয়া হয়েছিল 'আইআরএল' বলে একটি শব্দবন্ধে। 'আইআরএল' মানে 'ইন রিয়েল লাইফ'। সোশ্যাল মিডিয়ায় গল্পচ্ছলে, হাস্যকৌতুকে মুড়ে, যা দেখানো হয়, সেখানে মূলত মেয়েরা অনুকম্পার পাত্র ও মোটা অনুভূতিসম্পন্ন- এই প্রবণতা আসলে প্রকৃত বাস্তব থেকেই ধার করা। মানে, বাস্তবে এমনটি মনে করা হয় বলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তা প্রতিফলিত হচ্ছে। অথচ, হাস্যরসের আচ্ছাদনের জন্য তা কর্কশ বলে মনে হয় না। সে-কারণে, মেয়েরাও এই ধরনের রিল দেখে বিরক্তি বোধ করার পরিবর্তে 'লাইক' জানায়। 'ম্যানোস্ফিয়ার'- মানে, যেখানে পুরুষরা দলবদ্ধভাবে ও সুকৌশলে মেয়েদের বিরুদ্ধে হিংসা বুনে দেয়- এভাবেই কিন্তু তা তৈরি হয়। হাসিতে তাই সহজে ভুলবেন না।
