কনকনে শীতের ভোরে খেজুর গাছে উঠে রস সংগ্রহ করে তা জাল দিয়ে চির চেনা বাংলার নলেন গুড় তৈরির ঐতিহ্য কি ক্রমশ লুপ্ত হয়ে যাবে? এমনই আশঙ্কা বসিরহাটের খেজুর গাছের মালিক, রস সংগ্রহকারী ও নলেন গুড় ব্যবসায়ীদের। তাঁদের আশঙ্কা, আতঙ্কের উৎস মোবাইল ফোনের টাওয়ারের রেডিয়েশন বা বিকিরণ! এহেন রেডিয়েশনে খেজুর গাছের রস কমে যাচ্ছে বলে দাবি তাঁদের। পর্যাপ্ত পরিমাণ রস না মেলায় নলেন গুড়ের মান ও উৎপাদন-দুই-ই মার খাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন তাঁরা। বসিরহাটের ইটিন্ডা, মেরুদণ্ডী, গাছা, আখারপুর, প্রসন্নকাটি। স্বরূপনগরের কৈজুরী, বালতি, নিত্যানন্দকাটি, সগুনা, কাচদহ। বাদুড়িয়ার সফিরাবাদ, শায়েস্তানগর, যশাইকাটি ও যদুরহাটি-সর্বত্র একই আশঙ্কার সুর।
বিভিন্ন গ্রামের খেজুর রস সংগ্রহকারীরা জানাচ্ছেন, আগের তুলনায় রসের পরিমাণ চোখে পড়ার মতো কমেছে। বহু গাছে রস নামছেই না, আবার কোথাও রসের স্বাদ ও ঘনত্ব আগের মতো থাকছে না। অভিজ্ঞ রস সংগ্রহকারী গোবিন্দ সাধু বলেন, "আগে একটা গাছ থেকে যে পরিমাণ রস পাওয়া যেত, এখন তার অর্ধেকও মেলে না। অনেক গাছে খালি কলসি ফিরে আসে। আশেপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা মোবাইল টাওয়ারের জন্যই এই সমস্যা বলে আমাদের ধারণা।" উদ্বিগ্ন খেজুর গাছ মালিকরাও বলছেন, বছরের পর বছর পরিচর্যা করা গাছগুলি হঠাৎ যেন দুর্বল হয়ে পড়ছে। নতুন ডাল বেরনোর হার কমছে, গাছের প্রাণশক্তিও আগের মতো নেই।
স্বরূপনগরের এক গাছ মালিকের বক্তব্য, "খেজুর গাছ একদিনে বড় হয় না। বছরের পর বছর ধরে যত্ন নিতে হয়। এখন যদি গাছ রসই না দেয়, এই পেশা টিকবে কীভাবে?” বসিরহাটের নলেন গুড়ের খ্যাতি রাজ্যের বাইরেও। কিন্তু এ বছর ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভালো মানের গুড় তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যাপ্ত রস না পাওয়ায় উৎপাদন কমেছে, বেড়েছে খরচ। অনেক ক্ষেত্রে রসের মান ঠিক না থাকায় গুড়ের রং ও স্বাদেও পরিবর্তন আসছে। বসিরহাট পুরাতন বাজারের এক নলেন গুড় ব্যবসায়ী বলেন, "ক্রেতারা আগের মতো গুড় পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। রস কম হলে গুড় ভালো হয় না। এতে আমাদের সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।"
পরিবেশবিদদের একাংশ মোবাইল ফোনের টাওয়ারের জন্য খেজুর রস কমে যাওয়ার অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখার কথা বলছে। তাঁদের মতে, মোবাইল টাওয়ার থেকে নির্গত তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত গবেষণা প্রয়োজন। গাছপালা ও জীববৈচিত্রের উপর রেডিয়েশনের প্রভাব পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এক পরিবেশবিদ বলেন, "একদিনে এই সমস্যা তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে টাওয়ারের রেডিয়েশন গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রস উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। বিষয়টি নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা জরুরি।" খেজুর রস, নলেন গুড় বসিরহাটের অর্থনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কয়েক লক্ষ মানুষ এর উপর নির্ভরশীল। উদ্বিগ্ন রস সংগ্রহকারী থেকে ব্যবসায়ী। দাবি, প্রশাসনিক স্তরে সমীক্ষা করে মোবাইল টাওয়ার বসানোর নীতি ও পরিবেশগত প্রভাব খতিয়ে দেখা হোক।
